মান্নান মাওলানা বললেন, ঐ কাইশ্যা, চুন্নির লাচ কী করতাছে রে? পদ্মায় নিয়া হালাইছে না মড়কখোলায়?
কাশেম যেন আকাশ থেকে পড়ল। গাঙ্গে হালাইবো ক্যা, মড়কখোলায় হালাইবো ক্যা?
তয় কী করতাছে?
গোড় দিছে।
কই?
গোরস্থানে।
কচ কী?
হ।
জানাজা ছাড়াঐ গোড় দিছে?
জানাজা ছাড়া দিবো ক্যা? মানুষ মরণের পর যা যা করে ছনুবুড়িরেও তা তা কইরা গোড় দিছে।
জানাজা পড়াইলো কে?
খাইগো বাড়ির হুজুরে। মজনু গিয়া তারে ডাইক্কা লইয়াইছে। হুজুর নিজে বইয়া থাইক্কা বেবাক নিয়ম কানন কইয়া দিল। হুজুরের কথা মতন আলার মা বুজানে আরও দুই তিনজন মাইয়ালোক লইয়া ছনুবুড়িরে নাওয়াইলো, কাফোন ফিন্দাইলো। বাড়ির নামায় লাচ রাইক্কা জানাজা পরলো হুজুরে। তারবাদে নিজে লাচ কান্দেও লইলো। বড় মেন্দাবাড়ির লাম্বা সোনা মিয়ায় আছিলো তার লগে। ভাল মানুষ অইছিলো জানাজায়। আমিও গেছিলাম।
এমনিতেই তাঁর কথা অমান্য করে খান বাড়ির মসজিদের ইমামকে এনে জানাজা পড়ান হয়েছে ছনুবুড়ির, ইমাম সাহেব নিজে গেছেন গোরস্থানে, লাশ কাঁধে নিয়েছেন শুনে রাগে ভিতরে ভিতরে ফেটে যাচ্ছিলেন মান্নান মাওলানা। তার ওপর তার বাড়ির গোমস্তা গেছে সেই জানাজায়, এটা তিনি আর সহ্য করতে পারলেন না। হঠাৎ করেই কাশেমের কোকসা বরাবর জোরে একটা লাথথি মারলেন। আচমকা এমন লাথথি, হুড়মুড় করে আইল্লার ওপর পড়ল কাশেম। নিজের ফুঁ দিয়ে জ্বালানো আগুন মুখের একটা দিকে লাগল তার। লগে লগে বাবাগো বলে লাফিয়ে উঠল কাশেম। তার পা হাতে লেগে আইল্লার আগুন ছড়িয়ে পড়ল আধালের সামনের মাটিতে। মান্নান মাওলানা সেসব পাত্তা দিলেন না। পা থেকে পরম খুলে শরীরের সব শক্তি দিয়ে পিটাতে লাগলেন কাশেমকে। অবলা জীবের মতন মার খেতে খেতে, ঙো ঙো করে কাঁদতে কাঁদতে কাশেম তখন একটা কথাই বলছে, আমারে মারেন ক্যা, আমি কী করছি! ওরে বাবারে, ওরে বাবারে। মাইরা হালাইলোরে, আমারে মাইরা হালাইলো!
