শেষ তরি একদিন বিয়াইনা রাইতে মালখানগর মেলা দিল দবির।
.
মালখানগর বড় মাঠটার উত্তর দিকে রাস্তার ধারে কয়েকটা চায়ের দোকান। জষ্টিমাসের দুপুরবেলা সেই মাঠের ধারে আসল দবির। দুপুর হইয়া গেছে। খিদা লাগছে ভালই। ভাত খাইতে পারলে ভাল। না হইলে কোনও মিষ্টির দোকানে বইসা চাপাটি রুটি আর নাইলে পরোটা মিষ্টি, নাইলে দই মিষ্টি খাইয়া পেটটা এখন ভরাইতে হইব। তারপর এককাপ গরমা গরম চা খাইয়া, টাইট হইয়া শিকদার বাড়ির খোঁজখবর লইব। বাড়িঘর আর লোকজনের খবরাখবর লওনের জন্য দেশগ্রামের চায়ের দোকানগুলি হইতাছে আসল জায়গা।
দবির একটা চায়ের দোকানের সামনে আইসা দাঁড়াইল। দুপুরবেলা দোকানটায় ভাত তরকারিও বিক্রি হয়। কয়েকজন দীন দরিদ্র মানুষ নলা মাছের লাল টকটকা ঝোল দিয়া। ভাত খাইতাছিল। দবির সেই দোকানে ঢুকল। নলা মাছের তরকারি দিয়া পেট ভইরা ভাত খাইল তারপর চায়ের অর্ডার দিয়া জেব থেকে কেঁচি সিগ্রেটের প্যাকেট বাইর কইরা একটা সিগ্রেট ধরাইল। ক্যাশে বসা দোকানের মালিক দবিরের বয়সিই হবে। মুখে কাঁচাপাকা দাড়িমোচ, মাথায় টুপি। পরনে সাদা পাঞ্জাবি। মুসল্লি টাইপের মানুষ। দবিরকে খুবই খেয়াল কইরা দেখছিল লোকটা। ভাত খাওয়া শেষ কইরা দবির সিগ্রেট ধরাইছে দেইখা জিজ্ঞাসা করল, মিয়াভাই, কোন গেরামের মানুষ আপনে? এইমিহি আগে কোনওদিন দেহি নাই তো, এর লেইগা জিগাইলাম। কিছু মনে কইরেন না।
দবির সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, না কী মনে করুম? আপনের আন্তাজ ঠিকঐ আছে মিয়াভাই। আমি এইদিককার মানুষ না।
তয় কোন গেরাম আপনেগো?
বহুত দূরের গেরাম মিয়াভাই। মাওয়ার পাশে। গেরামের নাম মেদিনমণ্ডল।
ও। তয় মালখানগর আইছেন কোন বাইত্তে? নাকি এহেন থিকা অন্যকোনও মিহি যাইবেন?
না গো দাদা, এই গেরামেঐ আইছি।
কোন বাইত্তে যাইবেন?
শিকদারবাড়ি। তয় শিকদার বাড়িডা চিনি না। কোন মিহি কইতে পারেন? হুনছিলাম বোসের বাড়ির উত্তর দিককার দিঘির পারে।
ঠিকঐ হোনছেন। বোসের বাড়ির উত্তর দিককার দিঘির পুব পাশেই শিকদারবাড়ি। শিকদারবাড়ির কার কাছে যাইবেন? কোন শিকদারের কাছে যাইবেন?
