মায়ের কথা শুনতে শুনতে চোখের উপর দুইজন মানুষের মুখ ভেসে উঠতে দেখল নূরজাহান, একজন আলী আমজাদ আরেকজন মজনু। আলী আমজাদের মুখ দেখে ভয়ে শরীরের খুব ভিতরে কেমন একটা কাঁপন লাগল আর মজনুর কথা ভেবে আশ্চর্য এক শিহরণে, আশ্চর্য এক লজ্জায় ডালিম ফুলের আভার মতো মুখখানা তার আলোকিত হল। হামিদা এসবের কিছুই খেয়াল করল না, আগের কথার রেশ ধরে বলল, এর লেইগাঐ তর লগে আমি অমুন করি। একলা একলা কোনওহানে যাইতে দিতে চাই না। তুই তো আমার কথা হোনচ না, এই না হোননের লেইগা একদিন বহুত কানবি। তয় কাইন্দাও হেদিন কোনও লাব অইবো না। যা খোয়াবি তা আর ফিরত পাবি না।
মজনুর কথা ভেবে অন্যরকম হয়ে যাওয়া মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নূরজাহান বলল, আইজ তোমার কথা আমি পুরাপুরি বোজলাম মা। এমুন কইরা তো তুমি আমারে কোনওদিন কও নাই, তাও কমবেশি এই হগল কইলাম আমি বুজি। বেডাগো মুখেরমিহি চাইলে বোজতে পারি, চকের মিহি চাইলে বোজতে পারি। তুমি আমারে এক্কেরে (একেবারে) পোলাপান মনে কইরো না।
বোজলে ভাল না বোজলে মরণ। আইজ তরে আমি বেবাক কথা খুইল্লা কইলাম। অহন তুই বাচবি না মরবি এইডা তর চিন্তা। মাইয়া ডাঙ্গর অইয়া গেলে বাপ মায় যত পাহারা দেউক, ঘরে আটকাইয়া রাখুক, পায়ে ছিকল বাইন্দা রাখুক, মাইয়ায় যুদি নিজে না চায় তাইলে হেয় ভাল থাকতে পারবো না। ভাল থাকনা নিজের কাছে।
একটু থেমে হামিদা বলল, তয় আমার শেষ কথাডা তুই মনে রাখিচ। স্বামীর ঘরে একদিন যাইতে অইবো, শইলডা বাচায় রাখিচ। নষ্ট শইল স্বামীরে দেওনের থিকা বড় গুনা এই দুইন্নাইতে নাই। ঐ গুনাডা কোনওদিন করিচ না।
ঠিক তখনই দবিরকে দেখা গেল খুবই ক্লান্ত ভঙ্গিতে ভার কাঁধে বাড়ির দিকে আসছে। ভার কাঁধে থাকলে দবিরের হাঁটাচলা হয় পালকি কাঁধে থাকা বেহারাদের মতো। যেন হাঁটে না সে, দৌড়ায়। কিন্তু এখন তার হাঁটা একেবারেই ধীর, নরম। কী রকম এক বিষণ্ণতা যেন পা দুইটাকে তার চলতে দিতে চাইছে না। এতটা দূর থেকে তার মুখ চোখ পরিষ্কার দেয়া যায় না তবে বোঝা যায় মুখ ম্লান হয়ে আছে বিষণ্ণতায়, চোখ উদাস হয়ে আছে উদাসীনতায়।
দবিরকে প্রথম দেখল নূরজাহান। দেখে উৎফুল্ল গলায় বলল, মা ওমা, ঐত্তো বাবায় আইয়া পড়ছে।
হাতের কাজ ফেলে হামিদাও তাকাল মানুষটার দিকে। অবাক গলায় বলল, এত তাড়াতাড়ি আইলো কেমতে? যতড়ি গাছে হাড়ি পাতছে ঐড়ি নামাইয়া উড়াইয়া, গিরস্তের রস গিরস্তরে বুজাইয়া দিয়া নিজের ভাগের রস বেইচ্চা বাইত্তে আইতে তো আরও বেইল (বেলা) অওনের কথা!
নূরজাহান তখন তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। তাকিয়ে তার অবস্থাটা বুঝে গেল। মায়ের দিকে মুখ ফিরাল নূরজাহান। চিন্তিত গলায় বলল, দেহো মা, বাবারে জানি কেমুন দেহা যাইতাছে। মরার লাহান আটতাছে, চাইয়া রইছে অন্যমিহি। রসের ঠিল্লা দেইক্কা বুজা যায় ঠিল্লা খালি অয় নাই। রস না বেইচ্চা বাইত্তে আইলো ক্যা বাবায়?
