দিনভর জমা তরিতরকারির ছালবাকল আর ভাতের সাদাফ্যান মিলেমিশে গামলায় তখন অদ্ভুত একটা গন্ধ। গন্ধটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা। খৈল ভুষি মিশানো গরম পানি বালতি বালতি পড়ার লগে লগে বদলে যায় সেই গন্ধ। গাইগরুদের ক্ষুধার উদ্রেক করে এমন একটা গন্ধ বেরয় তখন। গন্ধে গরুগুলি হঠাৎ করে যায় দিশাহারা হয়ে। আথালে বান্ধা গলার সামনে তাদের মোটা শক্ত একখান বাঁশ। আথালের এইমাথা থেকে ওইমাথা পর্যন্ত লম্বা। এই একটা বাঁশেই সার ধরে বান্ধা থাকে গরুগুলি। আথাল থেকে গলা বাড়িয়ে দুইটা করে গরু মুখ দিতে পারে একেকটা গামলায়, গামলাগুলি এভাবে রাখা হয়েছে। খৈল ভুষি মিশান গরমপানি গামলায় পড়বার লগে লগে গরুগুলি যায় পাগল হয়ে। দিশাহারা ভঙ্গিতে গামলায় মুখ দেয়, দিয়েই ছটফটা ভঙ্গিতে মুখ সরিয়ে নেয়। হঠাৎ করে গরম পানিতে মুখ দিলে তো এমন হবেই!
প্রতিদিন একই ভুল করে গরুগুলি। দেখে মাকু কাশেম খুব হাসে। বেশ একটা মজা পায়। মন মেজাজ ভাল থাকলে ঠাট্টা মশকরাও করে গরুদের লগে। হালার গরু কি আর এমতেই গৰু অইছে! রোজঐ মুক পোড়ে, রোজঐ মুক দেয়। মাইনষের লগে গরুর তাফাত অইলো এইডাঐ। মাইনষে এক ভুল বারবারে করে না। গরুরা করে।
আর মেজাজ খারাপ থাকলে মুখে যা আসে তাই বলে গরুদের সে বকাবাজি করে। তবে গরুরা ওসব পাত্তা দেয় না। তারা ব্যস্ত থাকে জাবনা নিয়া। কখন মুখ দেওয়ার মতন ঠাণ্ডা হবে জাবনা, কখন খাওয়া যাবে।
আজও তেমন ভঙ্গিতেই অপেক্ষা করতাছে গরুরা। কাশেমও তার কাজ নিয়ম মতনই করে যাচ্ছে। তবে অন্যান্য দিনের তুলনায় কাশেম আজ অন্যরকম। না গান গাইছে না গরুদের লগে ঠাট্টা মশকরা করতাছে, না বাবাজি করতাছে। চুপচাপ কাজ করে যাচ্ছে। মান্নান মাওলানা ছিলেন বারবাড়ির দিকে। শীত বিকালের পশ্চিম আকাশে তাকিয়ে সূর্য ডোবার সময়টা দেখতে চাইছিলেন তিনি। খানিক আগে অজু করেছেন। এখনই আজান দেবেন। তারপর বাংলাঘরের চকির উপর, কান্দিপাড়ার ওদিককার কোনও এক মুরিদের সৌদি আরব থেকে এনে দেওয়া পবিত্র কাবা শরীফের চিত্র আঁকা লাল আর সবুজ রঙের। মিশেলে তৈরি মখমলের জায়নামাজে নামাজ পড়তে বসবেন। এ সময় মাথায় সাদা গোলটুপি থাকে তার, হাতে থাকে তসবি। আজান না দিয়ে এ সময় তিনি ভিতর বাড়ির দিকে আসেন না। আজ এলেন। কারণ বারবাড়ির সামনে, নাড়ারপালার সামনে দাঁড়ালেও আথালের দিকে মাকুন্দা কাশেমের সাড়া পান। হয় গান গায় কাশেম না হয় গরুদের লগে কথা বলে। আজ তার কিছুই হচ্ছে না দেখে অবাক হয়ে আথালের সামনে এলেন। পায়ে টায়ারের দোয়াল (বেল্ট) দেওয়া কাঠের খরম। হাঁটলে চটর পটর শব্দ হয়। এখনও হচ্ছিল। সেই শব্দ শুনেও গা করল না কাশেম, নিঃশব্দে নিজের কাজ করতে লাগল। জাবনা দেওয়া হয়ে গেছে, গরম পানির তেজও গেছে কমে। গরুরা মনের আনন্দে খচরমচর শব্দে খেয়ে যাচ্ছে। আথালের অদূরে বসে বড় একখান আইল্লায় (মাটির মালশা) নারিকেল ছোবড়ার আগুন ফুঁ দিয়ে দিয়ে জ্বালাচ্ছে কাশেম। ছোবড়া পুড়ে যখন লাল দগদগে হবে তখন ছিটিয়ে দিবে ধুপ। সাদা ধুমায় আচ্ছন্ন হবে চারদিক, সুন্দর গন্ধ উঠবে, সারাবাড়ি ভরে যাবে সেই গন্ধে।
