রব্বানদের বাড়ি থেকে নাইমা চক পাথালে হাঁটতে লাগল দবির। হাতে ধরা পলিথিনে প্যাচানো তালাকনামা। মেয়ের তালাকনামা হাতে এক দুঃখী পিতা কলিজাফাটা কষ্ট নিয়া হাঁটে। চোখের পানিতে তার গাল ভাসছে, গলা বুক ভাসছে। খানিকপর চকমাঠ দেশগ্রাম উথাল পাথাল কইরা আসে প্রবল তুফান, আকাশ ভাইঙা নামে টেটার নালের মতন বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি চারদিক থেকে গাঁথতে থাকে দবিরকে।
.
ফজরের আজানের পর পর বাড়ি ফিরল দবির।
একেবারেই ভাঙাচোরা বিপর্যস্ত অবস্থা। মালখানগর শিকদারবাড়ি থেকে বাইর হইয়া সেই যে চক পাথালে হাঁটা দিছিল, তারপর তুফান আর বৃষ্টি, হাতে পলিথিনে প্যাচানো মেয়ের তালাকনামা, বুক ফাইটা যাওয়া কষ্ট আর চোখের পানি নিয়া ইরিধানের চকের আতাইল (আলপথ) দিয়া, কোনও কোনও সময় হালট, বড় সড়ক, সারাটা রাইত হাঁটছে। দবির। ম্যাগ তুফানের পর চাঁদ উঠছিল আকাশে। ম্যাট ম্যাইটা জ্যোৎস্নায় পথ চিনছে আর না চিনছে, হাঁটছে। মালখানগর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে মাওয়া মেদিনীমণ্ডল। সেই মুখীই হাঁটছে দবির। পরনের শার্ট লুঙ্গি গামছা ভিজ্জা চুপাচুপা। কখন হাঁটার তালে আর শরীরের তাপে সেই শার্ট লুঙ্গি শরীরেই শুকাইছে উদিস পায় নাই দবির। মাজার গামছা খুইলা যে চিপড়াইব, মুখোন মুছব সেই কথা একবারও মনে হয় নাই তার। হাঁটছে, শুধু হাঁটছে। দবির। ফজরে আজানের পর যখন বাড়ির উঠানে আইসা খাড়ইছে, তখন উদিস পাইল। মাথাটা ফাইটা যাইতে চাইতাছে ব্যথায়, পায়ের গিড়া (গিড়) ভাইঙ্গা আসতে চাইতাছে। শরীরের ছাল চামড়া ফাটাইয়া বাইর হইতাছে তাপ। দবির বুইঝা গেল জ্বর আসতাছে।
এতকিছুর মধ্যেও হাতে ধরা পলিথিনে প্যাচানো নূরজাহানের তালাকনামা।
হামিদা নূরজাহান কেউ তখনও ওঠে নাই। ঘরের দুয়ার বন্ধ। চকেমাঠে একটু একটু কইরা ফুটছে সকালবেলার আলো। কোনওরকমে বড়ঘরের কপাটে দুই-তিনটা ধাক্কা দিল দবির। ভাঙাচোরা গলায় ডাকলো, নূরজাহানের মা, ও নূরজাহানের মা। দুয়ার খোলো!
লগে লগেই দুয়ার খুলল হামিদা। মনে হয় সারারাতই জাইগা ছিল স্বামীর জন্য। নূরজাহানও জাইগা ছিল বাপের জন্য। হামিদা দুয়ার খুলল ঠিকই, নূরজাহানও চকি থেকে নামছে। টলতে টলতে ঘরে ঢুকল দবির। পলিথিনে প্যাচানো মেয়ের তালাকনামা চকিতে ফালাইয়া বলল, জ্বরে শইল পুইড়া যাইতাছে। খাড়ইতে পারতাছি না। যেই ম্যাগবিষ্টি ওইমিহি…
নূরজাহান আর হামিদা দুইজনেই ধরল দবিররে, চকিতে বসাইল। বাপের গালে কপালে হাত দিয়া আথকাইয়া উঠল নূরজাহান। অনেক জ্বর তো!
