আগেরবার ডেকে মেয়ের কোনও সাড়া পায় নাই দবির। আবার ডাকল, নূরজাহান।
নূরজাহান ধীর গলায় সাড়া দিল। উ।
কী গো মা, ঘুম আহে না?
না বাবা।
ক্যা গো মা?
কইতে পারি না। মনডা জানি কেমুন লাগ্র।
আমার কাছে আইয়া হুইবা?
হ।
আহো।
চকি থেকে নামল নূরজাহান। দবিরের কোলের কাছে এসে বসল।
হুঁকা রেখে একহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরল দবির। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ছনুবুজি মইরা গেছে দেইক্কা এমুন লাগতাছে তোমার, না মা?
হ বাবা।
বাপ যখন জড়িয়ে ধরে নূরজাহানকে বয়স কমে যায় তার, শিশু হয়ে যায়। এখনও হল। বাপের বুকের লগে মিশে গেল নূরজাহান।
গভীর মমতায় মেয়ের মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে দবির বলল, বেবাক মাইনষেরঐ একদিন না একদিন মরণ লাগবো মা, এইডাঐ দুইন্নাইর নিয়ম।
নূরজাহান কাতর গলায় বলল, এমুন নিয়ম ক্যা দুইন্নাইর?
দুইন্নাইডা যে বানাইছে এইডা তার নীলাখেলা মা। জীবন দিবোও হে, নিবোও হে।
তাইলে মাইনষের মনের মইদ্যে এত মায়া মহব্বত দেওনের কাম আছিলো কী? কাইল বিয়ালেও যেই মানুষটা আছিল আইজ বিয়ানে হেয় নাই। এই কষ্ট অন্য মাইনষে সয় কেমতে!
দবির কথা বলল না, কুপির আলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
নূরজাহান বলল, ছনুফুলুর লগে আমার আর কোনওদিন দেহা অইবো না, দেশ গেরামে ঘোরতে ঘোরতে কোনওদিন আর দেহুম না মাডির মিহি বেকা অইয়া রাস্তা দিয়া আইট্টা যাইতাছে ফুবু। এর কথা অরে কইতাছে, কাইজ্জাকীত্তন লাগায় দিতাছে। একদিন দেহি মেন্দাবাড়ির ঝাকা থিকা পটপট কইরা কয়ডা ঢেরস ছিঁড়ল। এইমিহি চায়, ওইমিহি চায় আর ছিঁড়ে। আমি দৌড়াইয়া উটতাছি বাইত্তে, আমারে দেইক্কা এমুন শরম পাইলো! পয়লা মুখখানা গেল কালা অইয়া, তারবাদে হাসলো। কেঐরে কইচ না মা! খিদা লাগছে তো এর লেইগা ছিড়লাম। কাঁচা ঢেরস চাবাইয়া খাওন যায়। খাইতে সাদ, পেডও ভরে। কী করুম ক! পোলারবউ ভাত দেয় না। ঢেরস কোছরে গুইজ্জা হাজামবাড়ি মিহি গেল গা ফুবু। বাবা, আইজ হারাদিন আমার খালি এই কথাডা মনে অইছে। ফুবু আমারে দেইক্কা শরম পাইছিল, কইছিলো কতাডা আমি যেন কেঐরে না কই। আমি কই নাই বাবা, কোনওদিন কেঐরে কই নাই। আইজ পয়লা তোমারে কইলাম। ফুবু মইরা গেছে দেইক্কা কইলাম।
ফোপাইয়া ফোপাইয়া (ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে) কাঁদতে লাগল নূরজাহান। জড়ানো গলায় বলতে লাগল, আল্লায় মাইনষের পেডে এত খিদা দিছে ক্যা বাবা? ক্যা দিছে এত খিদা! জীবন দিছে, মরণ দিছে, খিদাডা দেওনের কাম আছিলো কী!
.
