মাধব বহুত পুরানা কম্পাউন্ডার। তার কথা মতনই কাজ হইল। তিনদিনের পর আর জ্বর আসল না দবিরের। এই তিনদিন জ্বরের ফাঁকে ফাঁকে রব্বানের কথা সবই হামিদা আর নূরজাহানরে সে বলছে। কিছু বাদ দেয় নাই। শুইনা মা-মাইয়া দুইজনেই গেছে পাথর হইয়া। কেউ কোনও কথা বলতে পারে নাই। নূরজাহানের শুধু মনে হইছে, এমুন মধুমাখা মুখের মানুষটার অন্তরে আছিল এই! সে বিবাহিত, মাইয়ার বাপ, মাইয়া হইছে। দেইখা বউ মাইয়া হালাইয়া আরেক জাগায় আইসা বিয়া করল! একটা মাইয়ার জীবন ধ্বংস কইরা দিয়া চইলা গেল? একটা সংসার ধ্বংস কইরা দিয়া চইলা গেল? একবারও ভাবল না কী অন্যায় আছিল মাইয়াটার? কী অন্যায় আছিল মাইয়ার মা-বাপের? আর এইটা কেমুন পাগলামি, কেমুন মাথা খারাপের কাম রব্বানের? হেয় তো আসলে বদ্ধ পাগল! তছি পাগলনির মতন! আহা রে, এমুন এক পাগলের পাল্লায় পড়ল নূরজাহান! নূরজাহানের লগে পড়ল দবির আর হামিদা!
হাঁটতে হাঁটতে মরার মতন নিজের ঘরটায় গেল নূরজাহান। তালা খুইল্লা ঘরে ঢুকল। ঢোকার পর বুকটা ফাইটা গেল তার। চৌকিতে এখনও আগের মতন পাতা আছে বিছানা। নূরজাহানের বিয়াতে লেপ তোশক আর দুইখান বালিশ বানাইয়া উপহার দিছিল আবদুল। নিজের বালিশটা বড়ঘরে নিয়া গেছে নূরজাহান। মনে মনে রব্বানকে বলল, বিয়ার পর কোনওদিন যুদি তুমি আমারে বেবাক কথা খুইল্লা কইতা, তোমার বউ আছে, মাইয়া আছে, হুইনা আমি বহুত কষ্ট পাইতাম, কানতাম, দুই-চাইরদিন তোমার লগে কথা কইতাম না। আমার মা-বাপে তোমার লগে বহুত রাগারাগি করতো, বকাবাজি করতো তোমারে। তয় আমি কইলাম তাগো হাত থিকা তোমারে বাঁচাইতাম। তোমার শেফালি বউ যেমতে তার বাপ-ভাইগো হাত থিকা তোমারে বাঁচাইছে আমিও অমতে তোমারে বাঁচাইতাম। কইতাম, তুমি বচ্ছরে কহেকমাস মালখানগর গিয়া শেফালি বউর লগে থাকো, মাইয়ার লগে থাকো, আর কহেকমাস মেদিনমণ্ডল আইয়া আমার লগে থাকো। আমার কপাল খারাপ দেইখা একলা আমি তোমারে পাইলাম না। আরেকজনের লগে স্বামী ভাগ করতে হইতাছে আমার। সতিন তো কত মাইয়ারঐ থাকে! আমি তোমারে মাইন্না লইতাম। হেইডা না কইরা তুমি আমারে তালাক দিলা? এমুন নিষ্ঠুর কেমতে হইলা তুমি? আর বাসর রাইতে পোলাপান না। হওয়ান লইয়া তুমি যা কইছিলা আইজ আমি বুঝি ক্যান তুমি ওই কথা কইছো! আহা রে, এমুন চালাকি তুমি আমার লগে করলা?
অনেকক্ষণ কাঁদার পর রব্বানের বালিশসহ তোশকটা প্যাঁচাইয়া চকির দক্ষিণ দিককার বেড়ার লগে রাইখা দিল নূরজাহান। এখন চকিটা খা খা শূন্য। চকির কাঠ য্যান ফ্যালফ্যাল কইরা চাইয়া রইল নূরজাহানের দিকে। নূরজাহান মনে মনে বলল আমার জীবন আমি গুটাইয়া ফালাইলাম। যেই জীবন আমার আছিল সেই জীবন এখন আর আমার না।
.
