খোঁজখবর লইলা?
মালখানগরে কী খোঁজখবর লমু কও? ওই গেরামে তো অর যাওনের কথা না। জানের ডর আছে না?
হেইডা তো ও কইছিল!
ঘটকায়ও তো খোঁজখবর লইয়া ওই এককথাই কইছিল।
অহন ক্যান জানি ঘটকার কথা আমার বিশ্বাস অয় না। মনে অয় তার কথায় ভেজাল আছে। আমার কয়দিন ধইরা মনে অয় রব্বান আর ঘটকায় দুইজনেই আমগো কাছে বেবাক হাছাকথা কয় নাই।
দবির আবার তামাক টানতে লাগল। অনেক্ষণ টাইনা নাকমুখ দিয়া ধুমা ছাড়তে ছাড়তে বলল, মালখানগর গিয়া আবার উলটা কোন বিপদে পড়ি?
কীয়ের বিপদ?
শিকদাররা যুদি বোজে যে আমি রব্বানের হৌর, তারে বিচড়াইতে গেছি…।
দবিরের কথা শেষ হওয়ার আগেই হামিদা বলল, ভোদাইয়ের (বোকা) লাহান কথা কইয়ো না। রব্বানের হৌর পরিচয় দিয়া তুমি যাইবা ক্যা? তুমি মালখানগর গিয়া মাইনষের কাছ থিকা রব্বানের খোঁজখবর লইবা। জাননের চেষ্টা করবা সে আর ঘটকায় যা যা কইছে বেবাক ঠিক আছে কি না?
ঠিক থাকলে লাবটা কী হইবো, ঠিক না থাকলেই বা লাবটা কী হইবো? রব্বানরে যুদি ফিরাই না পাই তয় লাবটা কী?
কথা ঠিক। তয় আমার ক্যান জানি মনে অয় তুমি নিজে মালখানগর গেলে কোনও না কোনও খবর বাইর করতে পারবা। রব্বানের কি স্বভাবই এই রকমনি যে কিছুদিন পর পর কোনও জাগা ছাইড়া পালায়? মালখানগর ছাইড়া আগেও কোনওহানে পলাইছিলোনি? আগেও কোনহানে গিয়া বিয়াশাদি কইরা তারবাদে এমুন নিরুদ্দিশ অইয়া গেছেনি?
মা-বাবার কথা সবই শুনছিল নূরজাহান। শেষ দিককার কথা শুইনা তার মনটা হাহাকার কইরা উঠল। না না, হেয় মনে অয় ওইপদের মানুষ না। নরম মায়াভরা মনের মানুষ। তয় মনের মইদ্যে ইকটু পাগলামি ভাব আছে। ওই যে জ্যোৎস্না রাইতে করল, তারবাদে জ্যাটিঙ্গা পাখির কথা কইলো, ওইডা হইল পাগলামি। হেদিন মনে অয় তার উপরে কিছুতে আছর করছিল। বদ হাওয়া লাগছিল গায়।
তারপরই আরেকখান কথা মনে হইল নূরজাহানের। আক্কাস ফকিররে দিয়া একবার জিন ডাক দেওয়াইয়া দেহন যায় না জিনেরা কী কয়? আমিন মুনশি সাহেবও কইতে পারে অনেক কিছু। মাওয়ার হিন্দু পাড়ায় এক গণক ঠাকুর আছে। হেয় গইনা কইয়া দিতে পারে বেবাক কথা। সীতারামপুরের মোসলেম কারিগরও কইতে পারে। আমার মা-বাপে এই হগল চিন্তা করতাছে না ক্যা? তাগো কাছে যায় না ক্যা? জিন ডাক দেয় না ক্যা?
নূরজাহান ঘর থেকে বাইর হইল। মা-বাপের সামনে আইসা খাড়ইল। বাবা, একবার জিন ডাক দিয়া দেহো। আমিন মুনশি সাবরে ধরো। গণক ঠাকুরের কাছে যাও। মোসলেম
কারিগরের কাছে যাও। দেহো তারা কে কী কয়?
