খান বাড়ির মসজিদের বারান্দার এককোণে, দেওয়ালে ঢেলান (হেলান দিয়ে বসে আছেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। অল্প দূরত্ব রেখে তার মুখোমুখি বসে আছে বড় মেন্দাবাড়ির লম্বা সোনা মিয়া। মাথায় সাদা টুপি সোনা মিয়ার, গায়ে গেরুয়া রঙের ধোয়া পানজাবি। বুক থেকে গলা তরি চারখান বোম পানজাবির। একটা বোম খসে গেছে। বাকি তিনটা যত্নে লাগান। পরনের লুঙ্গি বেগুনি রঙের। পানজাবিটা পুরানা হয়ে গেছে, দুই এক জায়গায় গেছে ফেঁসে। তবে পানজাবি লম্বা বলে লুঙ্গি পানজাবির আবরণে ঢাকা পড়ে গেছে। পায়ে স্পঞ্জের একজোড়া স্যান্ডেল ছিল সোনা মিয়ার। স্যান্ডেল দুইটা খুলে একটার গায়ে আরেকটা লাগিয়ে বাঁ দিককার উরুর তলায় রেখেছে। জুতা স্যান্ডেল সবচেয়ে বেশি চুরি হয় মসজিদে। নামাজ পড়তে এসেও তাই নামাজের চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে কেউ কেউ জুতা স্যান্ডেল নিয়ে। মসজিদে ঢোকার আগে বগলে চেপে যেখানে নামাজ পড়ে তার পাশেই রেখে দেয়। সালাম ফিরাবার সময় আড়চোখে দেখে নেয় জায়গা মতন আছে কি না জিনিস দুইটা, নাকি সেজদা দেওয়ার ফাঁকে চুরি হয়ে গেছে।
আল্লাহর ঘরে এসেও চুরি করে কোনও কোনও মানুষ। ছি!
তবে এখন চুরির ভয় নাই। এই সকালবেলা মসজিদের ধারে কাছে আসবে না কেউ। তবু সাবধানের মার নাই বলে স্যান্ডেল দুইটা ওইভাবে রেখেছে সোনা মিয়া, নয়তো মন দিয়ে মাওলানা সাহেবের কথা শোনা যেত না। মন পড়ে থাকত স্যান্ডেলের দিকে। বরাবরই মুখ নিখুঁত করে কামানোর অভ্যাস সোনা মিয়ার। কিছুদিন হল সেই অভ্যাস বাদ দিয়েছে। হঠাৎ করেই মন তার ধর্মের দিকে ঝুঁকেছে। মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব এই মসজিদের ইমাম হয়ে আসার পর, তাঁকে দেখে, তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর মনটা কী রকম যেন হয়ে গেছে। জীবনে আল্লাহ খোদার নাম নেয় নাই, মসজিদে ঢুকে নামাজ পড়ে নাই, সবাই পড়ে বলে ঈদের নামাজটা পড়েছে, তাও সব সময় না, বিশেষ করে কোরবানি ঈদের নামাজ। বাড়িতে গরু বরকি কোরবানি হবে বলে কোরবানি ঈদের সকাল থেকে গরু বরকি নিয়াই ব্যস্ত থাকত। সেই মানুষ হঠাৎ করে বদলে গেল! একজন মানুষ যে কত সহজে আরেকজন মানুষকে নিয়া আসতে পারে ধর্মের দিকে মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব আর সোনা মিয়া তার প্রমাণ। যে সোনা মিয়া মেতে থাকত গান বাজনা নিয়ে, গ্রামের মাতব্বরি সর্দারি, আমোদফুর্তি আর খেলাধুলা নিয়া, সেই সোনা মিয়া এখন সময়ে অসময়ে এসে মসজিদে বসে থাকে। ইমাম সাহেবের কাছ থেকে ধর্মের কথা শোনে। মুখ কামানো ছেড়ে দিয়েছে। নিখুঁত করে কামানো মুখ আর নাই। এখন শুধু মোচটা কামায়, গাল থুতনি কামায় না। সেখানে কাঁচাপাকা দাঁড়ি দিনকে দিন লম্বা হচ্ছে।