তবে ধুপটা কাশেম গন্ধের জন্য জ্বালায় না। বহুত মশা হয়েছে বাড়িতে। বাড়ির লোকজনকে তো পায় না, তারা শোয় মশারির ভিতর, মশারা খায় কী! তারা সব এসে পড়ে গুরুগুলির উপর। অবলাজীব, রাতেরবেলা আর ঘুমাতে পারে না। লেজ ঝাপটা দিয়া শুধু মশা খেদায়। এজন্য ধুপ দেয় কাশেম। মোটা লুছনি দিয়ে আইল্লা ধরে আথালে ঢুকে একবার এই মাথায় যায় আরেকবার ওই মাথায়। সাদা ঘন ধুমায় চোখ একেবারেই অন্ধ হয়ে যায় তার। নিজেকেও তখন দেখতে পায় না কাশেম, গরুদেরও দেখতে পায় না। আন্দাজ করে করে হাঁটে। আর ধুপের ধুমায় বেদম আনন্দে ঝোপঝাড় আর কচুরিপানার অন্ধকার থেকে মাত্র বেরিয়ে আসা মশারা তখন গান না ধরে বেদিশা হয়ে পালায়। খুব সহজে এইমুখি আর হয় না। যে বাড়ির আথালে গরু আছে ঠিকই মাকুন্দা কাশেম নাই, ধুপ নাই, তারা তখন সেইমুখি হয়।
কাশেমের অদূরে দাঁড়িয়ে আজ সন্ধ্যায় কাশেমকে খেয়াল করলেন মান্নান মাওলানা। তারপর গলা খাকারি দিয়ে বললেন, ঐ বেডা কী অইছে তর?
আইল্লায় ফুঁ দিতে দিতে কাশেম বলল, কী অইবো! কিছু অয় নাই।
তাইলে যে এত চুপচাপ!
মন ভাল না।
শুনে মান্নান মাওলানা খিক করে হাসলেন। তর আবার মনও আছেনি?
মুখ বন্ধ করে মাওলানা সাহেবের দিকে তাকাল কাশেম। করুণ মুখ করে বলল, হ ঠিক কইছেন। গরিব মাইনষের আবার মন থাকেনি! চাকর বাকরগো আবার মন থাকেনি!
কচ কী! আরে কচ কী তুই! এই পদের কথা কই হিগলি? এক্কেরে বাইসকোপের লাহান কথা!
আবার আইল্লায় ফুঁ দিতে লাগল কাশেম। ফুঁ দিতে দিতে বলল, আপনের আয়জানের সমায় অইয়া গেছে হুজুর। যান আয়জান দেন গা, নমজ পড়েন গা।
মান্নান মাওলানা খ্যাক খ্যাক করে উঠলেন। আমি কী করুম না করুম হেইডা তর চিন্তা করনের কাম নাই। তর কী অইছে ক।
ছনুবুড়ির লাশ দেহনের পর থিকা মন ভাল না। খালি মউতের কথা মনে অয়।
ছনু নামটা শোনার লগে লগে একত্রে অনেকগুলি প্রশ্ন মনে উদয় হল মান্নান মাওলানার। সকালবেলা ছনুবুড়ির মৃত্যুর কথা শোনার পর হলদিয়া চলে গিয়েছিলেন। হলদিয়া বাজারের পুবদিকের এক বাড়িতে বড়মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সেই মেয়ের ঘরের মাজারো নাতির ফ্যারা (হাম) উঠছে। কাজির পাগলা বাজার থেকে নাতির জন্য গান্ধী ঘোষের রসগোল্লা নিয়ে গিয়েছিলেন। আথকা বাপকে দেখে মেয়ে আর জামাই দুইজনেই গেছে দিশাহারা হয়ে। ছেলের অসুখ ভুলে বাপ নিয়ে ব্যস্ত হয়েছে একজন, শশুর নিয়ে ব্যস্ত হয়েছে একজন। মোরগ জবাই করে, চিনিগুড়া চাউলের পোলাও, ঘন দুধ, গান্ধী ঘোষের রসগোল্লা, বেদম একখান খাওয়া হয়েছে। সেই খাওয়া খেয়ে, দুপুরে ঘুম দিয়ে খানিক আগে বাড়ি ফিরেছেন মান্নান মাওলানা। ছনুবুড়ির লাশের কী হল সেসব আর জানা হয়নি। মজনুকে বলে দিয়েছিলেন ছনুবুড়ির জানাজা হবে না, মাটি হবে না। লাশটা ওরা কোথায় ফেলল!
