না জানে না। নাদান, নাদান। আর মোতালেইব্বা তো দৌড়াইতাছে চুরি চামারি করনের লেইগা। কাফোনের কাপোড় থিকাও চুরি করবো।
একটু থেমে বললেন, আমি যা যা কইলাম তুই গিয়া আইজ্জারে এইডি ক। সাফ কথা অইলো অর মায় চোর আছিলো, চোরের জানাজা অইবো না, কবর অইবো না। লাশ মড়কখোলায় হালাইয়া দিতে ক, নাইলে গাঙ্গে। যা।
মজনু আর কথা বলল না। শুকনা, চিন্তিত মুখে মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে নেমে এল। আনমনা ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে মনে হল যেসব কথা বলেছেন মান্নান মাওলানা এইগুলি ঠিক তো! নাকি কথার মধ্যে আছে অন্যরকমের চালাকি! ছনুবুড়িকে অপছন্দ করে বলে ইচ্ছা করেই কি তার জানাজা পড়াতে চাইছেন না মান্নান মাওলানা! কোনও দিনকার কোনও অপমানের শোধ কি এই ভাবে নিচ্ছেন ছনুবুড়ির ওপর! মুর্দারের ওপর কি শোধ নেওয়া যায়! মান্নান মাওলানা তো তাহলে মানুষ না। সাপ, কালজাইত সাপ। উড়ে এসে গায়ে পড়লে শুকনা পাতাকেও যে ছাড়ে না, ছোবল দেয়।
কিছু না ভেবে মজনু তারপর খান বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। খান বাড়ির মসজিদের হুজুরকে গিয়ে খুলে বলবে সব। মান্নান মাওলানা যা যা বলেছেন ওসব ঠিক কিনা জানতে চাইবে। যদি ঠিক না হয় তাহলে কি তিনি পড়াবেন ছনুবুড়ির জানাজা!
.
১.২৮
নূরজাহান মধুর স্বরে ডাকল, মা হামিদা, ও মা হামিদা।
রান্নাচালায় বসে কাজিরভাত (বিক্রমপুর অঞ্চলের গৃহস্থ বাড়ির রান্নাঘরে চুলার পাড়ে মাটির একখানা হাড়ি রাখা থাকে। যখনই ভাত রান্না হয় তখনই সদ্য চুলায় বসান ভাতের হাঁড়ি থেকে হাতায় করে একহাতা চালপানি তুলে ওই হাঁড়িটায় রাখা হয়। এই ভাবে দিনে দিনে ভরে ওঠে হাঁড়ি। চালপানি পচে টক টক একটা গন্ধ বে য়। এই চালপানি দিয়ে যে ভাত রান্না করা হয় তাকে বলে কাজিরভাত। চালটাকে বলা হয় কাজিরচাল। এই চাল দিয়ে যাই তৈরি করা হয় তার সঙ্গে কাজি শব্দটা থাকে। যেমন কাজিরজাউ, কাজিরবউয়া, কাজিরপিঠা ইত্যাদি) রাঁধছে হামিদা। মাটির হাঁড়িতে ভাত বসিয়ে, লগে তিন চারটা গোলালু, শিংমাছের মতো রঙের একখান সরা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। এখনও বলক ওঠেনি ভাতে, চোকলা (খোসা) পার করে তাপ পৌঁছায়নি গোললালুতে। নাড়ার আগুনে মাত্র লাড়াচাড়া পড়েছে হাঁড়ির চাউলপানিতে। সেদিকে একেবারেই মন নাই হামিদার। সে জানে ভাত উতরালে (বলক দিয়ে ফেনা ওঠা) শো শো শব্দ হবে। হাঁড়ির ভিতর থেকে সরা ধাক্কাতে শুরু করবে ফুটন্তু চাউলপানি। হামিদা তাই ব্যস্ত হয়ে আছে পাটা পুতা (শিল নাড়া) নিয়ে। তার হাতের কাছে, চুলার মুখে রাখা আছে একপাঁজা নাড়া, চুলার দিকে না তাকিয়েই মাঝে মাঝে চুলার মুখে সেই নাড়া গুঁজে দিচ্ছে সে। পাটার এক পাশে দুই তিনটা ছোট্ট টিনের পট, টিন এলুমিনিয়ামের দুই তিনটা বাটি, মাটির দুইখান খোড়া। ভাত চড়াবার আগে কয়েকটা শুকনা মরিচ মাটির খোলায় টেলে একটা খোঁড়ায় রেখেছে। অন্য খোঁড়ায় একটু পানি। এখন একটা পট থেকে একমুঠ কালিজিরা নিয়ে পাটার ওপর রেখে, বড় একখান টালা মরিচ নিয়ে, মাটির গোড়া থেকে আঙুলের ডগায় করে কয়েক ফোঁটা পানি তুলে কালিজিরা আর মরিচের সঙ্গে মিশিয়ে তা দিয়ে বেটে মাত্র ভর্তা বানাতে যাবে, অদূরে বসা নূরজাহান তখনই এই ভাবে ডাকল। শুনে কাজ ভুলে ভুরু কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকাল হামিদা। এইডা আবার কেমুন ডাক, আ?
