মাইয়া তিনটা মতলিবের নাম শুনলেই থামে। এমনকী ক্যাতরা (ছোট) মাইয়াটাও। তয় মতলিবের মাইয়া তিনটা দেখতে ভাল না। দুইন্নার কালা এহেকটা। কিরনীর গায়ের রং কালা না। মাইয়ারা পাইছে বাপের রং। মতলিব ভালই কালা। কালা আর কাহিল। মুদিদোকানদারি করে বইলা স্বভাবে বিরাট কিরপিন। ওই যে কথায় আছে না, মুদিদোকানদাররা পিঁপড়ার পাছায় চিমটি দিয়া মিঠাই রাইখা দেয়, মতলিব পিপড়ার পাছায় চিমটি দিয়া মিঠাই রাইখা দেওয়া জিনিস।
এই স্বভাবের জন্যই কিরনীর ভাল চিকিৎসা কোনওদিন সে করাই নাই। হাঁপানি আর বাত বেশি বাইড়া গেলে, কিরনী যখন যায় যায় তখন সে কাজির পাগলার করিম ডাক্তারের কাছে গিয়া অমুদ নিয়া আসে। হাঁপানির একটা ফুছফুছ যন্ত্র (ইনহেলার) আছে কিরনীর। বহুত পুরানা। বেশির ভাগ সময়ই যন্ত্রর ভিতরকার অষুদটা থাকে না। কিরনীর যায় যায় অবস্থা হইলে ওই অষুদ খুবই মন খারাপ কইরা কিনা আনে মতলিব। ইস, এমুন বউর লেইগা নগদ এতডি টেকা খরচা? কিরনীর অষুদ কিনার কষ্টে রাইত কাটে মতলিবের অরঘুমা। মেজাজ থাকে বিগড়াইয়া। মনে মনে খালি কয়, মাগি মরে না ক্যা?
হাঁপানি রোগীরা কেন যে সহজে মরে না!
যার মরণের সে না মইরা মরল মতলিবের ফুবুটা। সংসারটা যে চালাইত, সে। হায় হায়! অহন!
মাথায় আশমান ভাইঙ্গা পড়ল মতলিবের। অহন কী হইব? সংসার চলব কেমতে? মাইয়ারা ডাঙ্গর হইতাছে, তাগো দেখব কে? আট বছরের বড় মাইয়ায় কি সংসার সামলাইতে পারব! রান্ধন বাড়ন, খাওন দাওন! হায় হায়! বাড়িতে যে কামের লেইগা চউরানি (চরের মহিলা) রাখব, একলা ওইরকম চউরানি পাওয়া যাইব না! রাবির মতন পাওয়া যাইব, জামাই পোলাপানসহ। তাগো নাইলে থাকনের লেইগা পুবের ভিটির ঘরটা দিল। তয় তিন চাইরজনের সংসার যুদি হয়! পুরুষটা হয়তো কামলা দিব এদিক ওদিক, রিকশা মিকশা চালাইব। টাকা কামাইব ঠিক, তয় খাইতে চাইব মতলিবেরটা।
কী করন যায়?
কিরনী হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, তুমি একখান বিয়া করো। বিয়া করলে এক কামে দুইকাম হইব তোমার। সংসার আর পোলাপান সামলানের মানুষও পাইলা, রাইত্রে শোওনের। মানুষও পাইলা! আমি আর কয়দিন? আমার দিন ফুরাইয়া আইতাছে। ফুবুর লাহান যে কোনওদিন দেখবা, মইরা সিদা অইয়া রইছি।
শরীরের চাহিদা মতলিবের তেমন নাই। নিজেই সে ভাঙাচোরা মানুষ। তার দরকার সংসার আর মাইয়া তিনডা সামলানের মানুষ! কিরনীর কথাটা তার খারাপ লাগে না।
একদিন কিরনীরে বলল, গাদিঘাটে খবর দিবানি?
কিরনী অবাক। কীয়ের খবর?
