.
কয়েকদিনের মধ্যেই দেশগ্রামের সবাই জাইনা গেল রব্বান নাই, রব্বান নূরজাহানরে ফালাইয়া উধাও হইয়া গেছে। তার চায়ের দোকান প্রথম প্রথম কয়েকদিন বাদলা চালাইছে। দুই একদিন দবির নিজে গিয়াও চালানের চেষ্টা করছে। সে চা বানাইতে পারে না, বাদলার হাতের চাও তেমন সুবিধার না। গাহেক কমতে শুরু করল। তারা আসত রব্বানের হাতের চা খাইতে। এখন রব্বান নাই, বাদলার হাতের চা পয়সা দিয়া কিন্না কে খাইব!
শেষ তরি দোকানে তালা মাইরা দিল দবির।
ততদিনে রাস্তার কাজ পুরাপুরি শেষ। উদ্বোধন হইয়া গেছে। রাস্তার ধারে লাগানো। বাবলাগাছগুলি বড় হইতে শুরু করছে। বাস ট্রাক মিনিবাস বেবিট্যাক্সি টেম্পো রিকশা, গাড়ি মোটরসাইকেল দিনরাইত চব্বিশ ঘণ্টা চলাচল করছে। পুরা এলাকা এখন টাউন। এলাকার পুরানা মানুষজনরাও যেন নতুন হইয়া গেছে। বিজলি বাতি আইসা পড়ছে। ঘরে ঘরে টেলিভিশন চলে, ফ্রিজ চলে। মাওয়ার বাজারে ভিসিআরে ইন্ডিয়ান সিনামা দেখায় জামাল। বিরাট রোজগার তার। এক সিনামা বিশটাকা। মদ গাঁজার ব্যাবসাও শুরু হইছে। কত দোকানপাট, কত নতুন নতুন মানুষ। রিকশাআলারা বেশির ভাগই চরের। ওইপার থেকে পদ্মা পাড়ি দিয়া এইপারে আইসা রিকশাআলা হইছে। দেশগেরামের গিরস্তবাড়িতে ঘরদুয়ার এখন ঢাকার টাউনের মতন ভাড়াও দেওয়া যায়। মাসে একশো-দুইশো টাকা। ভাড়া। নূরজাহান-রব্বানের ঘরটা ভাড়া নিতে আসছিল চরের এক রিকশাআলা মমরেজ। দেশশো টাকা ভাড়া কইছিল। দবির কোনও কথা বলে নাই, নূরজাহান সরাসরি না কইরা দিছে। তার তখনও আশা, রব্বান ফিরা আসব। একদিন না একদিন ফিরা আসব। নূরজাহানরে ছাইড়া সে থাকতে পারব না।
নূরজাহানের মুখের দিকে এখন আর তাকানো যায় না। প্রথম জীবনের সেই চঞ্চল মেয়েটা তো নাইই, বিয়ার পর ভরভরন্ত সুন্দর শরীর চেহারার মেয়েটাও নাই। মুখটা শুকনা, চোখ দুইটা গর্তে, চালচলন ধীর, যেন বাইচা থাকতে হইতাছে বইলা বাইচা আছে। তার নাইতে ইচ্ছা করে না, খাইতে ইচ্ছা করে না। একটু সাজগোজ, মাথায় তেল পানি খোঁপা বেণি, না কিচ্ছু ইচ্ছা করে না নূরজাহানের। আর মুখটা এত দুঃখী, এত অসহায়। মেয়ের মুখের দিকে তাকালে বুক ফাইটা যায় দবিরের। মেয়ের জন্য দবির-হামিদা দুইজনই গোপনে কান্দে। আর আল্লারে বলে, আল্লাহ আমার মাইয়ার জীবন তুমি এমুন করলা ক্যা? কোন গুণা আমার মাইয়ায় করছে? কোন গুণা আমরা করছি আল্লাহ, যেই গুনার শাস্তি এমতে তুমি আমগো দিতাছো? আমার মাইয়ারে দিতাছো?
আর নূরজাহান!
