তবে কাশেমকে দেখে অন্যরকমের একটা অনুভূতি হল আলফুর। মাত্র মান্নান মাওলানার কথা ভেবেছে, মান্নান মাওলানাকে বকাবাজি করেছে ঠিক তখনই কি না তার বাড়ির গোমস্তাকে বসে থাকতে দেখল মিয়া বাড়ির হিজলতলায়! অবাক কাণ্ড! এর মধ্যে আল্লাহ্পাকের কোনও ইশারা নাই তো! নাকি মান্নান মাওলানা কোনও অলৌকিক ক্ষমতায় আলফুর মনে মনে দেওয়া গালি শুনতে পেয়েছেন? বাড়ির গোমস্তাকে সেজন্য পাঠিয়েছেন এখানে!
মুখে কথা কম বলা হয় বলে মনে মনে সারাক্ষণই কথা বলে আলফু। এখনও তেমনই বলতে লাগল। আমি হুনছি বদ মাওলানারা কুফরি কালাম জানে। কুফরি কালামের জোরে কি মাকুন্দা কাশেমরে পাডাইছে এহেনে!
ততক্ষণে হিজলতলায় এসে পড়েছে আলফু। তার পায়ের শব্দ পেল না কাশেম। যেমন বসেছিল বসে রইল। পিছন ফিরে তাকাল না।
কিন্তু পিঠে এমুন দাগ ক্যান কাইশ্যার! কী অইছে? পিঠে আর ঘেটিতে ফ্যারা উঠলে যেমুন অয় তেমুন বিনবিনা গোটা।
এই সব দেখে খানিক আগের ভাবনা চিন্তা মন থেকে হাওয়া হয়ে গেল আলফুর। অবাক গলায় কাশেমকে ডাকল সে। ঐ কাইশ্যা।
আলফুর দিকে মুখ ফিরাল কাশেম। কাতর চোখে আলফুর দিকে তাকিয়ে রইল।
তার দিকে মুখ ফিরাবার পর কাশেমের মুখ দেখে চমকে উঠল আলফু। মুখটা বীভৎস হয়ে আছে। নিচের ঠোঁটের মাঝ বরাবর কেটে ঝুলে পড়েছে ঠোঁট। ডানদিকের চোখের কোণ এমন করে ফুলছে, চোখটাই ঢাকা পড়ছে। গাল কপাল ভরা দাগ, থ্যাতলানো, ফুলা ফুলা। মুখ আর মানুষের মুখ মনে হয় না।
দিশাহারা গলায় আলফু বলল, কী অইছেরে তর? মুখহান এমুন ক্যা?
আলফুর কথার জবাব দিতে পারল না কাশেম। পানিতে চোখ ভরে এল। কাঁদতে লাগল সে।
কাঁধের ঝাঁকিজাল মাটিতে রেখে কাশেমের পাশে বসল আলফু। একটা হাত রাখল তার কাঁধে। গভীর সহানুভূতির গলায় বলল, কী অইছে তর, আমারে ক। কে মারছে?
অতিরিক্ত কষ্ট পাওয়া মানুষ যখন কাঁদে, যত নিঃশব্দেই কাঁদতে থাকে তারা, বুক ঠেলে বেরয় তাদের অদ্ভুত কষ্টের এক শব্দ। কাশেমের কান্নার লগেও মিশে যাচ্ছিল তেমন শব্দ। সেই শব্দে বুক তোলপাড় করতে লাগল আলফুর। কাশেমের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ক আমারে, ক, কে মারছে তরে?
কাশেম জড়ান গলায় বলল, হুজুরে।
ক্যা? কী অন্যায় করছস তুই?
ছনুবুজির জানাজা পড়ছি এইডা আমার অন্যায়।
কচ কী!
হ।
দুই হাঁটুর মাঝ বরাবর মুখ নামিয়ে লুঙ্গির খুঁটে চেপে চেপে চোখ মুছতে লাগল কাশেম। কান্না তবু কমল না। জড়ানো গলায় বলল, খালি মাইরাঐ ছাইড়া দেয় নাই, বাইত থিকাও বাইর কইরা দিছে। কইছে ওই বাইত্তে আমার আর জাগা নাই। ঐ বাইত্তে উটলে আমারে হেয় জব কইরা হালাইবো। জন্মের পর থিকা ওই বাইত্তে থাকি আমি। অন্য কোনওহানে গেলে ঘুম আহে না। লাতথি দিয়া হুজুরে আমারে বাড়ির নামায় হালায় দিছে। তাও রাইত দোফরে, বাড়ির বেবাক মানুষ ঘুমাইয়া যাওনের পর বাড়ির সামনের নাড়ার পালাডায় গিয়া হুইয়া রইছি। এক পলকের লেইগাও ঘুমাইতে পারি নাই। মাশায় আমারে খাইয়া হালাইছে। দেহ শইলডা কী করতাছে! এতেও আমার কোনও দুঃখ নাই। মাশায় আমারে যত ইচ্ছা খাউক, আমি খাই কী! দুইদিন ধইরা না খাইয়া রইছি। আলফু ভাই, সব কষ্ট সইজ্জ করন যায়, খিদার কষ্ট সইজ্জ করন যায় না। এত মাইর মারলো হুজুরে, এত বেদনা শইল্লে, খিদার কষ্টে হেই বেদনা আমি উদিস পাই না। আমার মা বাপ নাই, ভাই বইন নাই, কার কাছে যামু আমি! কে আমারে একওক্ত খাওন দিব?