রব্বান নামটা প্রায় মুখে আইসা পড়ছিল দবিরের। বুদ্ধি কইরা চাইপা রাখল। বলল, রব্বানের মৃত বাবার নাম। আশ্রাবউল্লাহ শিকদার সাবের কাছে যামু।
ও আইচ্ছা।
দবির থতমত খাইল। মরা মানুষটার নাম শুইনা ভাত চায়ের দোকানদার ‘ও আইচ্ছা’ বলল ক্যান? ঘটনা কী? দবির বলবে নাকি, মিয়াভাই, আশ্রাবউলাহ শিকদার মইরা গেছে। তার কাছে যামু শুইনা আপনে দিহি কইলেন না, কেমতে যাইবেন? হেয় তো মইরা গেছে।
এইসব কথা বলতে গেলেই একটা পেচিঘুচি (প্যাঁচঘোচ) লাইগ্না যাইব। কোন কথায় কোন কথা বাইর হইব, কোন ভেজাল লাইয়া যাইব ভাইবা দবির আর কথাই বলল না। ভাত আর চায়ের দাম দিয়া দোকান থেকে বাইর হইল। সিগ্রেট টানতে টানতে বোসের বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। গোড়ালির বেশ খানিকটা উপরে তুইলা পরছে লুঙ্গি, হাফহাতা ঝুলপকেটঅলা নীল শার্টের ওপর মাজায় বান্দা গামছা। খালি পা ধুলায় মাখামাখি হইয়া আছে।
শিকদারবাড়ির সামনে আইসা মরা মানুষ জেতা হইয়া ফিরত আসতে দেখলে মানুষ যেমন চমকায় দবির ঠিক তেমন কইরা চমকাইল। বাইর বাড়ির সামনে চৌদ্দ-পোনরো মাসের একটা বাচ্চা মাইয়া কোলে লইয়া পায়চারি করতাছে রব্বান। এত আদর করতাছে মাইয়াটারে, একবার চুমা দেয়, একবার মাথায় পিঠে হাত বুলায়, একবার এক কোল থেকে আরেক কোলে আনে। আদরে আহ্লাদে মাইয়া খলখল কইরা হাসে, তার লগে লগে হাসে রব্বান।
বাড়ির নামায় দাঁড়ায়া খানিকক্ষণ এই দৃশ্য দেখল দবির। প্রথম ধাক্কাটা সামলাইল। তারপর ধীর শান্ত পায়ে রব্বানের সামনে আইসা খাড়াইল!
দবিরকে দেখে যতটা অবাক হওয়ার কথা রব্বানের ততটা সে হইল না। হাসিমুখে বলল, আহেন কাকা, আহেন। আমি মনে করছিলাম আরও আগেঐ আইবেন। বহুত দেরি কইরা আইলেন। আছেন কেমুন? কাকি ভাল আছে? আর নূরজাহান? নূরজাহান কেমুন আছে? আমি তো আপনেগো কেঐরে কিছু না কইয়া পলাইয়া আইয়া পড়লাম। তয় নিজের জিনিসপত্র ছাড়া কইলাম কিছু আনি নাই। খালি আমার ব্যাগটা আনছি আর পুরানা কাপড় চোপড়ডি। টেকাপয়সাও আনি নাই।
ভিতর বাড়ির দিকে তাকায়া শেফালি শেফালি বইলা দুইটা ডাক দিল রব্বান। শেফালি নামের মেয়েটা প্রায় লগে লগে দৌড়াইয়া আসল। নূরজাহানের চেয়ে বয়সে পাঁচ-সাত বছরের বড় হবে। পরনে গিরস্তবাড়ির বউঝিদের সস্তা শাড়ি। রোগা পাতলা মাইয়া। গায়ের রং শ্যামলা। তবে হাসিখুশি আছে। রব্বানের ডাকে দৌড়াইয়া আইসা বলল, কী হইল, ডাক পারো ক্যা?
এই দেহো কেডা আইছে? এইডা হইল নূরজাহানের বাপ। গাছিকাকা। সেলাম করো, সেলাম করো। বহুত ভাল মানুষ। সেও ভাল, কাকিও ভাল। বহুত আদর করছে আমারে। আর নূরজাহানের কথা তো তোমারে কইছি। ভাল মাইনষের মাইয়া তো, সেও মানুষ ভাল। আমার খাতির যত্নের কোনও আকাল রাখে নাই।
শেফালি পায়ে হাত দিয়া খুবই বিনয়ী ভঙ্গিতে সালাম করল দবিরকে। ঘটনার কিছুই বুঝতে পারছে না দবির। শেফালি কে, রব্বানের কোলে বাচ্চাটিই বা কার! সে ফ্যালফ্যাল কইরা একবার রব্বানরে দেখে, বাচ্চাটা আর শেফালিরে দেখে। বাচ্চার চেহারা শেফালির মতন।
