সোনা মিয়া ভাবল বড় রকমের একটা ধমক দিবে মজনুকে। তার আগে মাওলানা সাহেব তাঁর মনোমুগ্ধকর কণ্ঠে বললেন, কী হয়েছে বাবা? আপনাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। আমার সামনে এসে বসুন। বলুন কী হয়েছে?
এবার মজনু একটু নড়েচড়ে উঠল। ঢোক গিলে কাতর গলায় বলল, একজন মানুষ ইন্তিকাল করছে হুজুর।
ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। তার দেখাদেখি সোনা মিয়াও বিড়বিড় করে পড়ল দোয়াটা। তবে খুবই দ্রুত পড়ল, পড়েই মজনুর দিকে তাকাল। কেডা ইন্তিকাল করতাছে।
ছনুবুড়ি।
আইজ্জার মায়?
হ।
কুনসুম?
রাইত্রে।
সকালবেলা মৃত্যু সংবাদ শুনে যতটা কাতর হওয়ার কথা সোনা মিয়ার ততটা সে হল না। নির্বিকার মুখে হুজুরের দিকে তাকাল।
ব্যাপারটা খেয়াল করেও সোনা মিয়াকে কিছু বললেন না মাওলানা সাহেব। মজনুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার কাছে আপনি কী মনে করে আসছেন বাবা?
মৃত্যু সংবাদ দিয়ে ফেলার পর ভিতরে ভিতরে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে মজনু। মাওলানা সাহেবকে সালাম না দিয়ে যে বেয়াদবি করেছে সেকথা না ভেবে বলল, জানাজাডা যদি আপনে পড়াইতেন।
মওলানা সাহেব কথা বলবার আগেই সোনা মিয়া বলল, ক্যা মন্নান মাওলানারে পাইলি না? হেয় বাইত্তে নাই?
আছে।
তয়?
ছনুবুড়ির জানাজা হেয় পড়াইবো না।
ক্যা?
আপনে তো বেবাকঐ জানেন। আমারে আর জিগান ক্যা?
প্রথমে সোনা মিয়ার দিকে তারপর মজনুর দিকে তাকিয়ে মাওলানা সাহেব অবাক গলায় বললো, কেন, জানাজা তিনি পড়াবেন না কেন?
সোনা মিয়া বলল, যেয় ইন্তিকাল করতাছে সেয় মানুষ ভাল আছিল না হুজুর। কেমন মানুষ ছিল? খারাপ।
কী রকম খারাপ?
মজনুর দিকে তাকিয়ে সোনা মিয়া বলল, ঐ মউজনা তুই ক। তুই আমার থিকা ভাল জানচ। ছনুবুড়ির বাড়ি তগো বাড়ি থিকা কাছে।
মজনু বলল, টুকটাক চুরি করতে হুজুর। তয় বেবাকঐ খাওনের জিনিস। মাইনষের ঝাকার কদু, কোমড়ডা। গাছের আমড়া, গয়াডা। পোলার সংসারে থাকতো, পোলারবউ খাওন দিতো না। এর লেইগাঐ অমুন করতো। আর দুই একওক্ত খাওনের লেইগা একজনের বদলাম আরেকজনের কাছে কইতো। বানাইয়া বানাইয়া কইতো, মিছাকথা কইতো। বহুত কুটনা আছিলো।
মাওলানা সাহেব বললেন, মান্নান মাওলানা সাহেব তাকে চিনতেন?
জ্বে হ চিনতো হুজুর। বহুত ভাল কইরা চিনতো।
সোনা মিয়া বলল, ছনুবুড়িরে দুই মেদিনমোন্ডলের বেবাকতেঐ চিনে।
কিন্তু মান্নান মাওলানা সাহেব তার জানাজা পড়াবেন না কেন? কী বললেন তিনি?
