আরে আমি না করলেই শেফালি হোনববানি? অরে আপনে চিনেন না। বহুত ভাল মাইয়া। নাইলে ফিরত আইসা আমি যখন পুরা ঘটনা বললাম, বিয়াশাদি করছিলাম, একবছর এক মাস নতুন বউর লগে ঘরজামাই থাকছি, ভাল মাইয়া না হইলে এই হগল কেঐ মাইন্না। লয়? মুইড়া পিছাদা পিডাইয়া আমারে বাইত থিকা বাইর কইরা দিতো না? আমার চাচায় আর সমন্দিরা বহুত চেতা চেতছিল। আমারে বাইত্তে উটতেঐ দিত না। তাগো সামলাইলো। শেফালি। কইলো আমার স্বামীর ভুল যুদি আমি মাইন্না লইতে পারি তয় তোমগো অসুবিদা। কী? হেয় যা করছে, কইরা হালাইছে, আমি তারে মাপ কইরা দিছি। সে আমার মাইয়ার বাপ। আমি তার লগেঐ সংসার করুম। মাইয়া যুদি ওই কথা কয় তয় বাপে কী কইবো, ভাইরা কী কইবো? লন কাকা, বাংলাঘরে লন। সে মুড়ি খান। রাগ কইরেন না। আমি তো আপনের পোলার মতন। পোলায় কোনও ভুল কইরা হালাইলে তারে কোনও বাপে মাপ না কইরা পারে!
দবিরের হাত ধরল রব্বান। লন কাকা, লন।
দবির না, দবিরের লাশ যেন উইঠা দাঁড়াইল। বাংলাঘরের দিকে আসতে আসতে নিজের অজান্তেই যেন শিকদার বাড়ির রব্বানের অংশটা দেখল দবির। সুন্দর ছিমছাম লেপাপোছা একখান উঠান। উঠানের পুবপাশে বড়ঘর, পশ্চিম পাশে বাংলাঘর। উত্তর দিকে অনেকখানি কইরা ফাঁকা জায়গা তারপর বড় বড় ঘর। বোঝা যায় শেফালির তিন ভাইয়ের ঘর দুয়ার ওইদিকে। শেফালির বড়ঘরের পাশেই রান্নাঘর, রান্নাঘরের পাশে আমগাছতলায় চাপকল। স্বচ্ছল গিরস্তবাড়ি। বড় বাড়ি বলে লোকজনের সাড়াশব্দ পাওয়া যায় কম।
বাংলাঘরে ঢুইকা দবির দেখে চৌকিতে দস্তরখান বিছানো। তার উপর চিনামাটির গামলায় দুধ সেমাই, আরেক গামলায় মুড়ি আর দুইখান রেকাবি। পানির জগখান কাঁচের, দুইখান পরিষ্কার কাঁচের গেলাস।
রব্বান বলল, হাতমুখ ধুইবেন নি কাকা?
দবির মরার মতন বলল, আমার কিছুই করতে ইচ্ছা করছে না। আমার মনে হইতাছে আমি বাঁইচা নাই, আমি মইরা গেছি।
রব্বান তার হাত ধরল। এত ভাইঙ্গা পইড়েন না কাকা। মাইনষের জীবনে কতকিছু ঘটে। ঘটনা তো খালি আপনের জীবনে, কাকি আর নূরজাহানের জীবনে ঘটে নাই, আমার জীবনেও তো ঘটছে। সবঐ আমগো কপালের দোষ। আর আমি তো ফিরা আইলাম কাকা আপনের লেইগা।
দবির অবাক। আমার লেইগা?
হ।
কেমুন?
