খাটালের পালঙ্কের সামনে এসে কুট্টি বলল, কী অইছে বুজান?
পালঙ্কের কাঁথা কাপড়ের ভুরের ভিতর জেগে আছে বড় বুজানের মাথা। শীত পড়তে না পড়তেই শীতে বেদম কাতর হয়েছেন তিনি। হাত পা আর মুখের কুঁচকানো চামড়ায় খড়ি উঠেছে। মাথায় চুল বলে কিছু নাই, সব উঠে গেছে। পাকা বেলের মতো মাথায় লেগে আছে একেবারেই সাদা দুই একটা চুল। মুখ শুকাইয়া এতটুকু হয়ে গেছে। শীতের সকালে পুকুর থেকে ডাঙায় উঠে কাউট্টা যেমন শক্ত খোলসের ভিতর থেকে মাথা বের করে রোদ পোহায়, কাঁথা কাপড়ের ভিতর থেকে বের হয়ে থাকা বড় বুজানের মুখ মাথা এখন তেমন দেখাচ্ছে।
কুট্টির কথা শুনে ফোকলা মুখে হাসবার চেষ্টা করলেন তিনি। বয়স আর শরীরের চাপে এমন হয়েছে চেহারা, হাসি কান্নার ভাব একই রকম। কুট্টি বুঝতেই পারে না কোনটা হাসি কোনটা কান্না।
এখনও পারল না। মনে হল বুজান কাঁদছেন। বলল, কী অইছে? কান্দেন ক্যা?
বুজান খিক করে হাসির শব্দ করলেন। কান্দি না, হাসি।
ক্যা? হাসনের কী অইছে?
অইছে একটা কাম।
তাড়াতাড়ি কন। ঘাডে যামু। কোডা মাছ লইয়া ঘরে আইছি। বেইল উইট্টা গেছে। ভাত চড়ামু।
আমি বইন একখান খারাপ কাম কইরা হালাইছি।
কী?
কইতে শরম করতাছে।
ইস আমার কাছে আবার শরম! মার কাছে ল্যাংটা পোলার শরম আছেনি!
বুজান কাঁচুমাচু গলায় বললেন, পেশাব কইরা দিছি।
শুনে কুট্টি খ্যাক খ্যাক করে উঠল। ক্যা আমারে ডাক দিতে পারলেন না? আমি মইরা গেছিনি?
কুনসুম করছি, উদিস পাই নাই।
এমতে দিহি পান। এমতে দিহি চিল্লাইয়া গলার রগ ছিড়া হালান। ও কুট্টি ডহি বাইর কর, আমি পেশাব করুম। অহন চিল্লাইতে পারলেন না? খালি আমার কাম বাড়ায়! বেবাক কেথা কাপোড় অহন রইদ্দে দেওন লাগবো। পশশু দিন নাওয়াইয়া দিছি আইজ আবার নাওয়ান লাগবো। নাওয়াইতে যে জানডা বাইর অইয়া যায় আমার হেইডা কেঐ বোজে? পানি গরম করো, পোলাপানের লাহান কুলে কইরা ফিরিতে (পিঁড়িতে) নিয়া বহাও। ইস জানডা শেষ কইরা হালাইলো আমার! মাজরো বুজানে ঢাকা যাওনের পর বুজছিলাম অহন কয়ডা দিন আরামে থাকুম, কাম ইট্টু কমবো, কীয়ের কী, আরও দিহি বাড়তাছে!
মাছের খাদা পায়ের কাছে নামিয়ে রাখল কুট্টি। আগের মতোই গজ গজ করে বলল, পেশাব করনের সমায় মাইনষে আবার উদিস না পায় কেমতে!
বুজান অপরাধীর গলায় বললেন, এমুন তো কোনওদিন অয় নাই। আইজঐ পয়লা। তিন চাইর বচ্ছর ধইরা বিচনায় পড়ছি কোনওদিন এমুন অয় নাই। শীতের দিনে মাইনষের ইট্টু ঘন ঘন পেশাব অয়। হের লেইগা বিচনায় পেশাব করুম, এমনু। কোনওদিন অয় নাই। এই শীতটা টিকুম তো! নাকি এইবারের শীতে উড়াইয়া নিবো আল্লায়! মরণের আগে বলে এমুন অয় মাইনষের। কী করে না করে উদিস পায় না!
মৃত্যুর কথা শুনে ভিতরে ভিতরে দমে গেল কুট্টি। শীতের শুরুতেই ছনুবুড়ি গেল, আবার যদি বড়বুজানও যায়!
