বাদলা বলল, এইডা আপনে না করতে পারবেন না গাছিমামা। দোকানডা তো পইড়াঐ রইছে। আমরা খুইল্লা চালাই। চালানপত্র বেবাক আমগো। আপনেরে মাসে মাসে কিছু ভাড়া দিমুনে। আমার বাপের তো শইলডা কোনও সমায়ঐ ভাল থাকে না, কাম কাইজ করতে পারে না, হেয় আমার লগে দোকানে বইয়া থাকবো। আমি বাইত্তে ভাত খাইতে গেলে হেয় দোকান পইড় দিবো। চা বানানডাও হিগাইয়া হালামুনে তারে। ঠেকাবাজায় (ঠেকা বেঠেকায়) দুই-চাইর কাপ চা বানাইয়া গাহেকরে দিতে পারবো!
দবির একবার হামিদার দিকে তাকাল। হোনছো অগো কথা?
হামিদা বলল, হুনছি।
কী কও?
আমার কওনের কিছু নাই।
মাইয়ারে জিগাইবা?
ইচ্ছা করলে জিগাইতে পারো।
ডাক দিবা অরে?
তার আগে বাদলারা ভাড়া কত কইরা দিবো হেইডা ঠিক করবা না?
নূরজাহান বলল, যা ইচ্ছা দেউক। দোকান দিয়া দেও বাদলারে!
নূরজাহান কখন উঠল, কখন আইসা খাড়ইল হামিদার পিছনে, অন্যরা তো বোঝেই নাই, হামিদা নিজেও বোঝে নাই। এইবার তার কথায় সবাই মুখ ঘুরাইয়া তার দিকে চাইল। রাবি হাসিমুখে বলল, কেমুন আছস নূরজাহান?
নূরজাহান ম্লান গলায় বলল, আছি ভালই।
অনেকদিন বাদে তরে দেকলাম।
হ। আমিও তোমগো দেকলাম অনেকদিন বাদে।
কয়েক পলকে তারপর নূরজাহানের অনেক কিছুই যেন দেইখা ফালাইল রাবি। নূরজাহান আর সেই নূরজাহান নাই। নূরজাহান এখন ভারভারিক্কি, দেশগেরামের বউঝিগো মতন। কামকাইজ করা, সংসার করা শক্তপোক্ত মাইয়া। বয়স য্যান আথকা বেশ কয়েক বছর বাইড়া গেছে। বয়সের থেকে অনেক বড় লাগে নূরজাহানরে।
রাবি মনে মনে বলল, বিয়ার পানি পেডে গেলে এমুনঐ হয়!
মাসে দুইশো টাকা দোকান ভাড়া সাব্যস্ত কইরা রাবি মতলা আর বাদলা দোকানের চাবি লইয়া চইলা গেল।
এই ঘটনার দেড়-পোনে (পৌনে) দুই বচ্ছর পর আবার বিয়া হইল নূরজাহানের।
.
জাহিদ খাঁ-র বাড়ির পুব-দক্ষিণ কোনায় মতলিব মিয়ার বাড়ি। বাড়ি তেমন বড় না। বড়ঘরটা পাটাতন করা। বাংলাঘরটা বাইর বাড়ির দিকে, মাঝারি সাইজের। ওই মাপের আরেকটা ঘর আছে পুবের ভিটায়, সেই ঘরের দক্ষিণ কোনায় রান্ধনঘর আর চাপকল। পায়খানা ঘরটা পুবদিককার আমগাছ দুইটা ছাড়ায়া, ভাঙনের দিকে। বাড়িতে ঢোকার রাস্তা জাহিদ খাঁ-র বাড়ি আর মতিনদের বাড়ির মাঝখান দিয়া।
মতলিবের অবস্থা মোটামুটি ভালই। মাওয়ার বাজারে বহুত পুরানা মুদিদোকান তার। নিজের বাড়ির অন্য কোনও ওয়ারিশ নাই। তিন বইন, দুই ভাই তারা। বইনদের বিয়াশাদির পর যে যার ভাগের সম্পত্তি মতলিবের কাছে বেইচা টাকাপয়সা নিয়া গেছে। ছোটভাই বিয়া করছে গাজিপুরে। গাজিপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে কাজ করত। সেখানে বিয়াশাদি করছে, ছোট একখান বাড়িও করছে। সেও তার বাপের সম্পত্তি ভাইয়ের কাছে বেইচা গেছে, গাজিপুরের বাড়িতে দালান তোলার জন্য। এখন সব মিলাইয়া কামারবাড়ির আর তালুকদার বাড়ির মাঝখানকার চকে মতলিবের আড়াইকানি ধানের জমিন আর এই বাড়ি।