শীতকালের শুরুর দিকে রাবি মতলা আর বাদলা একদিন দবির গাছির বাড়িতে আইসা হাজির।
দুপুরের ভাতপানি খাইয়া দবির তার স্বভাব মতন ছনছায় বইসা তামাক টানছে। হামিদা উদাস ভঙ্গিতে বইসা আছে দুয়ারে। নূরজাহান আঁচলে মুখ ঢাইকা বড়ঘরের চকিতে জানালার পাশে শুইয়া আছে। এই বাড়ির মানুষজন কেউ আর আগের মানুষ নাই। রব্বান চইলা যাওয়ার পর অনেকদিন কাইটা গেছে। তার কথা এখন আর সেইভাবে কেউ মনে করে না। মনের ভিতর রয়ে গেছে সবারই। তবে তারে নিয়া কেউ আর কোনও কথা বলে না। নূরজাহানই তার মা-বাবারে বলছে, তার কথা আর উঠাইয়ো না তোমরা। যে গেছে সে গেছে।
তারপর থেকে যে সংসার একদিন হামিদা সামলাইত সেই সংসার সামলায় নূরজাহান। দিন রাত যখন সংসারের যা কাজ, রান বাড়ন, কাপড়চোপড় থালবাসন ধোওন সব করে সে। হামিদারে হাত লাগাইতে দেয় না, দবিররে হাত লাগাইতে দেয় না। ইচ্ছা কইরাই সংসারের কামে ডুইবা থাইকা সব ভুইলা থাকে। ওই যে নতুন ঘরের বিছানা পাচাইয়া রাখছিল বেড়ার লগে, চকি শূন্য, ঠিক ওইভাবে নিজের জীবনটাও শূন্য কইরা ফালাইছে সে। রব্বানরে য্যান তার বিছানার মতন গুটাইয়া জীবনের, মনের একপাশে রাইখা দিছে। সেই বিছানা খুইলা সুখের কোনও দিন রাতের কথা আর ভাবে না। আর বাড়ি থেকে বাইর হওয়া একদম ছাইড়া দিছে সে। গ্রামের কেউ গাছির বাড়িতে না আসলে নূরজাহানের চেহারা দেখে না। তাও কেউ আসলে নূরজাহান মাথায় ঘোমটা দিয়া এমনভাবে চলাফিরা করে, আর নাইলে ঘরে ঢুইকা এমনভাবে বইসা থাকে তার মুখটা যেন কেউ দেখতে না পায়। এই মুখ মানুষরে দেখাইতে বড় লজ্জা তার।
মেয়ে পুরা সংসার সামলায় দেইখা হামিদা গেছে অলস হইয়া। বেশির ভাগ সময় উদাস হইয়া বড়ঘরের দুয়ারে বইসা থাকে। কোনও কোনও সময় শুইয়া থাকে। রসের দিনে গাছি আর আগের মতন গাছ ঝোড়ে না। নতুন কোনও বাড়িতে যায় না গাছের খোঁজে। পুরানা কয়েকটা বাড়ি আছে, কয়েকটা গাছ আছে ওই ঝোড়ে। রস বিক্রি কইরা আগের মতন টাকাপয়সা কামাই করার ইচ্ছাটাই মইরা গেছে। কী হইব আর এতকিছু কইরা। আগে যা করনের মাইয়ার লেইগা করছে। সেই মাইয়ার জীবন হইল এইরকম। এখন সংসার চললেই হইল। বাড়তি কোনও কিছুর দরকার নাই। রসের দিনে রস বেইচা যা দুই-চাইর টাকা পাওয়া যায়, বাড়তি রস যেইটুকু থাকে, নূরজাহান তোয়াক মিঠাই বানাইয়া রাখে, বছরের মিঠাই হইয়া যায়। ইরি জমিনটা আগে বর্গা দেওয়া ছিল, এখন দবির নিজে চোয়। নিজেই নালা কাইট্টা পানি আনে খেতে, ফাস ফোঁস (সার টার) দেয়। কীটনাশক কিন্না রাখে ঘরে। খেতে পোক থাকলে আলফুর কাছ থিকা এসপেরে মিশিন (স্প্রে মেশিন) আইন্না, মুখে গামছা বাইন্দা নিজেই ছিটায় ইরিখেতে। ধান উঠলে ধান সিদ্ধ করা, শুকালে, চেঁকিতে পাডাইয়া পাডাইয়া চাউল করন, বেবাক কাম একলা করে নূরজাহান। রান্নাচালার পাশে একখান চেঁকি বসাইয়া দিছে দবির। নূরজাহান একলা একলা সব করে। হামিদা হাত লাগাইতে চাইলে ঠান্ডা গলায় বলে, তোমার কিছু করন লাগবো না মা। আমি একলাঐ পারুম। আমার কাম আমারে করতে দেও।
