.
১.৩০
আথালের বাইরে মাটির ভুরার (ডিবি) ওপর চারটা গামলা বসান। একেক ভুরাতে একেকটা। ভুরার চারকোণায় চারটা মাঝারি ধরনের মোটা বাঁশের খুঁটি পোতা। খুঁটিগুলি গামলার মাথা ছাড়িয়ে বেশ খানিকদূর উঠেছে। মান্নান মাওলানার বাড়ি তিন শরিকের বড় গিরস্তবাড়ি। পুবে পশ্চিমে লম্বা বাড়ির পশ্চিমের অংশ মান্নান মাওলানার। এই দিকটা সড়কমুখি পড়েছে বলে মান্নান মাওলানার অংশর গুরুত্ব বেশি। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় পুরা বাড়িটাই বুঝি মাওলানা সাহেবের। পিছন দিকে যে আরও দুই শরিকের ঘরদুয়ার বড়সড় উঠান পালান আছে, যারা না জানে তারা কেউ তা অনুমানও করে না। তবে সেই দুই শরিকের যার যার সীমানায় বাড়িতে ওঠা নামার রাস্তা আছে বলে মান্নান মাওলানার সীমানায় তাদের কাউকে প্রায় দেখাই যায় না। নিজেদের অংশে, নিজেদের ঘরদুয়ারে থেকেও তারা থাকে চোরের মতো। মান্নান মাওলানা আর তার ছেলে আতাহারের দাপটে টুশব্দ করে না। যেন বাড়িটা তাদের না, যেন মান্নান মাওলানার বাড়িতে আশ্রিত তারা। মান্নান মাওলানার চাকর বাকর। পান থেকে চুন খসলে তাদের কারও আর রক্ষা নাই।
ওই দুই শরিকের কেউ গ্রাম গিরস্থি করে না। একজনের দুইছেলে জাপানে থাকে। জাপানে এখন অঢেল পয়সা। মাসে এক দেড়লাখ টাকা রোজগার করে একেকজন। দেশে নিয়মিত টাকা পাঠায়। সেই টাকায় পায়ের ওপর পা তুলে খাচ্ছে তাদের মা বাবা ভাইবোন। কিছুদিন ধরে শোনা যাচ্ছে দেশগ্রামে তারা থাকবেই না। বাড়িঘর যেভাবে আছে পড়ে থাকবে, গরিব আত্মীয়স্বজন কেউ এসে থাকবে, তারা চলে যাবে ঢাকায়। সেখানে যাত্রাবাড়ির ওদিকে জাপানি টাকায় জমি কেনা হয়েছে। সেই জমিতে বাড়িও নাকি উঠছে। বাড়ির কর্তা গনি মিয়া প্রায়ই ঢাকায় গিয়ে সেই বাড়ির তদারক করতাছে। এই তারা গ্রাম ছাড়ল বলে।
অন্য শরিকের নাম মন্তাজ। মন্তাজউদ্দিন। বাড়িতে সে থাকে না। ঢাকায় থেকে সদরঘাটে পুরানা কাপড়ের ব্যবসা করে। স্বাধীনতার আগে এক পাকিস্তানি পুরানা কাপড়ের ব্যবসায়ীর কর্মচারি ছিল। খুব বিশ্বাসী ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও হাতের তালুতে জান নিয়ে মালিকের কাজ করে গেছে। দেশ যখন স্বাধীন হয় হয়, পাকিস্তানিরা যখন বেদম লাথুথি খাওয়া কুত্তার মতো লেজ গুটিয়ে কেঁউ কেঁউ করে পালাচ্ছে তখন মন্তাজের মালিক দোকান আর গুদামের চাবি মন্তাজের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। তুম হামারা বহুত পুরানা আদমি মন্তাজ, সামহালকে রাখখো।
সামলে মন্তাজ ঠিকই রেখেছিল, তবে মালিক হয়ে। সেই গুদামে একশো চল্লিশ গাইট (গাট) মাল ছিল। আর এতবড় দোকান। বছর ঘুরতে না ঘুরতে কোটিপতি হয়ে গেল মন্তাজ। ঢাকায় এখন দুইখান বাড়ি তার। একটা গেন্ডারিয়ায় আর একটা। ওয়ারিতে। একটা ছয়তালা, একটা চারতলা। পাঁচ ছয়টা নাকি গাড়ি। একেক ছেলেমেয়ের একেকটা। নিজের একটা, বউর একটা।
