দবির হামিদা দুইজনে মিল্লা একদিন ধরছিল নূরজাহানরে। তুই একলা ক্যান এত কষ্ট করতাছস মা? আমগো দুইজনরে তো কোনও কামঐ করতে দেয় না!
নূরজাহান বলছে, আমার জন্মের পর থিকাই তো তোমরা আমার লেইগা বেবাক কিছু করছো। জানডা দিয়া দিছো আমার লেইগা। কত অপমান অইছো আমার লেইগা, কত কষ্ট করছো, চিন্তা করছে। আমি তোমগো লেইগা কিছু করি নাই। আমারে তোমরা খাওয়াইছো পরাইছো, এত আদর মহব্বত করছো, এত কষ্ট কইরা পাই পাই কইরা পয়সা জমাইয়া আমারে বিয়া দিছো, আমার কপালে বিয়া সয় নাই, আল্লায় কপালে রাখে নাই দেইখা এই হগল লইয়া অহন আর কোনও হায়আপশোস করি না আমি। আল্লায় আমার কপালে যা রাখছে তাই হইছে। এর লেইগা আমি মনে মনে চিন্তা করছি, যতদিন বাঁইচ্চা আছি তোমগো দুইজনরে ঘরবাড়ির কাম আর কিছু করতে দিমু না। বেবাক আমি করুম। শেষ জীবনডা তোমরা দুইজন ইকটু আরামে কাটাও। একদিন আমার লেইগা করছো, অহন আমি তোমগো লেইগা করতে চাই। মাইয়া না অইয়া আমি যুদি তোমগো পোলা হইতাম, তয় রুজি রোজগার কইরা, গিরস্তি কইরা তোমগো খাওয়াইতাম। হেইডা তো আর অয় নাই। আল্লায় তো আর আমারে পোলা বানায় নাই, বানাইছে মাইয়া। এর লেইগা ঘরবাড়ির কাম কইরা তোমগো আমি ইকটু আরামে রাখতে চাই। আর কিছু না।
নূরজাহানের কথা শুইনা দবির হামিদা দুইজনেই বুঝছে, ঘরবাড়ির কামে, সংসারের কামে ডুইবা থাইকা নিজের জীবনের সবকিছু ভুলতে চায় নূরজাহান। কোনও কিছু মনে করতে চায় না। তবে কোনও কোনও বিকালে, যখন ঘরবাড়ির কোনও কাজ থাকে না, একদম আজাইর নূরজাহান, তখন সে মনমরা ভঙ্গিতে বাঁশঝাড়তলার ওই দিকটায় যায়। নাড়ার পালাটায় ঢেলান দিয়া উদাস চোখে সামনের চকের দিকে তাকায়া থাকে, ভাদাইম্মা কুত্তাটা গিয়া দাঁড়ায়া থাকে তার লগে, এই দৃশ্য দেইখা দবির হামিদা নিয়াস ছাড়ে। আহা জীবনটা কেমুন ছেঁড়াভেড়া হইয়া গেল মাইয়াটার! কত আশা, কত স্বপ্ন নিয়া রব্বানের লগে বিয়া দিছিল, পয়লা পয়লা মনে হইল কত ভাল পোলা রব্বান, তারপর…! তুরখুলা (মাটির গর্তে থাকা বড় পোকা) মনে কইরা গরম পানি ঢালা হইল উঠানের গর্তে, বাইর হইল জাইতসাপ। আহা রে, আহা!
মালখানগর থেকে ফিরা আসার পর, জ্বর সাইরা ওঠার পর দবির ভাবছিল রমিজ ঘটকরে ধরব। রব্বানরে যেমন একখান থাবড় মারছে ঠিক তেমন একখান থাবড় মারব শালার গালে। কয়ডা টেকার লেইগা তুই আমার মাইয়ার জীবন নষ্ট করলি খানকি মাগির পোলা!
হামিদা তারে থামাইয়া রাখছে। কোনও লাভ নাই এই হগল কইরা। আমগো পাশে খাড়নের কেঐ নাই। রমিজ ঘটকের পোলাপান আছে, আততিয় স্বজন আছে। তাগো লগে শতরুতা কইরা তুমি পারবা না। উলটা বিপদ হইব!