হামিদা আর দবির দুইজন একলগে চাইল নূরজাহানের দিকে। এতদিনে এই প্রথম নূরজাহান নিজ থেকে কিছু কইল এই বিষয়ে। শুইনা দবির হামিদা দুইজনেঐ মাইয়ারে বুঝ দিল। দবির বলল, আইচ্ছা মা আইচ্ছা, আমি ববস্তা করতাছি। দুই-একদিনের মদ্যেই জিন ডাক দেওনের বন্দবস্ত করতাছি। কাইলঐ আমিন মুনশি সাবের কাছে যামু, গণক ঠাকুর আর মোসলেম কারিগর তিনজনরেই কাইল ধরতাছি আমি।
হামিদা বলল, তয় কাইল রাইত্রেঐ জিন ডাক দেওনের বন্দবস্ত করো।
দেহি পারলে কাইলঐ করুম।
তারপরের দুই-তিনদিনের মধ্যে সবই করা হইল। গণক ঠাকুর বালি মাটিতে কাঠি দিয়া ঘর কইরা কী কী অঙ্ক করল। কইরা বলল, রব্বান বাইচা আছে। ভাল আছে। ফিরত আসা যাওয়ার মইধ্যে একটু ঝামেলা দেখা যাইতাছে। মোসলেম কারিগর এক রাইত ধ্যানে বসল। নিজের বাড়িতে, পরদিন বলল, আছে ভাল। তয় দুইদিন আগে পরে ফিরত রব্বান আসবো। আক্কাসের জিনরা দুইপদের শিকড় বাকড় দিয়া গেছে। কালো গোরুর দুধের লগে রাত্রে শোয়ার। আগে এগারো দিন ভিজাইয়া ভিজাইয়া খাইতে হইব। খাইলে কন্যার মনের আশা পূরণ হইব। জামাই ফিরত আসতে বাইধ্য। আমিন মুনশি সাহেব একটা তাবিজ দিলেন কাইতান দিয়া ডাইনহাতে বাইন্ধা রাখার জন্য। টাকা পয়সা এইসব কাজে ভালই খরচা হইল দবিরের।
যে যা বলছে সেইভাবেই সব করতে লাগল নূরজাহান। কালো গোরুর দুধ দিয়া জিনদের। দেওয়া শিকড় বাকড় ভিজাইয়া ভিজাইয়া খাইল এগারো দিন, মুইশি সাবের তাবিজ বানল ডাইন হাতে।
দিন যায়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। রব্বানের কোনও হদিসই নাই।
জষ্ঠিমাসের শেষদিকে ত্যাক্ত বিরক্ত হইয়া হামিদা আবার দবিরকে ধরল। বেবাক চেষ্টাই তো করা হইল, কাম তো হইল না কিছুই। বাদ দেও এই হগল। তুমি আমার কথা হোনো। মালখানগর যাও। আমি আবারও কইতাছি ওই গেরামে গেলে কিছু খবর তুমি পাইবা। জামাইরেও পাইয়া যাইতে পারো।
ততদিনে নূরজাহান শুকাইয়া কাঠ হইয়া গেছে। কথাবার্তা তেমন বলেই না। বাড়ি থেকে বাইর হওয়া ছাইড়াই দিছে। এই মুখ কেরে দেখাইতে ইচ্ছা করে না। দেশগেরামে বইটা গেছে জামাই নূরজাহানরে হালাইয়া থুইয়া পলাইছে। মান্নান মাওলানার মতন পরহেজগার লোকের মুখে ছ্যাপ দিছিল, এইডা বিরাট গুনার কাম। আল্লায় হেই গুনার শাস্তি অরে দিতাছে। তারপরও গুনা মাপ হইয়া যাইত যুদি মান্নান মাওলানার পোয়রাসতাবে রাজি হইয়া যাইত। মান্নান মাওলানা বিয়া করতে চাইছিল নূরজাহানরে। তার লগে বিয়া হইলে গুনা মাপ তো হইতোঐ, সুখেও থাকত। টেকাপয়সা ঘরবাড়ি গয়নাগাটি, কোনও কিছুর অভাব থাকত না।
এইসব কথা দবির-হামিদার কানে তো আসেই, নূরজাহানের কানেও আসে। ভিতরে ভিতরে শরমে য্যান মইরা আছে নূরজাহান। দেশগেরামে যেই মাইয়ারে জামাইয়ে হালাইয়া পলায় হেই মাইয়ার বদলামের সীমা থাকে না। নূরজাহান এখন মেদিনীমণ্ডল গ্রামের সবচাইতে বদলামি মাইয়া। এই শরমের মুখ নূরজাহান কারে দেখাইব?