নূরজাহান গম্ভীর মুখ করে বলল, ক্যা তোমার নাম হামিদা না?
হ ভাল নাম হামিদা। ডাক নাম হামি।
তয়?
তয় কী? মাইয়া অইয়া নাম ধইরা ডাকবিনি মারে?
নাম ধইরা ডাকি নাই তো!
তয় কী ধইরা ডাকছস?
তুমি হোন নাই কী ধইরা ডাকছি?
হুনছি হুনছি। মা হামিদা।
মিষ্টি মুখখানা হাসিতে আরও মিষ্টি করে তুলল নূরজাহান। নামের আগে তো মা কইছি!
মেয়ের এরকম হাসিমুখ দেখে আশ্চর্য এক অনুভূতি হল হামিদার। চোখ নরম করে নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দুইহাতে পুতা ধরে কালিজিরা পিষতে লাগল। কালিজিরা আর টালা মরিচের ধকধকে গন্ধ উঠে ছড়িয়ে গেল চারদিকে। সেই গন্ধে আকুল হল নূরজাহান। মধুর গলায় আবার ডাকল, মা হামিদা।
এবার আর মেয়ের মুখের দিকে তাকাল না হামিদা। কালিজিরা ভর্তা বানাতে বানাতে বলল, আথকা (হঠাৎ) এমুন আল্লাদ অইলো ক্যা! কী চাস?
কিচ্ছু না।
তয়?
তোমারে এমতে ডাকতে বহুত ভাল লাগতাছে।
তুই একখান পাগল। এত ডাঙ্গর অইছস অহনতরি পোলাপাইন্নামি (ছেলেমানুষি, মেয়েমানুষি) গেল না। কবে যে যাইবো!
কোনওদিনও যাইবো না। আমি হারাজীবন এমুন থাকুম।
হারাজীবন এমুন থাকন যায় না মা।
ক্যা যায় না?
অহন বুজবি না। বিয়াশাদি অইলে বুজবি।
না আমি অহনঐ বুজতে চাই। তুমি আমারে বুজাও।
এবার একটু বিরক্ত হল হামিদা। জ্বালাইতাছস ক্যা? দেহচ না কত কাম আমার!
শিশুর মতো অবুঝ গলায় নূরজাহান বলল, কী কাম?
হামিদার ইচ্ছা হল ধমক দেয় মেয়েকে। ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়, না হলে উঠিয়ে দেয় এখান থেকে। তারপরই ভাবল সেটা ঠিক হবে না। ধমক খেলে রেগে যাবে নূরজাহান পাড়া বেডাতে বের হবে। দুপুরের আগে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না তাকে। সারাটা বিয়ান না খেয়ে থাকবে। রসের প্রথম দিনে কেন অযথা কষ্ট দিবে মেয়েটাকে! তাছাড়া এত আদরের গলায় যখন ডাকছে, টুকটাক কথা বলে সময়টা ভালই কাটান যাবে। কাজের কাজও হবে মেয়েকেও আটকে রাখা যাবে বাড়িতে।
