এরকম মানুষকে কে না শ্রদ্ধা করবে! কে না চাইবে তার কথা শুনতে!
কিন্তু তিনি এমন চুপচাপ হয়ে আছেন কেন? তিনি কেন কথা বলছেন না! সোনা মিয়া তো আসেই তার কথা শুনতে!
সোনা মিয়া আস্তে করে ডাকল, হুজুর।
মাওলানা সাহেব ধীর গলায় সাড়া দিলেন।
সোনা মিয়া অতিরিক্ত বিনয়ের গলায় বলল, অনেকদিন ধইরা ভাবতাছি আপনেরে দুই একখান কথা জিগামু। সাহস পাইতাছি না।
মাওলানা সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। পবিত্র মুখ উজ্জ্বল করে হাসলেন। কোনও অসুবিধা নেই। বলুন।
আপনে তো নোয়াখালীর লোক, এত সোন্দর কইরা কথা কন কেমতে?
মাওলানা সাহেব আবার হাসলেন। শিখে নিয়েছি। আমি যদি নোয়াখালীর ভাষায় কথা বলতাম আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারতেন?
জ্বে না হুজুর।
আমার কাজ হচ্ছে ইমামতি করা। মানুষকে আল্লাহ রাসুলের কথা বলা। আমার ভাষাই যদি লোকে বুঝতে না পারে তাহলে সেই কাজ আমি সুন্দরভাবে করব কী করে? আমি যখন নোয়াখালীতে ছিলাম, সেখানকার মসজিদে ইমামতি করেছি, তখন সেই অঞ্চলের ভাষায় কথা বলেছি। নোয়াখালীর বাইরে আসার পর থেকে এখন আপনার সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলছি এই ভাষায়ই কথা বলি। কারণ বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের ভাষা তো আমি জানি না। শুদ্ধ ভাষাটা জানি, এ ভাষায় কথা বললে সব লোকই তা বুঝবে।
সোনা মিয়া গদগদ গলায় বলল, ঠিক কইছেন হুজুর। আরেকখান কথা, আপনে যখন কোরান হাদিসের কথা কন তহন দেহি বইয়ে যেমুন লেখা থাকে অমুন কইরা কন, এইডার অর্থ কী?
ওভাবে বলতে আমার ভাল লাগে। মনে হয় যারা শুনছে তাদেরও শুনতে ভাল লাগছে।
সোনা মিয়া মাথা নাড়ল। জ্বে জ্বে। হোনতে ভাল্লাগে। কন, কবর আযাবের কথা আর কিছু কন হুজুর।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব আবার নড়েচড়ে বসলেন। অপার্থিব গলায় বলতে লাগলেন, তিরমিযী শরীফে হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহুআনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহুআলায়হেওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, মৃতকে কবরস্থ করিবার পর দুইজন কৃষ্ণকায় নীলচক্ষু বিশিষ্ট ফেরেশতা তাহার নিকট আগমন করেন। তাহাদের একজনের নাম মুনকির ও অন্যজনের নাম নাকীর। তাহারা জিজ্ঞাসা করিবেন, এই ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি কী বল? মৃতব্যক্তি বলিবে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নাই এবং মুহাম্মদ সাল্লেল্লাহুআলায়হেওয়াসাল্লাম তাঁহার বান্দা ও রাসুল। ফেরেশতারা বলিবে, আমরা জানিতাম তুমি এই কথাই বলিবে। অতঃপর তাহার কবরকে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে সত্তরগজ প্রশস্ত করিয়া দেওয়া হইবে। পরে তাহার কবরকে আলোকিত করিয়া দিয়া বলা হইবে এবার ঘুমাও। মৃত লোকটি বলিবে, আমার পরিবারের নিকট যাইয়া আমি তাহাদিগকে আমার বর্তমান অবস্থা জানাইতে চাই। ফেরশতাদ্বয় বলিবে, বাসর রাত্রির ন্যায় শয্যা গ্রহণ কর, যেখানে প্রিয়তম ছাড়া অন্যকেহ নিদ্রাভঙ্গ করিতে পারে না। রাসুলুল্লাহ বলেন, এই কবর হইতেই কিয়ামত দিবসে আল্লাহতাআলা তাহাকে উঠাইবেন। আর যদি মৃতব্যক্তি মুনাফিক হয়, সে ফেরেশতাদের প্রশ্নের উত্তরে বলিবে, লোকেরা যাহা বলিত তাহা শুনিয়া আমিও তাহাদের ন্যায় বলিতাম, আমি জানি না ইনি কে। ফেরেশতাদ্বয় বলিবে, তুমি যে ইহা বলিবে তাহা আমরা পূর্বেই জানিতাম। অতঃপর কবরকে বলা হইবে, সংকুচিত হও। ফলে তাহা এমনভাবে সংকুচিত হইবে যে মৃতের মেরুদণ্ড চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়া যাইবে। এই কবর হইতে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাহাকে উখিত না করা পর্যন্ত সে এইভাবে আযাব পাইতে। থাকিব।
মাওলানা সাহেবের কথা শেষ হওয়ার বারান্দার অদূরে এসে দাঁড়াল মজনু। মসজিদের বারান্দায় মাওলানা সাহেবকে বসে থাকতে দেখবে ভাবেনি। সে একটু থতমত খেল, ব্ৰিত হল। মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এ বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল ঠিকই, মাওলানা সাহেবকে কী কী কথা বলবে তাও ভেবে রেখেছিল, এখন হঠাৎ করেই সবকিছু গুলিয়ে গেল। মাওলানা সাহেবকে যে সালাম দিতে হবে সেকথা পর্যন্ত মন হল না। ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মাওলানা সাহেবের সামনে যে আরেকজন মানুষ বসে আছে, মানুষটা যে মজনুর পরিচিত সেকথাও মনে হল না।
একপলক মজনুকে দেখেই মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তাকে সালাম দিলেন। আসোলামোআলাইকুম। কী চান বাবা?
মাওলানা সাহেব কাকে সালাম দিচ্ছেন দেখবার জন্যে পিছন দিকে মুখ ফিরাল সোনা মিয়া। মজনুকে দেখে খ্যাক খ্যাক করে উঠল। কী রে বেডা, এত বেদ্দপ অইছস ক্যা? হুজুরের সামনে আইয়া খাড়াইছস ছেলামালাইকুম দিলি না? উল্টা হুজুর তরে দিল!
মাওলানা সাহেব হাসিমুখে বললেন, তাতে কোনও অন্যায় হয়নি। সালাম যে কেউ যে কাউকে দিতে পারে, আগে পরের কোনও ব্যাপার নেই।
সোনা মিয়া রাগে গো গো করতে করতে বলল, না হুজর, এইডা ও ঠিক করে নাই। ঐ মউজনা, মাপ চা হুজরের কাছে। পাও ধইরা ক আমার ভুল অইয়া গেছে, আমারে আপনে মাপ কইরা দেন। তাড়াতাড়ি।
মজনুর ততক্ষণে গলা শুকিয়ে গেছে। মুখ গেছে ফ্যাকাশে হয়ে। বুকও দুরদুর করে কাঁপছে। এ কেমন ভুল সে করল আজ! এই ধরনের ভুল তো সে কখনও করেনি! আজ কেন এমন হল!
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তখন তীক্ষ্ণচোখে মজনুকে দেখছেন। সোনা মিয়াও দেখছে। তবে দুইজনের চোখ দুইরকম। একজন দেখছেন মজনুর মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া অন্যজন দেখছে বেয়াদবি। সে বলার পরও হুজুরের পা ধরে কেন মাফ চাইছে না মজনু!
