মজনু এবং সোনা মিয়া মুখ চাওয়া চাওয়ি করল, কেউ কোনও জবাব দিতে পারল না।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব হাসিমুখে বললেন, অর্থাৎ মৃতব্যক্তি যেই হোক সে তো মানুষ! মানুষের লাশকে সম্মান দেখাতে হবে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে একজন লোক মসজিদে অবস্থান করিতেছিল। একদিনু রাসুলুল্লাহ তাহাকে না দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, সে কোথায়? সকলে উত্তর করিলেন, সে মারা গিয়াছে। তিনি বলিলেন, তোমরা আমাকে উহা জানাইলে না কেন? তাঁহারা বলিলেন, আমরা এটাকে সামান্য ব্যাপার বলিয়া মনে করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, তোমরা আমাকে কবরের নিকট লইয়া চল। অতঃপর তিনি সেখানে যাইয়া জানাজার নামাজ পড়িলেন। তিরমিযী শরীফে আছে, সেই শিশুর কোনও জানাজা নাই যে পর্যন্ত সে শ্বাস প্রশ্বাস না ফেলে এবং চিৎকার না করে এবং সে কাহারও উত্তরাধিকারী নহে এবং কেহ তাহার ওয়ারিশ নহে। এছাড়া প্রত্যেকের জানাজা হবে। মান্নান মাওলানা সাহেব ঠিক বলেননি। বুঝলাম যিনি মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি চোর ছিলেন। কী চুরি করতেন? খাদ্যদ্রব্য। পেটের দায়ে একজন অসহায় বয়স্কমানুষ এটা ওটা চুরি করে জীবনধারণ করতাছেন। আপনাদের কথা শুনে বোঝা গেল এলাকার কেউ তাঁকে দুচোখে দেখতে পারত না, শুধুমাত্র এই অপরাধের জন্য। তিনি মিথ্যা বলতেন, কূটনামো করতেন, সবকিছুর মূলে কিন্তু ওই এক সমস্যা। ক্ষুধা, বেঁচে থাকা। যে সমাজ এই ধরনের একজন অসহায় মানুষকে খেতে দিতে পারে না সেই সমাজের কোনও অধিকার নেই তার বিচার করার। তারপরও মৃত ব্যক্তির বিচার করার ক্ষমতা কোনও মানুষের নেই। মৃত্যুর পর যাবতীয় বিচারের ভার। আল্লাহতায়ালার ওপর।
একটু থেমে মাওলানা সাহেব বললেন, যদিও ইসলামী আইনে চুরির সর্বোচ্চ শাস্তি হাতকাটা, কিন্তু তা কখন কার্যকর হবে? এ প্রসঙ্গে বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে হযরত আয়শা রাদিআল্লাহুআনহু হতে বর্ণিত, একদা কোরায়েশ গোত্রের প্রসিদ্ধ মাখজুমী বংশের একজন মহিলা ফাতিমা বিনতে আসাদ ঘটনাচক্রে চুরি করিয়াছিল এবং তাহার মোকদ্দমা রাসুলুল্লার কাছে পেশ হইয়াছিল। এই অভিজাত বংশের মহিলাটির চুরির দায়ে হাতকাটা হইবে এই কথা ভাবিয়া তাহার স্বগোত্রের লোকেরা খুবই বিচলিত হইয়া পড়িল। ফলে তাহারা তাহার শাস্তি রহিত করিবার জন্যে রাসুলুল্লার প্রিয় ব্যক্তি হযরত উসামা রাদিআল্লাহুআনহুর দ্বারা সুপারিশ করাইলেন। এতে রাসলুল্লাহ খুবই অসন্তুষ্ট হইলেন এবং উপস্থিত সাহাবীদের উদ্দেশ্যে একখানা ভাষণ দিলেন। বলিলেন, শরীয়তের শাস্তি কার্যকরী করিবার ব্যাপারে এই ধরনের সুপারিশ বড়ই গর্হিত। ফাতিমা বিনতে আসাদ কেন যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদও এই কাজটি করিত তাহা হইলে অবশ্যই আমি তাহার হাত কাটিয়া দিতাম। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন নয়, একেবারেই অন্যরকম। তাছাড়া যিনি চুরি করে জীবন ধারণ করেছিলেন তিনি মৃত।
মাওলানা সাহেব সোনা মিয়ার দিকে তাকালেন। চলুন বাবা, জানাজা পড়ে আসি।
মজনু বলল, আরেকখান কথা আছে হুজুর। না কইলে অন্যায় হইবো। মরণের আগে মাইট্টাতেল খাইছিলো ছনুবুড়ি।
মাওলানা সাহেব আর সোনা মিয়া দুজনেই চমকে উঠলেন।
সোনা মিয়া বলল, কচ কী!