কইলো ছনুবুড়ি চোর আছিলো, চোগলখুরি করতাছে, চোর আর চোগলখোরের জানাজা অয় না। মাডি তারে নিবো না। এই রকম মুদ্দাররে গাঙ্গে ভাসাইয়া দিতে অয় যাতে কাউট্টা (কচ্ছপ) কাছিমে খাইতে পারে, নাইলে মড়কখোলায় হালাইয়া দিতে অয়, কাউয়া চিলে খাইবো, হিয়াল হকুনে খাইবো, কুত্তায় খাইবো।
মাওলানা সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ম্লান মুখে হাসলেন। কথাগুলো তিনি ঠিক বলেননি। নামাজে জানাজা পড়া ফরজে কেফায়াহ। অর্থাৎ কেহ জানাজার নামাজ আদায় না করিলে যাহারা মৃত্যুর সংবাদ পাইয়াছে সকলেই গোনাহগার হইবে। যে কোনও একজন জানাজার নামাজ পড়িলেই ফরজে কেফায়াহ আদায় হইয়া যাইবে। কোনও জানাজার নামাজের জন্য জামায়াত শর্ত বা ওয়াজিব নহে। লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া, কাক শকুনের খাওয়ার জন্য মড়কখোলায় ফেলে দেওয়ার কথা কোনও মুসলমান বলতে পারেন না। মাটি কোনও মানুষকে গ্রহণ করবে না, এ হয় না। এ ভুল কথা। মৃত্যুর পর মানুষের যাবতীয় বিচারের ভার আল্লাহপাকের ওপর। পবিত্র কোরআন শরীফে আছে আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক নন? আর কিয়ামতের দিন আমি ন্যায় বিচারের মানদণ্ড দাঁড় করাইব। সুতরাং কাহারও ওপর কোনও অবিচার করা হইবে না, আর যদি তিল পরিমাণ ওজনেরও কাজ হয় তবু তাহা আমি উপস্থিত করিব; হিসাব গ্রহণ করিতে আমিই যথেষ্ট।
মাওলানা সাহেবের কোনও কোনও কথার অর্থ বুঝল না মজনু, সোনা মিয়াও পুরাপুরি বুঝল বলে মনে হল না, তবে তারা দুইজনেই মুগ্ধ হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মাওলানা সাহেব বললেন, তিরমিযী শরীফে আছে তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের সৎ কার্যগুলির কথা উল্লেখ কর এবং তাহাদের দুষ্কর্মগুলির কথা উল্লেখ করিও না।
মজনু এবং সোনা মিয়া দুইজনের দিকেই মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। মৃতব্যক্তি সম্পর্কে এই সব কথা আপনারা মনে রাখবেন। আরও দশজনকে বলবেন। তাহলে ভুল ফতোয়াদানকারীরা ফতোয়া দিতে সাহস পাবে না। আরও দুতিনটে হাদিস বলে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলব আমি। তার আগে, বাবা মজনু, আপনি আমাকে বলুন মৃতের গোসল দেওয়া হয়েছে, কাফন দেওয়া হয়েছে?
মজনু বলল, অহনও অয় নাই। তয় ব্যবস্তা অইতাছে।
তাহলে ঠিক আছে। কারণ জানাজা বিলম্ব করা মাকরূহ। যদি জুমআর দিন কাহারও ইন্তেকাল হয় তবে সম্ভব হইলে জুমআ’র পূর্বেই নামাজে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করিবে। জুমআ’র সময় লোক সমাগম বেশি হইবে এই উদ্দেশ্যে জানাজা বিলম্ব করা মাকরূহ।
মাওলানা সাহেব একটু থামলেন, আকাশের দিকে তাকালেন, গাছপালা, পুকুরের পানি আর রোদের দিকে তাকালেন। যেন দুনিয়ার মালিক মহান আল্লাহপাককে চোখের দৃষ্টিতে অনুভব করলেন তিনি। তারপর যে কোনও মানুষ মুগ্ধ হতে পারে, আকৃষ্ট হতে পারে এমন গলায় বলতে লাগলেন, বুখারী শরীফে হযরত জাবির রাদিআল্লাহু আনহু হইতে বর্ণিত আছে, একবার আমাদের নিকট দিয়া একটি জানাজা অতিক্রম করিল। তাহা দেখিয়া হয়রত রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহুআলায়হেওয়াসাল্লাম উঠিয়া দাঁড়াইলেন। তাহার সহিত আমরাও দাঁড়াইলাম। আমরা তাহাকে বলিলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ্! ইহা তো ইহুদীর লাশ। তিনি বলিলেন যখনই কোনও লাশ দেখিবে, উঠিয়া দাঁড়াইবে। কেন রাসুলুল্লাহ এমন করেছিলেন বলুন তো?
