এই সময় দুইটা বড় কাপে কইরা চা নিয়া আসল শেফালি। পিরিচ দিয়া কাপ ঢাকা যাতে চা ঠান্ডা হইয়া না যায়। দস্তরখানের একপাশে চায়ের কাপ রাইখা বসল।
রব্বান বলল, মাইয়া কো? মাইয়া কার কাছে রাইখা আইলা?
বারেকের মা’র কুলে।
চোখের পানি নিয়াই দুই-তিন লোকমা সেঐ মুড়ি খাইল দবির। তারপর রেকাবি সরাইয়া রাখল। আর পারি না। আমার গলা গিয়া খাওন নামে না।
রব্বান বলল, নামনের কথাও না। কী করুম কাকা কন? আমি আল্লার কসম খাইয়া কইতাছি, আমি ইচ্ছা কইরা এমুন কাম করি নাই। আপনেগো মনে দুঃখ দেই নাই, নূরজাহানের জীবনডা ছেঁড়াভেড়া করি নাই। আমার মাথাডার ঠিক আছিল না কাকা। কেমতে যে কী অইয়া গেল কিছুই বুজতে পারলাম না। আপনে আমারে মাপ কইরা দিয়েন কাকা। কাকিরে কইয়েন মাপ কইরা দিতে। নূরজাহানরে কইয়েন।
শেফালি বলল, কাকা, আমিও মনে করেন আপনের আরেক মাইয়া। আরেক নূরজাহান। আপনের এক মাইয়ার লেইগা আরেক মাইয়ার সংসার ভাঙছে। আমার স্বামীর অন্নাইয়ের লেইগা আমিও আপনের কাছে মাপ চাই কাকা। আপনের পায়ে ধরি, আমার স্বামীরে আপনে মাপ কইরা দিয়েন।
দুইহাত বাড়ায়া আসাম (আসনপিড়ি) কইরা বইসা থাকা দবিরের পা দুইটা প্যাচাইয়া ধরল শেফালি। দোষ কাকা তারও না, দোষ কাকা আমার কপালের। মাইয়া না অইয়া আমার যুদি একটা পোলা হইত তয় হেয় বাড়ি ছাইড়া যাইতো না। এই ঘটনাও ঘটতো না। আপনে আপনের এই মাইয়াডারে মাপ করেন কাকা।
শেফালি ঝরঝর কইরা কাঁইদা ফেলল।
রব্বানের চোখেও তখন পানি। এখন তার মুখে আর দাড়িমোচ নাই, মাথায় বাবরি চুল নাই। পরিষ্কার সুখী মুখ। পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর নীল লুঙ্গি। দুই হাতে চোখ মুছল সে।
দবির কাঁদতে কাঁদতে বলল, এই অবস্থায় কারে আমি কী কমু? কারে বকুম, কারে মারুম? নিজের কপালরে পিছাদা পিডাইতে ইচ্ছা করতাছে। কপাল, কপাল রে! ক্যান এমুন কপাল আমার হইল? ক্যান এমুন কপাল হইল আমার মাইয়ার!
অন্যদিকে তাকায়া চোখের পানিতে ভাসতে লাগল দবির।
তিনজন মানুষ চুপচাপ কিছুক্ষণ কাঁদল। রব্বান তারপর চোখ মুইছা বলল, কাকা, আমি আর আপনের এই মাইয়া শেফালি আপনের কাছে মাপ চাইলাম, আপনের পায়ে ধরলাম। এরবাদেও আমি আমার একদিকে চাচা একদিকে শ্বশুর আর তিন সমন্দি তাগো বেবাকতেরে দিয়া আপনের পায়ে ধরাইতে চাই। শিকদার বংশের পোলা হইয়া আমি যেই কামডা করছি, এর থিকা বড় অন্নাই কাকা হইতে পারে না। আমি আপনের মাইয়ার জীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলছি, আপনেগো হালাইছি বিরাট বিপাকে, এই বিপাক থিকা আপনেরে উদ্ধারের কোনও পথ আমগো নাই। আমরা আপনের কাছে খালি মাপ চাই। আল্লারস্তে আমারে মাপ কইরা দেন!
