হ হইবো? তুমি কইলে আমি কথা কইয়া দেখতে পারি।
আমি কইলাম। আপনে কথা কন। দেহেন গাছি কী কয়? গাছির বউ কী কয়? নূরজাহান যুদি কিছু কইতে চায় হেইডাও হোনেন!
চকের এককানি জমিন নূরজাহানের নামে রেসটারি (রেজিস্ট্রি) কইরা দিয়া তারে কিরনীর সতিন কইরা বাড়িতে নিয়া আসলে মতলিব। কোনও উৎসব আয়োজন নাই, খরচাপাতির মধ্যে নূরজাহানরে দুইটা নতুন শাড়ি দিতে হইল, ছায়া ব্লাউজ স্যান্ডেল দিতে হইল। আর জমি রেসটারি করতে যা খরচা। আমিন মুনশি সাহেব বিয়া পড়াইলেন দুপুরবেলা। দবির গাছির বাড়িতে দুপুরের ভাতপানি আর দই মিষ্টি খাইয়া বউ লইয়া রিকশায় কইরা নিজের বাড়িতে চইলা আসল মতলিব। মাইয়া তিনটার দেখভালের জন্য এককানি জমিন গেল, এই দুঃখটা তার মনের মধ্যে রইয়া গেল। আর জমিন এককানি নূরজাহানকে দেওয়ার প্রস্তাব দবির দিয়েছিল মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভাইবা। আল্লাহ না করুক, মতলিব যদি আথকা মইরা যায়, তার তো কোনও ছেলে সন্তান নাই, এই বয়সে হওয়ার সম্ভাবনাও নাই। তখন মতলিবের ভাই আসব বেরাদারি হক নিতে, বইন, বইনজামাইরা আসবো। কিরনী বাঁইচা থাকলে সেও ঠেকাইতে পারব না কেঐরে, নূরজাহানও পারব না। আইন অনুযায়ী মতলিবের ভাইবোনরা তার সম্পত্তির ভাগ একটা পাবেই। এই ফাঁকে মতলিব অবশ্য আরেকটা কাজ সাইরা রাখল। তার অবর্তমানে তার যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির মালিক কইরা দিল তিন মাইয়ারে। তারা সাবালিকা না হওয়া তরি দেখভালের দায়িত্ব তার দুই বউর।
মতলিব তার জাগাসম্পত্তি বাড়িঘর মাইয়াগো দিয়া দিছে শুইনা দবিরও তাই করল। তার মাইয়াটা এমনিতেই দুঃখী। মতলিব ভাঙাচোরা শরীরের প্রায় বুড়া মানুষ। পোলাপান ইহ জিন্দেগিতে নূরজাহানের হইব বইলা মনে হয় না। সে আর হামিদা মইরা গেলে, ওইদিকে মতলিব কিরনী মইরা গেলে, মতলিবের তিন মাইয়ার বিয়াশাদি হইয়া গেলে কোন বিপাকে নূরজাহান পড়ব, আল্লাই জানে। এমতেই মাইয়াটার কপালে ম্যালা ফ্যার। শেষ জীবন কেমতে কাটব কে জানে! যদিও দবিরের কোনও ওয়ারিস নাই। তারপরও কে কোনখান দিয়া বাড়িঘর আর ওই জমিনটুকু দখলের চেষ্টা করব কে জানে! মহাসড়ক হইয়া গেছে, জাগাজমিনের দাম গেছে বাইড়া। কেউ শত্রুতা করলে নূরজাহান ঠেকাইব কেমতে!
