বিয়ার পর রব্বানরে নিয়া হাজামবাড়ি বেড়াইতে গেছে নূরজাহান, গাওয়ালবাড়ি, মেন্দাবাড়ি গেছে। যারা রব্বানরে দেখে নাই তাগো জামাই দেখাইয়া আনছে। রব্বানরে বেবাকতে পছন্দ করছে। কইছে বড় ভাল জামাই পাইছে নূরজাহান।
মিয়াবাড়িতে নিয়া গেছিল কুট্টিরে দেখাইতে। আলফু তো বিয়ার মধ্যে ছিলই। কুট্টি আসতে পারে নাই, মাত্র কয়দিন আগে তার আহুজ পড়ছে। পোলা হইছে। রব্বানরে নিয়া এক বিকালে মিয়াবাড়ি গেছিল নূরজাহান। কুট্টি-আলফুর ঘটনা রব্বানরে সে আগেই সব বলছিল। কুট্টি কেমুন পাগল হইয়া গেছিল আলফুর লেইগা, সব বলছিল। শুইনা রব্বান বলছিল, আমি কোনওখানে চইলা গেলে, দশদিনের কথা কইয়া গিয়া যুদি দেড়মাস বাদে ফিরা আহি তয় কি তোমার অবস্থাও হইব কুট্টির মতন?
রব্বানের চোখের দিকে তাকায়া নূরজাহান বলছিল, আমার অবস্থা কুট্টির থিকাও খারাপ হইব। তোমারে ছাইড়া একটা দিনও আমি থাকতে পারুম না।
রব্বানরে দেইখা কুট্টিও খুশি। কুট্টির কোলে তার পোলা। সেই পোলা দেইখা পঞ্চাশটা টাকা দিছিল রব্বান। কুট্টি ও আলফু দুইজনেই খুশি। বড়বুজান তখন বাড়িতে নাই। তার শরীর বেশি খারাপ দেইখা রাজা মিয়া নিজে হাসপাতালের গাড়ি নিয়া আইসা ঢাকায় নিয়া গেছে। ঢাকা থেকে সে আর ফিরে নাই। কয়েকদিন বাদে হাসপাতালেই মারা গেছে। তারপর বাড়িতে আইসা রাজা মিয়ার মা’য় কুট্টি আর আলফুরে সংসার বুঝাইয়া দিয়া গেছে। এখন বাড়ির মালিক বলতে গেলে কুট্টি আর আলফুই। কুট্টি তার পোলার নাম রাখছে। নয়ন। রব্বানের দেওয়া পঞ্চাশ টাকা হাতে নিয়া বলছিল, পোলাডা যহন হাঁটতে শিখবো। তহন এই টেকা থিকাঐ মাজার ঝুনঝুনি কিন্না দিমু। সোনার ঝুনঝুনি তো এই টেকায় অইবো না। এই টেকার লগে আর কিছু টেকা ভইরা রুপার ঝুনঝুনি বানাইয়া দিমু।
নূরজাহান তারপর থেকে আশায় আশায় থাকে, প্রতিদিন অপেক্ষা করে, এই বুঝি কালো ব্যাগটা কান্ধে নিয়া রব্বান আইসা তার নাম ধইরা ডাকে। নূরজাহান, ও নূরজাহান। এই যে দেখো আমি আইসা পড়ছি।
আলফু যেভাবে কুট্টির কাছে ফিরছিল, নূরজাহানের মনে হয় ঠিক সেইভাবেই একদিন তার কাছে ফিরা আসব রব্বান।
.
তুমি কি এইভাবে বইয়া থাকবা না কিছু করবা? মাইয়াডার মুখের মিহি তো আমি চাইতে পারি না।
দুপুরের ভাত খাইয়া তামাক নিয়া বড়ঘরের ছনছায় বসছে দবির। নূরজাহান শুইয়া আছে। বড়ঘরের পুব দিককার জানালার ওই দিকটায়। আঁচলে মুখ ঢাকা। তবে ঘুমায় নাই।
হামিদার কথা শুইনা দবির কাতর গলায় বলল, কী করুম কও? কোনও পথ তো। দেখতাছি না। আইজ দেড় মাসের উপরে অইয়া গেল। কোনওহানে তো আর বিচড়ান বাকি রাখলাম না। মানুষ হারায়া গেলে তারে কি আর বিচড়াইয়া বাইর করন যায়!