দবির ভিতরে ভিতরে নিজেরে সামাল দিছে। নিয়াস ছাইড়া বলল, না, আর কেঐরে ডাকনের কাম নাই। আমি অহন চইলা যামু।
দবিরের কথা শুইনা শেফালি হায় হায় কইরা উঠল। না না কাকা, হেইডা আপনে পারবেন না। আমি আপনের লেইগা মোরগ জব করছি, পোলাও রানতাছি। আপনে রাইতে পোলাও মোরগ খাইবেন। এই মাইয়ার বাইত্তে থাকবেন, বিয়ানে উইট্টা চা নাস্তা খাইয়া মেলা দিবেন।
রব্বান বলল, বিয়াল অইয়া গেছে। মালখানগর থিকা মেদিনমণ্ডল বিরাট দূর। অহন মেলা দিলে রাইত দোফর অইয়া যাইবো যাইতে। আকাশে ম্যাগও দেখতাছি। যেই গরম ছাড়ছে, তুফান আইবো। রাস্তায় বিপদে পড়বেন আপনে। আপনে তো আম পছন্দ করেন। আমগো বাড়ির আম বহুত মিঠা। রাইত্রে পোলাও মোরগের পর আম খাইবেন আপনে। দেইখেন নে কী মিঠা আম।
দবির বলল, না। আমি যামু গা। আমি থাকতে পারুম না। বাইত্তে বেবাকতে চিন্তায় আছে। তুমি যেইভাবে যা কইছিলা…
হ হ ওই কথা মনে থাকলে তো চিন্তার কথাঐ। তয় কাকা বেইল থাকতে থাকতে আপনে মেলা দেন। শেফালি, আমগো আলমাইত্তে (আলমারিতে) দেহো পলিথিনের কাগজ দিয়া আর সুতা দিয়া কয়হান কাগজ বান্দা আছে। ওই কাগজটি লইয়াহো।
আইচ্ছা।
শেফালি চইলা যাওয়ার পর রব্বান বলল, কাম আমি বেবাকঐ সাইরা রাকছি কাকা। আপনেগো বাড়ি থিকা পলাইয়া আইলাম এই বাইত্তে। তহনও জানি না কপালে কী আছে। বউ আমারে বাইত্তে উটতে দিবো কি না, সমন্দিরা মাইর ধইর দিবো কিনা। হৌর কী কইবো? হরি নাই। মইরা গেছে বহুত আগে। যুদি তারা আমারে বাইত্তে উটতে না দিতো, মাইয়ার মুখ দেখতে না দিতো তয় আমি আবার আপনেগো বাইত্তে ফিরত যাইতাম। শেফালি যহন বেবাক হুইন্না মাপ কইরা দিল, মাইয়াডারে দিল আমার কুলে তহন আমি আর রব্বান রইলাম না কাকা, আমি আপনে অইয়া গেলাম, দবির গাছি অইয়া গেলাম। মাইয়ার বাপ। তার কয়দিন বাদে দিঘলি গিয়া তালাকনামাডা তইয়ার তৈরি করছি। যত্ন কইরা বেবাক কাগজপত্র পলিথিনে বাইন্ধা রাকছি। আরও কয়ডা দিন দেকতাম। যুদি আপনেরা কেউ না আইতেন তয় পোস্টাপিসে গিয়া আপনেগো বাড়ির ঠিকানায় পাডাইয়া দিতাম।
পলিথিনে প্যাঁচানো তালাকনামা আইনা রব্বানের হাতে দিল শেফালি। রব্বান দিল দবিরের হাতে। লন কাকা। তালাকনামা ঠিক আছে। আপনে অহন অন্য জাগায় নূরজাহানরে বিয়া দিতে পারবেন। কোনও ঝামেলা নাই।
পলকের জন্য যেন মাথাটা খারাপ হইয়া গেল দবিরের। ঠাস কইরা রব্বানের গালে একটা থাবড় মারল সে। তারপর পলিথিনে প্যাচানো তালাকনামা হাতে চকি থেকে নামল। হনহন কইরা হাইটা রব্বানদের বাড়ি থেকে বাইর হইল। তখনও সন্ধ্যা হয় নাই। তবে চাইর দিক আন্ধার হইয়া আসছে। আকাশে কালো মেঘ। বাতাস নাই। সবকিছু কেমন থম ধইরা আছে। ঝড় বৃষ্টির লক্ষণ। যখন তখন চারদিক থেকে আসবে দমকা হাওয়া, আকাশ। ভাইঙা নামব বৃষ্টি।
