বিছানা গুটাইয়া রাখার পর চকিতে এখন একটা পাটি বিছানো। পাটির উপর যার যার হাতের জিনিস নামায়া রাখল তারা। বড় রওশন বলল, আপনের নাছতা।
নূরজাহান একে একে তিনটা মেয়ের মুখের দিকে তাকাল। মুখ দেখলে বুঝা যায়। বাচ্চাকাচ্চার যত্নআত্তি বলতে যা বুঝায় এই তিনটা মাইয়ার কপালে সেইটা জোটে না। সবারই দাঁত ময়লা, মুখ খসখসা, হাত পায়ে খড়িওঠা ভাব, মাথার চুলে তেলপানি দেওয়া হয় না। বাপ গতকাইল বিয়া করছে, বাপের বিয়া উপলক্ষেও মাইয়া তিনটার কাপড়চোপড় চেহারা সুরতের ঠিক নাই।
নূরজাহানের মায়া লাগল মেয়েগুলির জন্য। বলল, তোমরা খাইছো?
আয়শা বলল, হ খাইছি। তয় আমগো পুরা একখান কইরা আন্ডা দেয় নাই। একখান ভাজা আন্ডা তিনবইনে ভাগ কইরা খাইছি।
রওশন বলল, তয় খিচড়ি দিছিল থাল ভইরা।
ছোট মেয়ে খোদেজা আধোআধো গলায় বলল, আমারেও দিছিল।
রওশন বলল, তয় যেই দুইজন পশশু থিকা আমগো বাইত্তে, বাবায় কইছে তারা দুইজন আমগো ফুবু অয়। তারা থাল ভইরা ভইরা খিচড়ি খাইছে, পুরা একখান কইরা আন্ডাভাজা খাইছে।
নূরজাহান হাসল। তয় তোমরা একখান কাম করো। এই আন্ডাভাজাডা তিন বইনে ভাগ কইরা খাইয়া হালাও। আমি খালি খিচড়ি খামু নে। আমার আন্ডাভাজা ভাল্লাগে না।
আয়শার মুখটা উজ্জ্বল হইল। সত্যঐ।
হ। সত্যঐ।
রওশন বলল, না আপনে মিছাকথা কইতাছেন। আমগো খুশি করনের লেইগা।
আরে না। তোমরা খাও।
খোদেজা বলল, আমিও খামু?
খাও খাও।
তিন বোন ভাগ কইরা খুবই মজা নিয়া ডিমভাজাটা খাইল। নূরজাহান খিচড়ি খাইতে খাইতে ওদের খাওয়াটা দেখল। মেয়ে তিনটার জন্য আবার খুব মায়া লাগল তার। আহা রে, মা থাকতেও মা নাই। মা পইড়া থাকে বিছানায়। মেয়ে তিনটা নিজেদের মতন বড় হইতাছে।
আয়শা বলল, আপনেরে আমরা ছোডমা কমু না?
রওশন তাকে একটা ঠেলা দিল। হ, ছোডমা কমু না তয় কী কমু? হেয় তো আমগো ছোডমাঐ। মায় আমগো হিগাইয়া দিছে না?
খোদেজা বলল, আমিও ছোডমা কমু!
নূরজাহান রওশনের দিকে তাকাল। তোমার মায় নাছতা করছে?
হ খিচড়ি খাইছে। ইকটু আন্ডা ভাজাও খাইছে।
খাওয়াদাওয়া শেষ কইরা নূরজাহান রেকাবি হাতে চকি থেকে নামল।
রওশন বলল, কই যান?
বাইরে যাই। থাল বাসন ধুইয়া রাখি।
না আইজ আপনের কিছু করনের কাম নাই। বাবায় কইছে, আইজ ওই ফুবুরা করবো। কাইল থিকা করবেন আপনে। দেন এইডি আমগো হাতে দেন, আমরা ফুবুগো। দিয়াহি।
আইচ্ছা ঠিক আছে, দেও তাগো নিয়া। তয় আমিও ঘর থিকা বাইর হমু।
ক্যা?