দেশগ্রামে মন্তাজ তেমন আসে না। সত্তর আশি বছর বয়সের বুড়া মা থাকে বাড়িতে। তার দেখাশোনা করে কোথাকার কোনও দূর সম্পর্কীয় অনাথ আত্মীয়া ফিরোজা। মোল সতের বছরের যুবতী মেয়ে।
মাকে মন্তাজ ঢাকায় নেয় না বউর ডরে। মন্তাজের বউ দুই চোখখে তার শাশুড়িকে দেখতে পারে না। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বার তিনেক ঘোরতর অসুখ হয়েছে মন্তাজের মায়ের। চিকিৎসার জন্য মাকে ঢাকায় নিয়ে গেছে ঠিকই মন্তাজ কিন্তু নিজের বাড়িতে রাখেনি, হাসপাতালে রেখে অসুখ সরিয়ে আবার বাড়িতে দিয়ে গেছে।
নিজে না এলেও মায়ের জন্যে কর্তব্য কাজ যা করার সবই করে মন্তাজ। দোকানের কর্মচারি পাঠিয়ে মায়ের খোঁজ খবর নেয়, টাকা পয়সা, অষুধ বিষুধ পাঠায়। ফল পাকুড় পাঠায়। পাটাতন ঘরের কেবিনের জানালার সামনে সারাদিন শুয়ে থাকে মন্তাজের মা আর বকর বকর করে। কী কথা যে বলে, কেন যে বলে কেউ তা জানে না! সংসার সামলায় ফিরোজা। বুড়ি বকর বকর করে আর ফিরোজা নিঃশব্দে কাজ করে।
দুই শরিকের কারোই গ্রাম গিরস্থি নাই বলে, খেতখোলার ঝামেলা নাই, গাই গরুর ঝামেলা নাই, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিমছাম উঠান পালান। গেরস্থি যা করার করেন মান্নান। মাওলানা। এত খেতখোলা তার, এতগুলি গাইগরু। বাড়িতে ভাত তরকারি যা রান্না হয় সেই ভাতের ফ্যানে, সেই সব তরকারির ছাল বাকলায় এতগুলি গাইগরুর জাবনা হয় না। তিনবেলা ভাত রান্না হয় বাড়িতে তবু চারটা গামলার দুইটাও পুরাপুরি ভরে না। এই একটা কারণে দুই শরিকের লগে একটু খাতির রাখতে হয়েছে মান্নান মাওলানার। গনি মিয়া আর মন্তাজের মায়ের সংসারে বলা আছে ফ্যান আর তরিতরকারির ছালবাকল। যেন বাড়ির বাইরে ফেলে না দেয় তারা। যেন মান্নান মাওলানার আথালের সামনে যে গামলাগুলি আছে সেই গামলায় ফেলে যায়। গাইগরুগুলো তাহলে ভাল খাওয়া দাওয়া করে রাতের ঘুমটা ভাল দিতে পারবে। ভাল খাওয়া, ভাল ঘুম হলে দুধেরগুলি দেদারসে দুধ দিবে সকালবেলা।
চলছেও সেইভাবেই। তিন শরিকের তিনবেলার দ্রব্যে প্রায় ভরে ওঠে চারখান জাবনার গামলা।
সন্ধ্যার আগে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরে গরুগুলি প্রথমে আথালে বাঁধে মাকুন্দা কাশেম। তারপর মাঝারি কণ্ঠে গান গাইতে গাইতে রান্নাঘরে ঢুকে দুইতিন ঠিলা পানি গরম করে। খৈল ভুষি এসব থাকে রান্নাঘরের এক কোণায়, বিশাল দুইখান হাড়িতে। পানি গরম হলে বালতিতে গরম পানি নিয়ে খৈল ভুষি মিশিয়ে দুইটা করে বালতি দুইহাতে ধরে জাবনার গামলায় এনে ঢেলে দেয়।