হাঁটুতে মুখ গুঁজে আবার কাঁদতে লাগল মাকুন্দা কাশেম।
.
১.৩৩
দোতালা ঘরের খাটাল থেকে খুনখুনা গলায় ডাকতে লাগলেন বড়বুজান। কুট্টি রে, ও কুট্টি, এইমিহি ইট্টু আয়। তাড়াতাড়ি আয় বইন।
রান্নাঘরের সামনে বসে মাছ কুটছিল কুট্টি। দুইটা শোলটাকি (ছোট শোল। বাচ্চা অর্থে) কুটে ছাই আর মাছের আঁশ নিয়েছে ভাঙা কুলায়, পোড়ামাটির খাদায় নিয়েছে কোটা মাছ। মাছ ধুতে ঘাটে যাওয়ার আগে মাছের আঁশ আর ছাই ফেলে যাবে চালতাতলায়, খাদা কুলা হাতে মাত্র উঠে দাঁড়িয়েছে তখনই ওই ডাক। তবে ডাকের লগে বইন কথাটা খুব কানে লাগল কুট্টির। এই বাড়ির মানুষ খুব সহজে আদরের ডাক ডাকে না কাউকে। বিপদে পড়লে ডাকে আর নয়তো কাউকে দিয়ে কোনও বাড়তি কাজ আদায় করতে হলে। বড় বুজানের কী এমন কাজ পড়ল! সকালবেলার সব কাজ সারিয়ে, কুট্টি বের হয়েছে সংসারের অন্যকাজে। সেটা তো বেশিক্ষণ হয় নাই।
রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছিল কুট্টি, সাড়া দেওয়ার কথা মনে ছিল না। বড় বুজান আবার ডাকলেন। কুট্টিরে, ও বইন, হোন না?
এবার সাড়া দিল কুট্টি। কী কন?
এইমিহি ইট্টু আয়।
ক্যা?
কাম আছে।
আমি অহন আইতে পারুম না। মাউচ্ছা হাত (মাছের গন্ধ আঁশ ইত্যাদি লেগে থাকা হাত)।
মাউচ্ছা হাতে কিছু অইবো না। আয় বইন।
বুজানের কাতর অনুনয়ে যেমন বিরক্ত হচ্ছিল কুট্টি তেমন মায়াও লাগছিল। নিশ্চয় কোনও ঝামেলা হয়েছে নয়তো এসময় এমন করে ডাকতো না।
কুলা মাছের খাদা একপাশে নামিয়ে রেখে রান্ধনঘরের সামনে রাখা ঠিলা কাত করে খলবল করে হাত দুইটা ধুয়ে নিল কুট্টি। শাড়ির আঁচলে হাত মুছে মাছের খাদা নিয়ে দোতালা ঘরের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। কুলা পরে পরিষ্কার করলেও হবে। এখন বড় বুজানকে দেখে উত্তর দিকের বারান্দা টপকে ঘাটে গিয়ে মাছটা ধুয়ে আনলেই হবে। তাছাড়া মাছ এভাবে ফেলে রেখে যাওয়া যাবে না। কাউয়া চিলের ভয় আছে, বিলাইয়ের ভয় আছে। বাচ্চা দেওয়া বিলাইটা সারাক্ষণ কাতর হয়ে আছে ক্ষুধায়। খেয়ে না খেয়ে পাঁচটা বাচ্চা পাহারা দিচ্ছে ঘরে বসে। চারদিন হল জায়গা বদল করেছে। ঘেটি (ঘাড়) কামড়ে ধরে একটা একটা করে বাচ্চা এনে রেখেছে বড় বুজানের পালঙ্কের তলায়। যতবার খেতে বসে ততবারই টিনের চলটা ওঠা বাটিটায় করে মাছের কাটাকোটা, নিজের পাতের মাখা ভাত কিছুটা পালঙ্কের তলায় রেখে আসে কুট্টি। তবু ক্ষুধা বিলাইটার কমে না। সুযোগ পেলেই এইটা ওইটা নিয়া দৌড় দেয়।