তবে সংসারে সুখ নাই মতলিবের। তার ঘাড়ে সংসার আর তিন বইন এক ভাই ফালাইয়া প্রথমে বাপ মরল, তারপর মা। মতলিব মুদিদোকানদারি কইরা তিন বইনের বিয়া দিল, ভাইর নাম আবু তালিব, তারে বিএ পাশ করাইল। এই করতে করতে দিন গেছে অনেক। মতলিব বিয়া করল একটু বেশি বয়সে। শ্বশুরবাড়ি গাদিঘাট। বউর নাম করিমুন্নেসা, ডাকনাম কিরনী। তার আগেই ছোটভাই তালিব বিয়াশাদি কইরা গাজিপুরে স্থায়ী হইয়া গেছে। মতলিবের সংসারে সুখ নাই কিরনীর কারণে। সে অসুইক্কা (অসুখে)। হাঁপানি আছে, বাত আছে। আরও নানান পদের মেয়েলি সমস্যা। বিয়ার পর বছর ছয় মাসের মাথায় পয়লা বাচ্চা নষ্ট হইল। তার দুই বচ্ছর পর নষ্ট হইল পাঁচ মাসের মাথায়। তারপর আর বাচ্চাই হয় না, হয় না অবস্থা। সাত বচ্ছর পর একটা মাইয়া হইল। তারপর পর পর আরও দুইটা, মোট তিনটা মাইয়া হইল। ততদিনে কিরনী বিছনা নিয়া নিছে, সংসার সামলায় মতলিবের দূর সম্পর্কের স্বামী সন্তান ভাইবইন ছাড়া এক ফুবু। প্রায় বুড়া বয়সি মহিলা। শরীরও তেমন না। তাও জানটা। দিয়া মতলিবের সংসার সামলাইত, মাইয়া তিনটা আর কিরনীরে সামলাইত। মতলিবের তো। দিন কাটে বাজারেই। দুপুইরা ভাত টিবিনকারিতে (টিফিন কেরিয়ার) কইরা বাজারে নিয়া যায়, ওখানে বইসাই খায়। সকালের নাস্তা আর রাতের ভাত খায় বাড়িতে। বাড়িতে কয়েকটা হাঁস মুরগি আছে, ওইগুলিরও দেখাশুনা করতে হয়। গোরু বরকি নাই। কে পালব?
মতলিবের বড় মাইয়ার নাম রওশন, মাজারো মাইয়া আয়শা আর ছোটটা খোদেজা। রওশনের বয়স হইছে আট বচ্ছর, আয়শার ছয় আর খোদেজার তিন। কোনওটার কোনও লেখাপড়া নাই, কামকাইজ নাই। মতলিবের ফুরু হয় তাগো দাদি। দাদি দাদি কইরা দিন রাইত ত্যক্ত করে মহিলারে। কাইজ্জাকিত্তন, মারামারি করে তিন মাইয়ায়। বড়ঘরের পালঙ্কে শুইয়া হাঁপাতে হাঁপাতে মাইয়া তিনটারে শাসন করার চেষ্টা করে কিরনী, মাইয়ারা কিরনীরে পাত্তা দেয় না। জানে মায় উইঠা আইসা কিল থাবড় দিতে পারব না। লাঠি দিয়া বাইড়াইতে পারব না।
তবে মতলিব বাড়িতে থাকলে মাইয়ারা একটু শান্ত থাকে। মতলিব ভাঙাচোরা শরীরের মানুষ। কথাবার্তা কম বলে। কাউরে তেমন কিছু বলে না, তাও মাইয়া তিনডা মতলিবরে ভালই ডরায়। দিনভর তাদের দুষ্টামি চলে। দুষ্টামির মাত্রা বাইড়া গেলে মতলিবের ফুবু তাদেরকে মতলিবের কথা বইলা ডর দেখায়। আইজ আহুক মতলিব। কমু নে তরা এই এই করছস। আমার কথা হোনচ নাই। মা’র কথা হোনচ নাই। অসুইক্কা মা’র মিহি চাইয়াও দেহচ নাই।