দিঘলি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে গিয়া দলিলপত্র সব পরীক্ষা করাইয়া, মতলিব যারে দিয়া তার জাগাসম্পত্তি এককানি লেইখা দিছে নূরজাহানরে, বাকিগুলির মালিক কইরা দিছে মাইয়াগো ঠিক সেই কায়দায় নিজের বাড়িঘর আর জমিনটুকু নূরজাহানের নামে কইরা দিছে। দবির-হামিদা মইরা যাওয়ার পর মালিক হইব নূরজাহান।
নূরজাহানের অবশ্য এইসব নিয়া কোনও কথা ছিল না। মতলিবের লগে বিয়ার প্রস্তাব নিয়া আমিন মুনশি সাবে আসার পর দবির হামিদা দুইদিন চিন্তা করছে, এককানি জমির বুদ্ধিটা দিছে হামিদা। তারপর নূরজাহানের লগে দুইজনেই কথা বলছে। নূরজাহান তো আইজকাইল কথাই বলে না। মা-বাপ দশ কথা বললে সে বলে একখান। সব শুইনা বলল, তোমরা যা ভাল মনে করো, তাই। তোমরা রাজি থাকলেঐ হইব।
এককানি জমিনের প্রস্তাবে মতলিব এত তাড়াতাড়ি রাজি হইব এইটা অবশ্য চিন্তা করে নাই দবির। মুনশি সাব তিনদিন সময় নিলেন। তারপর আইসা বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। মতলিব রাজি। অর সংসার বাঁচানডা বেশি দরকার।
দ্বিতীয় বিয়া হোক আর যাই হোক, বিয়া তো। লোকজন দুই-চারজন আসল। সাক্ষী উকিল বাপ এইসব তো লাগে। এইবারও রব্বানের লগে বিয়ার মতনই, আজিজ গাওয়াল। উকিল বাপ, আবদুল আর আলফু এই পক্ষের সাক্ষী। মতলিবের পক্ষ থেকে জাহিদ খা-র বাড়ির এনায়েত আর হজরতদের বাড়ির আকবর সাক্ষী। চুপচাপ বিয়া হইয়া গেল নূরজাহানের। গ্রামের কেউ যেন তার মুখ দেখতে না পায়, বিয়ার শাড়ি পইরা, থুতনি তরি ঘোমটা দিয়া নতুন স্বামী মতলিবের লগে রিকশায় বইসা তার বাড়িতে আইসা উঠল নূরজাহান। কিরনী আর তার মেয়েরা তাকায়া তাকায়া দেখল। নুরজাহানরে নিয়া বাসররাত করল মতলিব। পুবের ঘরে। হারিকেনের কাঁটা ঘুরাইয়া মতলিব যখন ঘর আন্ধার করছে, আজও কেন যে প্রথম বাসররাতের মতন নূরজাহান মনে মনে বলল, মজনু মজনু।
৩.৯ চাপকল তলায়
ভোররাতে উইঠা চাপকল তলায় গিয়া গোসল কইরা আসছে নূরজাহান।
আইসা আর শোয় নাই, চকির একপাশে চুপচাপ উদাস হইয়া বইসা রইছে। মতলিব তখনও ঘুমে। ঘণ্টাখানেক পর সে উঠল। নূরজাহানের লগে কোনও কথাই বলল না। বিয়ানবেলার কাম কাইজ সাইরা, বড়ঘরে গিয়া কিরনীর লগে কী কী কথা কইয়া টিবিনকারি হাতে বাজারে চইলা যাওয়ার আগে পুবের ঘরে আইসা ঢুকল। আমি বাজারে যাইতাছি। আইতে আইতে রাইত। বিয়া উপলক্ষে বাইত্তে দুইজন আততীয় আইনা রাকছি। তারা আইজকার দিন থাকবো। রান্দনবাড়ন বেবাকঐ আইজ তারা করবো। কাইল বিয়ানে যাইবো গা। কাইল থিকা সংসারডা, মাইয়াডি, মাইয়ার মায়…বুজতেই তো পারতাছো। আর কী কমু তোমারে!
নূরজাহান কোনও কথা বলল না। মাথা নিচা কইরা বইসা রইল।
মতলিব চইলা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তার তিন মেয়ে আইসা ঢুকল পুবের ঘরে। ততক্ষণে বিছানাটা গুছাইয়া রাখছে নুরজাহান। পা উঠাইয়া চকিতে বইসা আছে। তিনমেয়ে একলগে দেইখা অবাকই হইল। রওশনের হাতে একটা রেকাবিতে ইরি চাউলের খিচুড়ি। আয়শার হাতে অ্যালুমিনিয়ামের জগে একজগ পানি আর অ্যালুমিনিয়ামেরঐ হাতলআলা পানির মগ। সবার ছোট খোদেজার হাতে টিনের থালায় একটা ডিমভাজা। অর্থাৎ মতলিবের তিন মেয়ে তাদের নতুন মায়ের জন্য সকালবেলার নাস্তা নিয়া আসছে।