নূরজাহানের কথা শুনে চিন্তিত হল হামিদা। চারপাশে ছড়ান ছিটান কাজের কথা ভুলে, খোলায় পুড়ছে চ্যাপা শুঁটকি, সেই সুটকির গন্ধ ভাসছে সারাবাড়িতে, সেসব ভুলে দূর থেকে হেঁটে আসা গাছির দিকে তাকিয়ে রইল সে।
নূরজাহান বলল, লও তো আউগগাইয়া গিয়া দেহি কী অইছে বাবার!
লগে লগে উঠে দাঁড়াল হামিদা। ল।
দুইজন মানুষ তারপর বাড়িতে ওঠা নামার মুখে এসে দাঁড়াল। কাছাকাছি আসতেই দৌড়ে গিয়ে দবিরের একটা হাত ধরল নূরজাহান। ও বাবা, বাবা কী অইছে তোমার? কী অইছে? এত তাড়াতাড়ি ফিরত আইলা?
দবির কোনও কথা বলল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উঠানে এসে কাঁধের ভার নামাল বড়ঘরের ছনছায়। (চৌচালা দোচালা একচালা টিনের ঘরের চালা, ঘরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে যেটুকু বেড়ে থাকে, ঘরের বাইরে যেটুকু জায়গার রোদ বৃষ্টি আটকে রাখে সেই জায়গাটাকে বলা হয় ছনছা। শব্দটা বোধহয় সানশেড থেকে এসেছে)। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসল পিড়ায়।
একটা রসের ঠিলার মুখ থেকে ঢাকনা সরিয়ে ঠিলার ভিতর উঁকি দিল নূরজাহান। ঠিলায় অর্ধেক পরিমান রস। দেখে চমকে উঠল সে। দবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, রস বেচো নাই বাবা?
দবির উদাস গলায় বলল, না।
শুনে আঁতকে উঠল হামিদা। ক্যা?
পরে কমুনে। আগে মাইয়াডারে কও ইট্টু রস খাইতে, তুমিও ইট্টু খাও।
দুইতিন পলক বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দৌড়ে গিয়ে রান্নাচালা থেকে টিনের একটা মগ নিয়ে এল নূরজাহান। নিজেই রস ঢালল মগে। মাত্র চুমুক দিতে যাবে, দবির মন খারাপ করা গলায় বলল, ছনুবুজিরে কইছিলাম বচ্ছরের পয়লা রসটা তারে খাওয়ামু। তারে না খাওয়াইয়া রস বেচুম না। গেছি খাওয়াইতে, গিয়া দেহি ছনুবুজি নাই। মইরা গেছে। মরণের সময় পানির তিয়াস লাগছিল। পানি মনে কইরা মাইট্টাতেল খাইয়া হালাইছে।
বাবার কথা শুনে দিশাহারা হয়ে গেল নূরজাহান। মুখের সামনে থেকে রসভর্তি মগ উঠানে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর কোনওদিকে না তাকিয়ে পাগলের মতো বাড়ির নামার দিকে ছুটে গেল।
.
১.২৯
হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রাদিআল্লাহুআনহু হইতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত রাসুলুল্লাহু আলায়হেওয়াসাল্লাম গাধায় আরোহণ করিয়া বনু নাজ্জারের একটি উদ্যানের নিকট দিয়া গমন করিতেছিলেন। আমরাও তাঁহার সঙ্গে ছিলাম। হঠাৎ গাধাটি ভীত হইয়া তাহাকে ফেলিয়া দিবার উপক্রম করিল। সেই স্থানে পাঁচ ছয়টি কবর ছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, এই কবরের অধিবাসীদের সম্বন্ধে তোমরা কেহ কিছু জান কি না? একজন বলিল, আমি জানি। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কী অবস্থায় তাহাদের মৃত্যু হইয়াছে? সে বলিল, শিরকীর মধ্যে। তিনি বলিলেন, ইহাদের কবরে ভীষণ আযাব হইতেছে। তোমরা সহ্য করতে পারিবে না বলিয়া আশংকা থাকিলে আমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিতাম যে, আমি যেমন তাহাদের কবরের আযাব শুনিতে পাইতেছি তোমরা যেন সেইরূপ শুনিতে পাও।