দবির কোনওরকমে মাজায় বান্ধা গামছাটা খুলল। সেইটা তখনও ভিজা। গামছা খুইলা কাইত হইয়া চকিতে শুইয়া পড়ল।
হামিদা চিন্তিত গলায় বলল, এমন জ্বর আইলো ক্যা? মালখানগরে অন্যপদের কোনও ঘটনা ঘটছে নি? জামাইর চাচতো ভাইরা…।
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই দবির বলল, ওইসব কিছুই না। ঘটনা অন্য। আমি অহন। কথা কইতে পারতাছি না। হারারাইত ম্যাগবিষ্টিতে হাঁটছি, এর লেইগাঐ জ্বর আইছে। আমারে একটা কেঁতা দেও। শীতে শইল কাপতাছে। জ্বর মনে অয় আরও বাড়বো!
হামিদা মোটা একখান কাঁথা বাইর কইরা দবিরের গায়ে দিয়া দিল। দবির ঠকঠক কইরা কাঁপতাছে। পায়ে পাককেদা লাইগ্না রইছে। নূরজাহান দৌড়াইয়া গিয়া চাপকল চাবাইয়া। (চেপে) এক বালতি পানি নিয়া আসল। বাপের গামছা বালতির পানিতে ভিজাইয়া বাপের পা পুঁইচ্ছা পরিষ্কার করল। দবির ততক্ষণে জ্বরে বেহুঁশ। কোনও হুঁশই নাই তার।
দুপুরের দিকে জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকতে লাগল দবির। রব্বানের বউটা বহুত ভাল। আমারে পোলাও মোরগ খাওয়াইতে চাইছে। মাইয়াডা এই এতডু। দিছি শুয়োরের পোরে এক থাবড়। আমার মাথায় পানি দেও। আমার মাথার রগ ছিড়া যাইতাছে। মাথায় পানি দেও।
মাথায় পানি তখন চলছিল। দবির প্রলাপ শুরু করার আগ থেকেই তার মাথায় পানি দিচ্ছে নূরজাহান, পাশে চিন্তিত মুখে বইসা আছে হামিদা। ঘটনা কিছুই কেউ বুঝতে পারছে না। কী হইছে মালখানগরে? রব্বানের আবার বউ মাইয়া আইলো কই থিকা? দবিরের প্রলাপ শুইনা হামিদা তাকায় নূরজাহানের দিকে, নূরজাহান তাকায় হামিদার দিকে।
রব্বান কি তাইলে মালখানগরেই আছে? নাকি বেবাকঐ দবিরের জ্বরের প্রলাপ! পেটে অষুদ বিষুদ কিছু পড়ন দরকার। জ্বর না কমলে কিছুই জানন যাইব না দবিরের কাছ থিকা। সকাল থিকা কিছু মুখেও দেয় নাই দবির। জ্বর খালি বাড়ছে, খালি বাড়ছে।
হামিদা চিন্তিত গলায় বলল, জ্বরের অষইদ লাগবো! কেঐরে যুদি মাওয়ার বাজারের বাদশা মিয়া ডাক্তরের কাছে পাড়ান যাইতো!
নূরজাহান বলল, কারে পাডাইবা?
হেইডাঐ চিন্তা করতাছি।
তুমি নিজে যাইবা?
আমি যামু?
তয় কী করবা? বাদলারে ডাইক্কা আনবা? অরে পাডাইবা?
হ হেইডা করতে পারি।
তয় তুমি মেন্দাবাড়ি যাও। বাদলারে ডাইক্কা লইয়াহো। আমি বাবার কাছে আছি। একবারে টেকা লইয়া যাও। বাদলা য্যান ওইদিক দিয়াঐ ডাক্তারের কাছে যায় গা। একবারেই য্যান অষইদ লইয়াহে।
এই টাইমে ডাক্তারসাবে থাকবো না। থাকবো কমপাউন্ডার মাধব।
জ্বরের অষইদ মাধব কাকায়ও দিতে পারবো।
আইচ্ছা তয় আমি যাই।
পঞ্চাশ টাকার একটা নোট আঁচলে বাইন্ধা বাড়ি থেকে বাইর হইল হামিদা। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে অমুদ নিয়া হাজির বাদলা। অষুদ মানে দুইপাতা ট্যাবলেট। একলগে দুইটা কইরা দিনে তিনবার খাওন লাগব। তয় খাওন লাগব ভরা পেটে। খালি পেটে খাইলে বায়ু হইব পেটে। খাওনের আধাঘণ্টার মধ্যে ঘাম দিয়া জ্বর ছাড়ব। আর খাইতে পারব সবই। কোনও অসুবিধা নাই। তিনদিনের মধ্যে জ্বর ছাইড়া যাইব।