বড়ঘরে বিয়ার আগে যেভাবে সে থাকত আবার সে ফিরা গেছে সেই জীবনে। জানালার ওইদিকটায় মুখ মাথা আঁচলে ঢাইকা দুপুরবেলা শুইয়া থাকে, রাতেরবেলা শুইয়া থাকে। ঘুম তার আসেই না। শুধু রব্বানের কথা, শুধু রব্বানের স্মৃতি মনে আসে। রাইত কাইটা যায় কানতে কানতে, বালিশ ভিজে চোখের পানিতে। দিনেরবেলা কখনও কখনও নিজের ঘরটায় গিয়া বইসা থাকে। রব্বানের বালিশটা হাতায়, বিছানাটা হাতায়। এখনও যেন ওই ঘরে আসলে রব্বানের গায়ের গন্ধটা পায়, ঘরের চারদিকে রব্বানের কত স্মৃতি। বাঁশঝাড় তলার ওদিকটায় বিকালের দিকে কোনও কোনওদিন গিয়া নাড়ার পালায় ঢেলান দিয়া দাঁড়ায়া থাকে। মনে পড়ে সেই জ্যোৎস্না রাইতটার কথা, সেই গভীর আনন্দের কথা আর আসামের জঙ্গলের সেই জ্যাটিঙ্গা পাখির কথা। কেন আত্মহত্যার কথা বলেছিল রব্বান? তাইলে কি সে এই বাড়ি থিকা দূরে কোনখানে গিয়া সেই কামটাই করছে? আত্মহত্যা? বাইচা নাই সে? ক্যান এইটা সে করবো? নূরজাহান কি তারে সুখী করতে পারে নাই? সে যেভাবে যা চাইছে, রমিজ ঘটক যেভাবে যা বলছিল দবির তো সেইভাবেই সব কইরা দিছিল। রব্বানরে। মতের কোনও অমিল ওইসব ক্ষেত্রে হয় নাই। দবির-হামিদা তারে জানটা দিয়া আদর করছে। নূরজাহানের মনের মধ্যে গোপনে রইয়া গেছে মজনু। সেই গোপন কথা নূরজাহান ছাড়া দুনিয়ার কেউ জানে না। সেই মানুষটার কথা চাইপা মনের মধ্যে রাইখাই তো রব্বানরে স্বামী হিসাবে মাইনা নিছে নূরজাহান। তারে বুঝতে দেয় নাই কিছুই। শরীর মন সব দিয়া মানুষটারে সে ভালবাসছে! তারপরও এইভাবে তারে সে ছাইড়া গেল?
চোখের পানিতে ভাসতে ভাসতে নূরজাহানের কোনও কোনও দিন মনে হয়, আল্লায় কি মজনুর লেইগাই এই শাস্তি তারে দিল? ভাল একজন মানুষ স্বামী হিসাবে দিয়া তারে ফিরায়া নিল মজনুর কারণে! নূরজাহানের মনের মধ্যে একটুখানি হইলেও রইয়া গেছে মজনু। এইটা তো গুনা। স্বামী ছাড়া অন্য কেউ মুসলমান মাইয়াগো মনে থাকতে পারে না। এই গুনার জন্যই কি রব্বানরে আল্লায় নূরজাহানের জীবন থিকা সরায়া দিল!
নূরজাহান মনে মনে আল্লাহকে ডাকে। আল্লাহ, আল্লাহ তুমি আমারে মাফ কইরা দেও। আমি আমার মন থিকা মজনুরে মুইছা ফালামু। তুমি তো জানোই সব। মজনুর লগে আমার কোনওদিনও কিছু হয় নাই। সে আমারে ভালবাসে আমি তারে ভালবাসি এমুন কথাও কোনওদিন হয় নাই। তার মনের খবরও পুরাপুরি আমি জানি না। আমি জানি আমার মনের খবর। হ, তারে আমার ভাল লাগত। আমি চাইছি, মনে মনে চাইছি তার লগে আমার বিয়া হউক। হয় নাই। মাইনষের হায়াত মউত রিজিক দৌলত বিয়া সবঐত্তো তোমার হাতে। তোমার ইশারায়ঐ রব্বনের লগে আমার বিয়া হইছে। বিয়ার পর মজনুরে আমি একদিন দেখছি, সে দেখছে আমারে। তার মনে কী হইছে আমারে দেখনের পর হেইডা আমি জানি না, আমি জানি আমার মন। আমার মনডা তার লেইগা ইট্ট খারাপ হইছিল, সেইটাই আমার গুনা। আল্লাহ আমার ওই গুনা মাফ কইরা তুমি আমার স্বামীরে ফিরত আইন্না দেও আল্লাহ। জিন্দেগিতে আমি আর কোনওদিন মজনুর কথা ভাবুম না। কোনও পরপুরুষের কথা ভাবুম না। তুমি আমারে মাফ। করো আল্লাহ, মাফ করো। এত সুখের জীবন দিয়া সেই সুখ তুমি ফিরাইয়া নিয়ো না।
