চোখ তুলে একবার নূরজাহানের দিকে তাকাল হামিদা। তারপর কালিজিরা বাটতে বাটতে বলল, শীতের পয়লা দিন আইজ। তর বাপে গেছে রস বেচতে। বিয়াইন্না রাইত্রে উইট্টা গেছে। ফিরা আইতে আইতে বেইল উইট্টা যাইবো। বাঘের লাহান খিদা লাগবো আইজ। হের লেইগা কাজিরভাত রানতাছি।
বাবায় কাজিরভাত রানতে কইয়া গেছে।
না কয় নাই। আমি নিজে থিকাঐ রানতাছি।
ক্যা?
তর বাপে কাজিরভাত পছন্দ করে। নানান পদের ভর্তা দিয়া কাজিরভাত খাইতে পারলে মন ভাল থাকে তার। আইজ পয়লা দিন তো, বহুত খাটনি যাইবো কামে। বাইত্তে আইয়া কাজিরভাত দেকলে খুশি অইবো। খাটনির কথা ভুইল্লা যাইবো।
কয় পদের ভর্তা বানাইবা?
তিন চাইর পদের।
কী কী?
চুলার হাড়িতে তখন বলক এসেছে। উতড়াতে শুরু করেছে ভাত। শো শো শব্দে নাচছে সরা। কালিজিরা ভর্তাটাও ততক্ষণে তৈরি হয়ে গেছে। হাত দিয়ে কেচে পাটা থেকে ভর্তা তুলল হামিদা। টিনের একটা বাটিতে রাখল। লুছনি (যে ন্যাকড়া দিয়ে গরম হাড়ি কড়াই ধরতে হয়) দিয়ে ধরে সরা সরিয়ে নারকেলের আইচা দিয়ে তৈরি হাতায় হাঁড়ির ভাত দুই তিনবার উলট পালট করে দিল। একটা দুইটা ভাত দুই আঙুলের ডগায় নিয়ে টিপে দেখল ফুটেছে কি না। তারপর হাঁড়ির মুখে আবার সরার ঢাকনা দিয়ে বলল, এই যে কালিজিরা ভর্তা বানাইলাম, একপদ তো অইয়াই গেলো। ভাতের লগে গোলালু সিদ্দ দিছি। টালা মরিচ আর সউষ্যার (সরিষার) তেল দিয়া মইত্তা (মথে) আলুভর্তা বানামু। শেষমেষ বানামু চ্যাবা সুটকির (পুঁটি মাছের বিশেষ এক প্রকার সুটকি) ভর্তা।
এই তিনপদঐ?
হ।
ইলশা মাছের কানসা, ছোবা (ইলিশ মাছের কানকোর ভেতর যে লালচে জিনিসটা থাকে) এই হগলের ভর্তা বানাইবা না?
হামিদা হাসল। পামু কই?
নূরজাহান ঠোঁট উল্টে বলল, কাজিরভাতের লগে ইলশা মাছের কিছু একখান না থাকলে খাইয়া সাদ নাই। হয় কানসা ছোবার ভর্তা, নাইলে কড়কড়া ইলশা মাছ ভাজা, ইলশা মাছের আণ্ডা ভাজা, লুকা (নাড়িভুঁড়ি) ভাজা। ধ্যুৎ আউজকা কাজিরভাত খাইয়া সাদ পামু না।
হামিদা বুঝে গেল মেয়ের ইলিশ মাছ খাওয়ার সাধ হয়েছে। মাওয়ার বাজারে গেলেই পদ্মার তাজা ইলিশ, চকচকে সাদা রঙের উপর নীলচে আভা। গাছিকে বলতে হবে কাজিরভাত খেয়েই যেন বাজারে যায়। প্রথম দিনের রস বেচা পয়সায় যেন একখান ইলিশ মাছ কিনে আনে। মেয়ের সাধটা যেন পূরণ করে।
নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হামিদা বলল, তর বাপে আহুক, তারে আমি কমুনে।
নূরজাহান অবাক হল। কী কইবা?
তুই যে ইলশা মাছ খাইতে চাইছস হেইডা। আইজ বাজারে পাডামুনে। আইজ ইলশা মাছ আইন্না খাওয়ামুনে তরে।
শুনে আবার মিষ্টি করে হাসল নূরজাহান। তুমি যে আমারে এত আদর করো এইডা কইলাম অনেক সময় বুজি না আমি।
ক্যা?