১.৩২
মিয়াদের পুকুরপারের পুরানা হিজল গাছটার তলায় খালি গায়ে বসে আছে মাকুন্দা কাশেম। গায়ের রঙ বাইল্লামাছের মতো বলে হিজলের ছায়ায় ফুটে আছে সে।
ঝাঁকিজাল হাতে আলফু যাচ্ছিল পুকুরের পুব দক্ষিণ কোণে। সেখানে পুকুরপার ভরা কাশের জঙ্গল আর পুকুরের পানিতে ঠাসাঠাসি কচুরি। কচুরি আর কাশের রঙ প্রায় একরকম। শুধু ফুল ফুটেছে দুই রঙের। কাশফুল মানুষের মাথার পাকা চুলের মতো আর কচুরিফুল গ্রাম রমণীর হাতের চুড়ির মতো, নীল বেগুনীতে মিশানো। পানির তলায় ডুবে থাকা কচুরির ছোবা (ছোবড়া) দেখতে মান্নান মাওলানার দাঁড়ির মতো। মান্নান মাওলানার দাঁড়ির ভিতর যেমন লুকিয়ে থাকে নানারকম শয়তানি এই পুকুরের কচুরির ছোবার ভিতর তেমন করে লুকিয়ে থাকে কই রয়না খলিসা ফলি। সুযোগ পেলেই মান্নান মাওলানা যেমন কাঁকুই দিয়ে দাঁড়ি আঁচড়ান প্রায় তেমন করেই কোনও কোনওদিন ঝাঁকিজাল দিয়ে কচুরির চাক বেড় দেয় আলফু। কচুরির ছোবার আড়ালে লুকিয়ে থাকা জিয়ল মাছ ধরে ঘোপায় (মাছ জিয়াবার মাটির হাঁড়ি) রাখে।
দাঁড়ির ভিতর লুকিয়ে থাকা শয়তানিও কি প্রায় এই কায়দাই মনের ভিতর জিইয়ে রাখেন মান্নান মাওলানা!
আজ সকালে ঝাঁকিজাল কাঁধে, হাতে পোড়ামাটির বড় একটা ঘোপা, পুকুরের দিকে যেতে যেতে এই কথাটা মনে হল আলফুর। মান্নান মাওলানা যে এত বদ, ছনুবুড়ির মৃত্যুর দিন আলফু তা টের পেয়েছে। মজনুর মুখে সব শুনে আলফুর মতো লোকও বুঝে গিয়েছিল সব মিথ্যা, সব শয়তানি মান্নান মাওলানার। ভুল ফতোয়া দিয়েছে সে। মানুষের মৃত্যু নিয়েও এমন করতে পারে মানুষ! তাও যার নামের শেষে আছে মাওলানা! মাথায় টুপি, মুখে দাঁড়ি, হাতে তসবি। কথায় কথায় আল্লাহর নাম নিচ্ছে কিন্তু করতাছে সব বদকাজ! মানুষ এমন হয় কী করে!
পাশাপাশি মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের কথাও মনে পড়ল আলফুর। ফেরেশতার মতো পবিত্র মানুষ। আচার আচরণ কথাবার্তা সব মিলিয়ে মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব হচ্ছেন যথার্থ পরহেজগার, সৎ ধার্মিক মানুষ। কী যত্নে কী মমতায় ছনুবুড়ির জানাজা পড়লেন, লাশ কাঁধে নিয়ে গেলেন গোরস্থানে।
এসব ভেবে মনে মনে মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবকে সালাম দিল আলফু আর মান্নান মাওলানাকে দিল খুব খারাপ দুই তিনটা বকা। বিড়বিড় করে বলল, মুখে খালি দাঁড়ি থাকলেঐ অয় না, মাথায় খালি টুপি থাকলেঐ অয় না, দিল সাফ থাকতে অয়, মাইনষের লেইগা মহব্বত থাকতে অয়, কোরান হাদিস ঠিক মতন জানতে অয়, নাইলে মাওলানা অওন যায় না।
ঠিক তখনই হিজলতলায় বসে থাকা মাকুন্দা কাশেমকে দেখতে পেল আলফু। কাশেমের মুখ দেখতে পেল না, পেল পেছন দিকটা। তবু কাশেমকে চিনতে অসুবিধা হল না। এরকম গায়ের রঙ এই গ্রামে আর কারও নাই।