দবির রমিজরে কিছু বলতে পারে নাই। মাওয়ার বাজারে দুই একদিন দেখা হইছে, রমিজ আগাইয়া আইসা কথা বলতে চাইছে, দবির উলটা দিকে মুখ ঘুরাইয়া চইলা গেছে। রমিজের লগে কথা কইতে ঘিন্না লাগছে। হামিদার কথা একদিকে ঠিক, শতরুতা বাড়াইয়া লাভ কী? নূরজাহানের জীবনে যা ঘইটা গেছে ওইটা কি আর ফিরত পাওয়া যাইব!
তবে রব্বানের উপরে যেমন ঘিন্না, রমিজের উপরেও তেমন ঘিন্নাই দবিরের। এই ঘিন্না। সারাজীবন থাকব। এই ঘিন্না কোনওদিন যাইব না।
আজ বিয়ানে রসের কাজ সাইরা বাড়িতে আসছে দবির। নাওন ধোওন খাওন দাওন সাইরা বসছে তামাক নিয়া। রাবি মতলা আর বাদলা আইসা হাজির। বাদলা এখন কেমুন পুরুষপোলা পুরুষপোলা হইয়া উটছে। লুঙ্গির উপরে হাতাআলা পুরানা খয়েরি রঙের ছিড়াভিড়া সোয়েটার পরা। মুখে দাড়িমমাচের ভাব দেখা দিছে। ইকটু অল্প বয়েসেই ছেমড়াটা য্যান বেশি পাইকা গেছে। দবিরের সামনে তিনজন মানুষ দাঁড়াইল ঠিকই, মা বাপরে কথা শুরু করতে না দিয়া শুরু করল বাদলাই। গাছিমামা, বিরাট একখান আরজি লইয়া আপনের কাছে আইছি। আরজিডা আপনে হালাইতে পারবেন না। রাখতেই হইব। এর লেইগা তিনজনে মিল্লা আপনের কাছে আইছি।
দবির তামাক টানা রাইখা বলল, আগে বয় তরা। তারবাদে হুনি দিহি কী আরজি লইয়া তুই আইছস? নূরজাহানের মা, যোগলাডা উড়ানেই পাইতা দেও, অরা বহুক।
হামিদা হোগলা নিয়া আসল।
রাবি বলল, নূরজাহান কো?
হামিদা ছনছায় হোগলা পাইতা দিয়া বলল, ঘুমাইতাছে।
আমি ঘরে ঢুকুম। অরে ডাক দিমু?
দবির বলল, না থাউক। হারাদিন ম্যালা কামকাইজ করছে। অহন ইকটু ঘুমাউক।
আইচ্ছা আইচ্ছা।
রাবি মতলা হোগলায় বসল, বাদলা বসল না। সে একটু মাতবরি চালে উঠানে খাড়ইয়া রইল।
দবির বলল, ক রে বাদলা, তর আরজিডা ক। হুনি।
বাদলা রাবির দিকে তাকাল। মা, অহন তুমি কও।
মতলা বলল, আমি কই?
রাবি কঠিন চোখে স্বামীর দিকে তাকাইল। না তুমি না, আমি কই।
দবিরের দিকে তাকাল রাবি। গাছিদাদা, আমরা আইছিলাম আপনের দোকানডার বিষয়ে। কথা কইতে। দোকানডা তো পইড়া রইছে।
হামিদা দাঁড়ায়া আছে দুয়ারে। রাবি একবার তার দিকেও তাকাইল। ভাবিছাবেও হোনেন। নূরজাহানের জামাইর লগে বাদলা চা’র দোকানডা চালাইছে। হেয় চইলা যাওনের পরও কয়দিন চালাইছে। চা’র দোকান কেমতে চালাইতে হয় ও জানে। চাও মন্দ বানায় না। দোকানডা আপনেরা আমগো দিয়া দেন।
মতলা বলল, হ। দোকানডা আমরা চালাই। বাদলার খুব শক চা’র দোকানদার হইব।