তোমার মা’র ঘরে যামু, তার লগে কথা কমু।
আয়শা বলল, লন।
ওরা সবাই একলগে ঘর থেকে বাইর হইল। রওশনরা তিন বোন চইলা গেল রান্ধনঘরের দিকে। নূরজাহান আড়চোখে দেখল সেই ঘরে দুইজন মাঝবয়সি মোটা তাজা মহিলা রান বাড়নের আয়োজন করছে। একজনে মশলা বাটছে আরেকজন ভাতের হাঁড়িতে চাউল নিয়া চাপকলতলার দিকে চইলা গেল। নূরজাহান যে বড়ঘরের দিকে যাইতাছে এইটা তারা দেখল। কেউ কোনও কথা বলল না।
নূরজাহানকে দেইখা উইঠা বসল কিরনী। তার পরনে ত্যানা ত্যানা বেগুনি রঙের একখান শাড়ি। মুখটা একেবারেই ভাঙাচোরা, চোখগুলি গর্তে, চোখের কোলে লেপটাইয়া। কাজল দেওয়ার মতন পড়ছে কালি। হাত দুইটা মরা জিংলা কাঠির (এক ধরনের গাছের সরু মরা ডাল) মতন। উইঠা বসতে তার খুব কষ্ট হইল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আহো। বইন, আহো। বহো। আমার বিচনায়ঐ বহো।
নূরজাহানের পরনে টিয়াপাখি রঙের শাড়ি। সকালবেলা গোসল করবার ফলে দেখতে ভাল লাগছে তাকে। মাথায় ঘোমটা দেওয়া। গা থেকে নতুন বউ নতুন বউ গন্ধ আসছে।
খুবই নরম ভঙ্গিতে কিরনীর বিছানায় বসল সে। বসেই টের পাইল ঘরে কী রকম বোটকা গন্ধ। বিছানা কথা বালিশ থেকে গন্ধটা আসছে। এই ঘরের কাঁথা বালিশ বিছানা বহুদিন যে পরিষ্কার করা হয় না, ধোয়া পাকলা হয় না, রোদে দেওয়া হয় না গন্ধটা এইজন্য।
কিরনীর শরীর থেকেও গন্ধ আসছিল। সেও বোধহয় দুই-চারদিনে একবার গোসল করে না। পেশাব পায়খানা করে ঠিকঠাক মতন হাত ধোয় না, দাঁত মাজে না। তার পাশে বইসা দম বন্ধ হইয়া আসল নূরজাহানের। হায় হায় এমুন ঘরে মানুষ থাকে কেমতে?
নূরজাহানের ইচ্ছা হল মুখে আঁচল চাইপা রাখে। সেইটা ভাল দেখা যাইব না দেইখা কাজটা সে করল না। দম বন্ধ কইরা বইসা রইল।
কিরনী ততক্ষণে একটু সুস্থির হইছে। নূরজাহানের মুখের দিকে তাকায়া বলল, তোমার ঘটনা আমি বেবাকঐ জানি বইন। মাওলানা সাবের মুখে ছ্যাপ তুমি ক্যান দিছিলা হেইডা গেরামের বেবাকতেঐ পরে বুজছে। তয় মাওলানা মানুষ ভাল না। তারবাদেও বিয়াড়া তোমার ভালই হইছিল। কী করবা বইন কও, বিয়াড়া তোমার টিকলো না। জামাইডা বেইমানি করলো। দুনিয়ার পুরুষপোলাডি বেইমানঐ অয় বইন। মাইয়া মাইনষের লগে বেইমানিডা তারা বেশি করে। তয় আল্লায় কপালে যা রাখে তাই হয়। তোমার কপালে যা রাকছে তাই হইছে। আমিঐ রওশনের বাপরে কইছি বিয়া করতে। তুমি ভাইবো না, আমি তোমার হতিন, উটতে বইতে তোমারে জ্বালামু। আমি বইন ওইপদের মানুষ না। আমার দশা তো তুমি দেকতাছোঐ। কোনদিন মইরা সিদা অইয়া যামু আল্লাই জানে। তুমি আমারে কোনওদিনও তোমার শতরু মনে কইরো না। মনে কইরো তোমার বইন। আপনা বড়বইন মনে কইরো। আমিও তোমারে তাই মনে করুম। তুমি তোমার ইচ্ছা মতন সংসার চালাইয়ো। এই হগল লইয়া আমার কোনও কথা নাই! রওশনের বাপরে দেইখা। শুইনা, খাওয়াইয়া দাওয়াইয়া বাঁচাইয়া রাইখো। আমি তো তার লেইগা কিছু করতে পারি না। অসুইক্কা শইল লইয়া স্বামীর সেবাযত্ন কিছু করতে পারি নাই। তুমি ওইডা কইরো বইন।