মাওলানা সাহেব বললেন, আত্মহত্যা করেছে?
মজনু বলল, হেইডা আমি কেমতে কমু! তয় মাইনষে কইতাছে পানির তিয়াস লাগছিলো দেইখা পানি মনে কইরা খাইয়া হালাইছে।
ঘটনা বলল মজনু। শুনে মাওলানা সাহেব বললেন, হয়তো ভুল করেই মেটেতেল তিনি খেয়েছেন। আত্মহত্যা কি না আমরা কেউ তা জানি না। যদি আত্মহত্যা হয়ও, বিধান আছে যদি কেহ আত্মহত্যা করিয়া থাকে তবে তাহার গোসল ও নামাজে জানাজা উভয়ই আদায় করা হইবে। তবে রোজ কিয়ামতের দিন আত্মহত্যার শাস্তি বড় ভয়ংকর। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে, ‘আত্মহত্যাকারী যেভাবে নিজের জীবন সংহার করে, কিয়ামতের দিন তাহাকে সেইভাবেই আযাব দেওয়া হইবে। যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক পাহাড়ের ওপর হইতে পতিত হইয়া আত্মহত্যা করে, তাহাকে দোযখের মধ্যে পাহাড়ের উপর হইতে পতিত করিয়া আযাব দেওয়া হইবে। যে ব্যক্তি বিষপান করিয়া আত্মহত্যা করে, দোযখের মধ্যে তাহাকে অনবরত বিষপান করাইয়া শাস্তি দেওয়া হইবে। যে ব্যক্তি অস্ত্রের সাহায্যে আত্মহত্যা করে, দোযখের মধ্যে তাহাকে পুনঃপুনঃ অন্ত্রের দ্বারা আঘাত করা হইবে।’ বুখারী শরীফে আরও আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহুআলায়হেওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, এক ব্যক্তি স্বাভাবিক মৃত্যুর পূর্বে আত্মহত্যা করে। অতঃপর আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে এরশাদ হইল, হে বান্দা! তুমি নিজের প্রাণ নিজে বিনাশ করিতে অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়াছিলে। অতএব আমি তোমার জন্য বেহেশত হারাম করিয়া দিলাম।
কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। চলুন যাই।
ভিতরে ভিতরে অদ্ভুত এক ভাল লাগায় তখন মন ভরে গেছে মজনুর। মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বুদ্ধি করে এখানে এসেছিল বলে এতকিছু জানা হল। ছনুবুড়ির জানাজা, দাফন এখন ঠিকঠাক মতোই হবে। আর নয়তো ভুল ধারণায় অবহেলা করা হত মানুষের লাশ।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব আর সোনা মিয়ার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে চারদিকে তাকাচ্ছিল মজনু। সূর্যের আলোয় শীতের আকাশ ভেসে যাচ্ছে, আল্লাহপাকের দুনিয়া ঝকমক ঝকমক করতাছে। গাছপালার বনে ঝিরিঝিরি হাওয়া, শূন্যে উড়ে যায় পাখি। পানির তলা থেকে শ্বাস ফেলতে ভেসে ওঠে মাছ, বিল বাওড়ের উর্বর মাটিতে অংকুরিত হয় শস্যের বীজ, নিরবধিকাল বয়ে যায়, বয়ে যায়। এই সুন্দর দুনিয়া ফেলে কেন যে মরে যায় মানুষ! কেন যে আল্লাহ জীবন দিয়ে পাঠান, কেন যে জীবন ফিরিয়ে নেন, সেই গভীর রহস্যের কথা মানুষ জানে না।