অর্থাৎ আমারে তুমি বিয়া করাইতে চাও এইডা তোমার ভাইবেরাদারগো জানাইবা না? বইন, বইন জামাইগো তো জানান উচিত। তোমার বাপ-মা বাইচা থাকলে কইতাম তাগো জানাইতে!
ক্যা?
এইডা নিয়ম। এক বউ থাকতে আরেক বউ, শালা সমন্দিরা, শালি শালির জামাইরা এই হগল লইয়া কথা তুলবো না?
কিরনী শ্বাস টানতে টানতে বলল, মদিদোকানদাররা চালাক চতুর হয়। তয় তুমি হইলা ভোদাই। আরে তোমার বউডা যেহেনে তোমারে বিয়া করতে কইতাছে হেহেনে বউর ভাইবইন, বইনজামাই ভাবিগো কওনের কী আছে? আর তারা বেবাকতে তো আমার শইল্লের খবর জানে। ফুবুর মরণের খবরও পাইছে। কামের বেডিবুডি রাখনের থিকা বিয়া করলে লাভ তোমার বেশি। তয় একখান ডর খালি আমার আছে, মাগি আইয়া না আমার মাইয়াছির লগে খারাপ ব্যবহার করে! অগো মারে ধরে। আমারেও যুদি অইত্যাচার করে, আমি অসুইক্কা মানুষ, আমি কিছু করতে পারুম না। মাগির লগে শইল্লের জোরেও পারুম না।
মতলিব বিড়ি খাওয়া লোক। অতি সস্তা পাতার বিড়ি খায় সে। বিড়ি টানতে টানতে বলল, না অমুন বিয়া করুম ক্যা? বিয়া করতে অইলে এই হগল দেইক্কাঐ করুম। খাড়ে দজ্জাল বিয়া করুম না। নরম সরম মাইয়া বিয়া করুম। আগে বিয়াশাদি হইছে, জামাই ছাইড়া দিছে আর নাইলে মইরা গেছে, বিধবা। এমুন পাইলে করুম। তয় করন উচিত তাড়াতাড়ি। সংসার তো অচল হইয়া গেল!
হ। তয় আথকা এমুন মাইয়া তুমি পাইবা কই?
ঘটক লাগামুনি?
লাগাইতে পারো। তয় ঘটকায় টেকা খাইবো ম্যালা।
হ হেইডা ঠিক।
তয় তুমি একখান কাম করতে পারো। আমিন মুনশি সাবের লগে তো তোমার ভাল খাতির। তার লগে কথা কও। হেয় গেরামে গেরামে ঘোরে। মুনশি মানুষ হইলেও আধা পাগলা। এই বাড়ি যায়, ওই বাড়ি যায়। হেয় অমুন কোনও মাইয়ার খবর তোমারে দিতে পারেনি দেহো। আমার মনে হয় পিরবো।
নূরজাহানের কথা আমিন মুনশিই বলল। শুইনা মতলিব গেল ডরাইয়া। হায় হায় কন কী মুনশিসাব? নূরজাহান তো সাই পাজি মাইয়া। মান্নান মাওলানার মুখে ছ্যাপ দিছিল।
আমিন মুনশি দাড়ি হাতাতে হাতাতে বলল, হেই নূরজাহান আর নাই। বিয়ার পর, তালাক হইয়া যাওয়ার পর মাইয়াটা গেছে অন্যরকম হইয়া। কথাবার্তা মাইনষের লগে কয়ঐ না। বাইত থিকা বাইর হয় না। সংসারের বেবাক কাম একলা করে। তুমি নূরজাহানরে বিয়া করলে তোমার সংসার বাঁইচ্চা যাইবো এইটা আমি গেরানটি (গ্রান্টি) দিতে পারি।
মতলিব চিন্তিত গলায় বলল, আপনে কইতাছেন?
আরে হ মিয়া। আমি কইতাছি। আর আমি যে মিছাকথা কই না এইডা তুমি ভাল কইরাঐ জানো।
হ হেইডা জানি। খালি আমি না, দেশগেরামের বেবাকতেই জানে।
তয়?
তয় গাছির লগে কথা কইবো কে? তারা রাজি হইলো কিনা হেইডা বুঝতে অইবো না?