মৃত্যুর কথা ভাবলে বুকের ভিতর কেমন করে কুট্টির। মনে হয় দেশ গ্রামের একেকজন মানুষ একেকটা গাছ, বাড়ির একখান ঘর। সেই ঘর ভেঙে নিলে সেই গাছটা কেটে ফেললে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যায়, শূন্য হয়ে যায়। সেই শূন্যতার দিকে তাকালে বুকটা হাহাকার করে। বড়বুজান যদি না থাকে, বড়বুজান যদি মরে যায় তাহলে এই পালঙ্কটা খালি হয়ে যাবে। হঠাৎ করে খাটালে ঢুকলে বুকটা ছ্যাত করে উঠবে কুট্টির। একজন মানুষের শূন্যতা কেমন করে সয় অন্য মানুষ! ছনুবুড়ির শূন্যতা কেমন করে সইছে তাদের বাড়ির লোক!
বড়বুজান বলল, তুই চেতিচ না বইন। আমারে ইট্টু উডা। বিচনাডা বদলাইয়া দে। ভিজা জাগায় হুইয়া থাকতে ভাল্লাগে না।
কুট্টি নরম গলায় বলল, আর ইট্টু থাকেন। ঘাডে গিয়া মাছ ধুইয়াহি আমি, তারবাদে চুলায় পানি গরম দিয়া আইয়া বেবাক কেথা কাপোড় রইদ্দে দিমুনে। আপনেরেও নাওয়াইয়া দিমুনে। ইট্টু সবুর করেন।
বড়বুজান বিগলিত গলায় ললেন, আইচ্ছা বইন, আইচ্ছা।
পায়ের কাছ থেকে কোটা মাছের খাদা ভোলার জন্য উপুড় হল কুট্টি ঠিক তখনই খাদা থেকে মুখ তুলে চঞ্চল ভঙ্গিতে পালঙ্কের তলার অন্ধকারে ছুটে গেল বিলাইটা। মুখে কামড় দিয়ে ধরা দুই টুকরা মাছ। কুট্টিকে বড়বুজানের লগে কথা বলায় ব্যস্ত দেখে, মাছের গন্ধে পালঙ্কের তলা থেকে বেরিয়ে আসছিল সে। একদিকে বড়বুজান কাজ বাড়িয়েছে অন্যদিকে বিলাইতে লইয়া যায় কোটা মাছ, অন্য সময় হলে এইসব নিয়া গলা চড়াত কুট্টি। খানিক আগে যেটুকু চড়িয়েছিল তারচেয়ে শতগুণ চড়াত। কিন্তু এখন তেমন কিছুই করল না। বিলাইটার জন্যও অদ্ভুত এক মায়া হল তার। খাউক, দুই টুকরা মাছই তো! না খাইতে পাইয়া বিলাইডা যুদি মইরা যায়, এই যে ঘরের ভিতরে টুকটাক ঘুইরা বেড়ায়, খাইতে বইলে পাতের সামনে ঘুরঘুর করে, ম্যাও ম্যাও করে আর নাইলে আল্লাদ দেহায় এই হগল কুট্টি পাইবো কই! ঘর খালি খালি মনে অইবো না!
.
১.৩৪
ঘন কচুড়ির তলার পানি এমন ঠাণ্ডা হয়, খরালিকালে ডুব দিয়ে কচুরির তলায় গেলে শরীর জুড়ায় আর শীতকালে গেলে শরীর হিম। প্রথমে কাঁটা দেয় শরীরে তারপর শক্ত হতে থাকে। এজন্য শীতকালে কচুরির তলায় যেতে হলে কেউ কেউ খুব জুত করে সউষ্যার তেল মাখে গায়ে। তেল মাখার সময় হাত দুইটা শরীরের এইদিক ওইদিক ঘুরপাক খায় বলে শরীরে এমনিতেই তৈরি হয় এক ধরনের উষ্ণতা, তার ওপর আছে তেলের উষ্ণতা। দুয়ে মিলে কচুরির তলার পানিকে কাবু করা যায়। তবে কচুরি তোলা আর চাক বেড় দিয়ে মাছ ধরার ব্যাপার থাকলে পানিতে নামার লগে লগে পানির ঠাণ্ডায় ধরতে না ধরতেই কাজের চাপে গরম হয় শরীর, পানির ঠাণ্ডা তো উদিস পাওয়া যায়ই না, একটু পর লাগে গরম। ঘাড় গলা, বুক পিঠ ঘামতে শুরু করে।