রমিজ ঘটকের কাছে গেছালা?
তিনবার গেলাম। কয় আমি কী করুম কও? ভাল পোলা দেইক্কা, বেবাক খোঁজ খবর লইয়া তোমার মাইয়ার বিয়ার ববস্তা করলাম, এক বছরের বেশি পার করল যেই পোলা, এত সোন্দর কইরা সংসার করলো, দোকান চালাইলো, হেই পোলা এইভাবে নিরুদ্দিশ হইয়া যাইবো এইডা কেঐ চিন্তা করছে, কও? আমি ঘটকারে কইলাম, অহন। তাইলে কী করুম? ঘটকায় কইলো, আমিও তো কইতে পারি না কী করবা? পরের বার কইলাম, তুমি যে মালখানগরে গেছিলা, যেই খোঁজখবর লইয়া আইছিলা, বেবাক খবর ঠিক আনছিলা তো? ঘটকায় আমার উপরে চেইত্তা গেল। তয় মিছা খবর আনছিলামনি? আমার কথায় সন্দ হইলে মাইয়া বিয়া দিছিলা ক্যা? নিজে গিয়া খোঁজখবর লও নাই ক্যা?
হামিদা বলল, আসলে আমগো নিজেগোঐ খোঁজখবর লওন উচিত আছিল। ঘটকারা হইল বাটপার, মিথ্যুক। হাছাকথা কয় কম।
তারপর আরেকদিন যহন দেহা অইলো, মাওয়ার বাজারেঐ দেহা হইল, আমারে জিগাইলো জামাইর সমবাত পাইছোনি গাছি? কইলাম, না ঘটকায় হায়আপশোস করল। পোলাডারে এত ভাল দেকলাম, হেই পোলায় এমুন কারবার করবো এইডা কে চিন্তা করছে? তোমার মাইয়ার কপালডাঐ খারাপ। মন্নাইন্না শালার পো শালায় এমুন কুফরি কালাম মাইরা রাখছে, তোমার মাইয়ার জীবনে সুখশান্তি শালায় হইতে দিবো না। আর ওই দিকে দেহো গা শালার সংসারে খালি উন্নতি হইতাছে। বিরাট টেকা পয়সা সোনাদানা লইয়া আতাহাররে বিয়া করাইছে। ভাবির লগে সমন্দ আছিল, তিনহান পোলাপান ভাবির ঘরে অর নিজের, তারবাদেও এত টেকাপয়সাআলা বড়লোকের মাইয়া বিয়া করল। মাইয়াডা। ট্যারা। পয়লা পয়লা বউডারে একদম দেকতে পারতো না। তারবাদে বিরাট খাতির হইয়া গেল বউর লগে। বাপের বাড়ি থিকা ভাইগো কাছ থিকা আরও টেকা আইন্না দিল বউয়ে। বউয়ের টেকায় ঢাকা-মাওয়া লাইনে বাস নামাইছে আতাহারে। বউয়ের নামে বাসের নাম দিছে। কমলা একপেরেছ (এক্সপ্রেস)। অহন বাসের কারবার কইরা লাক লাক টেকা কামাইতাছে আতাহারে।
হামিদা বিরক্ত হল। ওই শুয়োরের পোগো কথা আমি শুনতে চাই না। তুমি অহন কী করবা? আমার মাইয়া কি মইরা যাইবোনি? খাওন দাওন ছাইড়া দিছে, নাওন ধোওন ছাইড়া দিছে। রাইতে ঘুমায় না। খালি কান্দে।
তামাক টানা রাইখা একটা নিয়াস ছাড়ল দবির। কী করি কও তো?
হামিদা আচমকা বলল, তুমি একবার মালখানগর যাইবা?
দবির অবাক হইয়া হামিদার মুখের দিকে তাকাল। মালখানগর?
হ।
মালখানগর গিয়া কী করুম?