কাশেমকে সমানে পিটাচ্ছেন বলে কোন ফাঁকে মান্নান মাওলানার মাথার টুপি খুলে পড়ে গেছে মাটিতে, হাতের তসবি পড়ে গেছে সেসবের কোনও দিকেই তার খেয়াল নাই। কাশেমকে পিটাতে পিটাতে দাঁতে দাঁত চেপে তিনি তখন বলছেন, চুতমারানির পো, কাম করো আমার বাইত্তে, খাও আমারডা, জানাজা পড়তে যাও আমার কথা ছাড়া! যেই জানাজা অইব না, যেই জানাজায় আমি যাই নাই ঐ জানাজায় আমার বাড়ির চাকর যায় কেমতে! তুই আমার বাইত থিকা বাইর অ শুয়োরেরবাচ্চা। তর লাহান বেঈমান আমি রাখুম না।
পিটাতে পিটাতে কাশেমকে তখন বারবাড়ির দিকে নিয়া আসছেন মান্নান মাওলানা। বাড়ির নামার দিককার রাস্তার মুখে এনে এমন একখান লাথি মারলেন, সেই লাথথিতে কাশেম গড়িয়ে পড়ল বাড়ির নামায়। তখনও গোঙাচ্ছে। নাকমুখ দিয়ে দরদর করে পড়ছে রক্ত। রক্তে কান্নায় মাকুন্দা মুখটা গেছে বীভৎস হয়ে। এই মুখের দিকে একবারও তাকালেন না মান্নান মাওলানা। আগের মতোই দাঁতে দাঁত চেপে বলতে লাগলেন, আমার বাইত্তে তর আর জাগা নাই। এই তরে বাইর করলাম, আমার বাইত্তে তুই আর ঢুকবি না। আমি সব দেকতে পারি, বেঈমান দেকতে পারি না।
খান বাড়ির মসজিদ থেকে তখন ভেসে আসছিল মাগরিবের আজান। সেই পবিত্র সুরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল একজন অসহায় মানুষের কান্না। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছিল দিনশেষের অন্ধকার। দুনিয়াদারি মৌন হচ্ছিল গভীর বেদনায়।
১.৩১-৩৫ দবির নরম গলায় ডাকল
দবির নরম গলায় ডাকল, নূরজাহান।
চকির ওপর পাশাপাশি শুয়েছে হামিদা আর নূরজাহান। মেঝেতে নিজের বিছানায় বসে ঘুমাবার আগের তামাকটা খেয়ে নিচ্ছে দবির। অদূরে গাছার ওপর জ্বলছে কুপি। জানলা দুয়ার বন্ধ ঘরের ভিতর ওইট্টুকু আলো বেশ চোখে লাগছে। চারদিকে অন্ধকার, শুধু এক জায়গায় সামান্য আলো। ফলে পরিবেশ থমথমা। এই থমথমা ভাব ভেঙে যাচ্ছিল দবির গাছির তামাক টানার শব্দে।
নূরজাহান দুই তিনবার এপাশ ওপাশ করেছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। তবে হামিদার লড়াচড়া নাই, সাড়াশব্দ নাই। আজ সারাদিন বেশ একটা ধকল গেছে তার। যে ধকল শীতের মাঝামাঝি থেকে কোনও কোনওদিন যাওয়ার কথা সেই ধকল শীতের প্রথম দিনেই হামিদার উপর দিয়ে একবার গেল। প্রথম দিনকার রস বিক্রি না করে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল দবির। দিনভর সেই রস জ্বাল দিয়ে তোয়াক করেছে হামিদা। তার ওপর সংসারের অন্যান্য কাজকাম তো ছিলই। নূরজাহান বাড়িতে থাকলে সেও হাত লাগাতে মায়ের লগে। একা সবদিক সামলাতে হতো না হামিদাকে। কিন্তু নূরজাহান বাড়িতে ছিল না। সকালবেলা সেই যে মুখের রস ফেলে ছুটে গিয়েছিল ছনুবুড়িকে শেষ দেখা দেখতে, মুর্দারের খাট কাঁধে পুরুষ মানুষরা গোরস্থানের দিকে রওনা দেওয়ার অনেক পর বাড়ি ফিরেছে। তখন পুরাপুরি বিকাল। সারাদিন পেটে কিছু পড়ে নাই তার উপর কানছে (কেঁদেছে), চোখ দুইটা ফুলা ফুলা, লাল, মুখটা শুকাইয়া ছোট হয়ে গেছে। দবির যাচ্ছিল হাঁড়ি পাততে, নূরজাহানকে দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল তার। যেন মা বাবার মতোই কোনও আপনজন ছেড়ে গেছে নূরজাহানকে। মানুষের জন্য এত মায়া মেয়েটার!
নূরজাহান আবার পাশ ফিরল, আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