আদরের থিকা রাগ যে বেশি করো! কোনওহানে যাইতে দিতে চাও না। যাইতে চাইলে গাইল দেও, মারো। একদিন তো বাইন্দাও থুইছিলা। বাবায় আইয়া ছাড়ছে। তুমি আমার লগে এমুন করো ক্যা মা?
সরা সরিয়ে ভাতের হাঁড়িতে হাতা ঢুকাল হামিদা। আন্দাজ করে করে ভাতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সিদ্দ গোলআলু তুলতে লাগল : তুলে একটা খোড়ায় রাখতে রাখতে বলল, কেন যে করি হেইডা তুই বুজবি না।
নূরজাহান মুখ ঝামটাল। সব সময় এককথা কইবা না। বুজুম না ক্যা, আমি কি পোলাপান?
নূরজাহানের মুখ ঝামটা শুনে পলকের জন্য তার দিকে তাকাল হামিদা। তারপর দুইহাতে দুইটা লুছনি নিয়ে হাঁড়ির কানা ধরে নামিয়ে চুলার ওপাশে রাখা ছাই রঙের খাদায় ভাত ঠিকনা দিল। দিয়ে ধীর নরম গলায় বলল, তুই যে একখান মাইয়া, তুই যে ডাঙ্গর অইছস এইডা তুই বোজ?
বুজি।
ডাঙ্গর মাইয়াগো কী কী নিয়ম মাইন্না চলতে অয় বোজছ?
বুজি।
এবার মুখ ঘুরিয়ে নূরজাহানের চোখের দিকে তাকাল হামিদা। না বোজচ না।
কে কইছে বুজি না! তুমি আমারে বেবাক বুজাইছো না?
বেবাক না খালি একখান জিনিস বুজাইছি। মাইয়া মাইনষের শইল বড় ভেজাইল্লা জিনিস। নানান পদের ভেজাল আছে এই শইল্লে। হেই হগল ভেজালের একখান তরে বুজাইছি। যেইদিন বুজাইছি ঐদিন তুই ডাঙ্গর অইলি। আর ঐদিন থিকাঐ বিপদটা তর শুরু অইছে।
কথাটার আগামাথা কিছুই বুঝল না নূরজাহান। বলল, কিয়ের বিপদ?
চুলায় মাটির খোলা বসাল হামিদা। টিনের ছোট্ট একখান পট থেকে চারটা চ্যাপা সুটকি বের করে তপ্ত খোলায় টালতে টলতে বলল, বিপদটার নাম অইলো পুরুষপোলা। একখান মাইয়া যহন ডাঙ্গর অয় আপনা বাপ ভাই ছাড়া দুইন্নাইর বেবাক পুরুষপোলাঐ তহন হেই মাইয়াডার মিহি কুদিষ্টি দিয়া চায়। নানান উছিলায় আতালি পাতালি কথা কইয়া, লোভ দেহাইয়া, ডর দেহাইয়া নাইলে জোর কইরা মাইয়াডার শইলডারে নষ্ট করতে চায়। আর মাইয়া মাইনষের শইল এমুন, একবার নষ্ট অইলো তো সব্বনাশ, বেবাক গেল। হেই শইল আর স্বামীরে দেওন যায় না। দিলে গুনা অয়, জনম ভইরা দোযকের আগুনে জ্বলতে অয়। হিন্দুরা যহন পূজা করে, দেবদেবীরে পূজা দেয়, তহন ফুল লাগে। তাজা ভাল ফুল। বাসি পচা ফুল অইলে পূজা অয় না। দেবতায় অদিশাপ দেয়। মাইয়ামানুষ অইল পূজার ফুলের লাহান। একবার বাসি অইয়া গেলে হেই ফুলে স্বামী দেবতার পূজা অয় না। ডাঙ্গর অওনের লগে লগে এর লেইগাঐ সাবদান অইতে অয় মাইয়ামাইনষের। আলায় বালায় (যত্রতত্র) ঘুইরা বেড়ান যায় না। কুনসুম কোন বিপদে পড়বো কে জানে!