নূরজাহান বিয়ার লাইক (লায়েক) মাইয়া। তাও অতবড় মাইডারে আপনে নাননা বাচ্চার মতন কুলে বহাইয়া আদর করতেন। বিয়ার দিন দেখলাম, তার পরও দুয়েকদিন দেখছি যে মাইয়ার লেইগা বাপের কী টান। মাইয়ারও কী টান বাপের লেইগা। যহনঐ আপনে নূরজাহানরে কুলে বহাইয়া আদর করতেন, আমি আনমনা হইয়া যাইতাম। আমার খালি মনে পড়ত আমার মাইয়াডার কথা। বকুলের কথা। অর তো কোনও দোষ নাই? অরে তো জন্ম দিছি আমি? মাইয়াডার অপরাধ কী? অরে হালাইয়া আমি ক্যান চইলা আইলাম? কোন ভূতে আমারে ধরল যে আমি আরেকখান বিয়া করলাম, আরেকখান মাইয়ার জীবন নষ্ট করলাম, নিজের জীবনও নষ্ট করলাম! এই দিকে নষ্ট করলাম শেফালির জীবন, আমার ছোট্ট মাইয়ার জীবন। আমার মাথাডা আবার খারাপ হইয়া গেল কাকা। আমি আপনের বাড়ি থিকা পলাইলাম। ফিরত আইসা আমি বেবাক স্বীকার করলাম শেফালির কাছে, আমার মাইয়াডারে ওই পয়লা কুলে লইলাম। কুলে লইয়া কইলজাড়া ফাইট্টা গেল আমার। হায় হায় নিজের মাইয়া হালাইয়া এমতে পলাইয়া গেছিলাম গা আমি? এইডা আমি কী করছি? শেফালি বহুত কানলো। আমিও বহুত কানলাম। তারবাদে শেফালি আমারে মাপ কইরা দিলো। কাকা, পুরুষ পোলাগো তুলনায় মানুষ হিসাবে মাইয়ারা অনেক ভাল। শেফালি যুদি আমারে মাপ না করতো তয় অর ভাইরা আমারে পিডাইয়া মাইরা হালাইতো। আপনে আইয়া আমারে দেখতেন কবরে।
একটা পিতলের চিলমচি দেওয়া আছে একপাশে। দবিরের ডাইন হাত টেনে রব্বান জগের পানি দিয়া তার হাত ধোয়াইয়া দিল। হাত ধোন কাকা, হাত ধোন। মনে কষ্ট নিয়েন না। কী করুম কন? আমরা কহেকজন মানুষ কপালের ফ্যারে পইড়া গেছিলাম। তয় আপনের কাছ থিকা আমি একহান জিনিস হিগছি কাকা, মাইয়ারে আদর করতে হয়। কেমতে? আপনের কইলজা যেমুন নূরজাহান, অহন আমার কইলজা হইল আমার বকুল। হাত ধুইয়া এই লন গামছা, হাত পুঁইচ্ছা (মুছে) সেঐ মুড়ি খান। মনে করেন আমি আপনের পোলা। পোলায় একহান বিরাট অন্নাই কইরা হালাইছে। অহন কি তারে আপনে মাইরা হালাইবেন? আর মারতে চাইলে এই যে আমার সেনটেল (স্যান্ডেল), সেনটেল দিয়া আমারে বাইড়ান। আমার গাল মুখ ফাডাইয়া হালান মাইরা।
দবিরের ভিতরে তখন রাগ ক্রোধ বইলা কিছু নাই। অসহায় এক কষ্টে বুক ঠেইলা উঠতে চাইছে গভীর কষ্টের কান্না। চক্ষু দুইটা ফাইটা যাইতে চাইতাছে। এই অবস্থায় কেমন কইরা সেঐ মুড়ি খাইব সে? এইটা কি সম্ভব?
রব্বান তার রেকাবিতে সেমাই তুইলা দিছে। মুড়ি দিছে। রেকাবি তার দিকে আগায়া দিয়া বলল, খান কাকা খান। ইট্ট হইলেও মুকে দেন। আমি বুজতাছি এই অবস্থায় মাইনষে কিছু খাইতে পারে না। তাও ইট্টু খান। নাইলে আমার থিকা শেফালি বেশি মনে কষ্ট পাইবো। সেও তো আপনের নূরজাহানের লাহান। নূরজাহানের মনে আপনে কি কষ্ট দিতে পারেন, কন কাকা?
দবির অন্যদিকে মুখ ফিরায়া গামছায় চোখ মুছল। তারপর দুধ সেমাইর লগে মুড়ি মিশাইয়া একটুখানি মুখে দিল।