এই বয়সে দাঁড়ি পাকবার কথা না সোনা মিয়ার। কিন্তু বেশ কিছু পেকেছে। দাঁড়ি মোচ ঠিক মতো গজাবার আগ থেকেই ক্ষুর ব্লেড লাগিয়েছিল গালে, অতিরিক্ত চাছাচাছি করেছে, ফলে জাগ দিয়ে বিচ্চাকলা (বিচিকলা) পাকাবার মতো নিজেই নিজের দাঁড়ি মোচ পাকিয়ে ফেলেছে। তবে ওই নিয়া সোনা মিয়ার কোনও মাথাব্যথা নাই। সে এখন অন্যমানুষ। এই যে সকালবেলা ইমাম সাহেব কবর আযাবের কথা বলছেন সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে। শীত পড়ে গেছে। গায়ে পাতলা পানজাবি তবু শীত লাগছে। না। অবশ্য মসজিদের বারান্দা পুবদিকে বলে সকালবেলার রোদ এসে পড়েছে সোনা মিয়ার পিঠে। সেই রোদে বেশ উষ্ণতা। শীত না টের পাওয়ার এটাও একটা কারণ।
মসজিদের বারান্দা ছাড়িয়ে খানিকটা খোলা জায়গা তারপর দুই পাশে ইট রঙের বেঞ্চ দেওয়া বাঁধান ঘাটলা। ঘাটলার অনেকগুলি সিঁড়ি নেমে গেছে পানির দিকে। পানির উপরেরগুলির খবর আছে, গনা যায়, তলারগুলির খবর নাই। পুকুরটা বেশ গভীর। পুকুরের দক্ষিণে মাঠ, এই মাঠের নাম খাইগো বাড়ির মাঠ। পশ্চিম দিকে মসজিদ, মসজিদের উত্তরে ঝাঁপড়ানো আমগাছের তলায় দোচালা লম্বা টিনের ঘরে প্রাইমারি স্কুল। খাইগো বাড়ির স্কুল। স্কুল ঘরটার সামনে সবুজ ঘাসের অনেকখানি খোলা জায়গা। তারপর ভিতরবাড়ি। দালান আছে, বড় বড় টিনের ঘর আছে। এলাকার সবচেয়ে বড় বাড়ি, সবচেয়ে বনেদী বাড়ি। বংশ পরম্পরায় চেয়ারম্যান হচ্ছে এই বাড়ির লোক। যে কোনও সরকারের আমলেই মন্ত্রী এমপি হচ্ছে। সারা বিক্রমপুরে এই বাড়ির নাম, সম্মান।
বাঁধান ঘাটলার পুবে আর উত্তরে আছে আরও দুইখান ঘাটলা। সেই ঘাটলা কাঠের। বাড়ির মেয়েরা ব্যবহার করে বলে ওই দুইটা ঘাটলার তিনপাশে পানিতে খুঁটি পুতে সুন্দর করে বেড়া দেওয়া হয়েছে। এই বেড়া দেখেও বাড়ির আভিজাত্য টের পাওয়া যায়।
আর আছে গাছপালা। বিশেষ করে পুকুরের পুবপারে বড় বড় আমগাছ, জাম বকুলগাছ। সকালবেলার রোদ বেশ খানিকক্ষণ আটকে রাখে এই সব গাছপালা।
আজও রেখেছিল। তবে বেলা হওয়ার পর আর পারেনি। ফলে সোনা মিয়ার পিঠে এসে পড়েছে রোদ, মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের পায়ের কাছে এসে পড়েছে। দেওয়ালে ঢেলান দিয়ে আছেন বলে তার পবিত্র শরীরের অন্যত্র পৌঁছাতে পারেনি রোদ।
প্রাইমারি স্কুল বন্ধ বলে কোথাও কোনও শব্দ নাই। আমগাছের পাতার আড়ালে বসে ডাকছে একটা কাক। দুইটা ভাত শালিক চরছে বাঁধান ঘাটলার কাছে। শীত সকালের রোদে ঝকমক ঝকমক করতাছে চারদিক। এরকম পরিবেশে মসজিদের বারান্দায়, দেওয়ালে ঢেলান দিয়ে বসা মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবকে ফেরেশতার মতো লাগে। এতক্ষণ কথা বলছিলেন তিনি, এখন চুপচাপ হয়ে আছেন। পরনে সাদা চেকলুঙ্গি আর পানজাবি, মাথায় সাদাটুপি, বুক পর্যন্ত নেমেছে শুভ্রদাঁড়ি। মুখখানাও মাওলানা সাহেবের ধবধবে ফর্সা। ছিটাফোঁটা চর্বিও যেন নাই গায়ে, একহারা গড়ন। কথা বলেন ধীর, নরম স্বরে। সেই স্বর শুনে মনেই হয় না এ কোনও মানুষের স্বর, মনে হয় সরাসরি আল্লাহতালার দরবার থেকে আসছে মানুষের জন্য কোনও বাণী।
