নূরজাহানের হাত পা ভাইঙা আসল। মুখটা মরা পাতার মতন শুকাইয়া গেল। চোখে। যেন পলক পড়তে চায় না। যেন এখনই মইরা যাইব এমন ভঙ্গিতে ঘর থেকে বাইর হইল সে। রান্নাচালার সামনে আইসা দাঁড়াইল।
সেখানে রুটি ভাজা শেষ কইরা বইসা আছে হামিদা। দবির আর বাদলা দাঁড়ায়া আছে। উঠানে। নূরজাহান কোনওরকমে বলল, বাবা, হের ব্যাগটা ঘরে নাই।
দবির বড় রকমের একটা ধাক্কা খাইল। কী?
হ।
আমি আলমারি খুলছিলাম। আলমারিতে আমার জিনিস তার জিনিস বেবাকঐ আছে। খালি তার পুরানা শাট পেন লুঙ্গি গামছা গেঞ্জি এই হগল আলমারিতেও নাই, আলনায়ও নাই।
হামিদা দৌড়াইয়া বাইর হইল রান্নাচালা থেকে। কচ কী তুই?
হ মা। আমি বেক কিছু দেইক্কাঐ তোমগো আইয়া কইলাম।
বাদলা বলল, তয় দুলাভাই ব্যাগবোগ লইয়া কই গেল গা? দোকানের চাবি কো?
নূরজাহান হাতের মুঠি খুইলা চাবি দেখাইল। চারজন মানুষই তখন হতভম্ব। এইটা কী হইল? এইভাবে ব্যাগ আর পুরানা কাপড়চোপড় লইয়া কই গেল গা রব্বান? টাকা পয়সাও তো নেয় নাই। হিসাবের টাকা সব আলমারিতে। যেদিন দোকানে যা বিক্রি হয়, রাইতেরবেলা বাড়িতে আইসা গইনা গইনা টাকা পয়সা আলমারিতে রাখে রব্বান। সবকিছু ফালাইয়া এইভাবে কই গেল গা সে? এই বাড়ির কেঐ তো তার লগে কোনও খারাপ ব্যবহার করে নাই। দবির হামিদা তার মা-বাপের মতন। নূরজাহানের লগেও সম্পর্ক খুব ভাল। গত এক বছরে একদিনের লেইগাও মনোমালিন্য হয় নাই। দেখলেই বুঝা যাইতো ভালরকম আমোদ ফুর্তিতে তারা আছে। বিয়ার পর দুইজনেরই চেহারা সুরত ভাল হইছে, শরীর স্বাস্থ্য ভাল হইছে। বিয়ার আগে যেমন ছিল রব্বান বিয়ার পর আর তেমন ছিল না। শরীর স্বাস্থ্যে আমোদ ফুর্তিতে বেশ ভাল ছিল। আর নূরজাহান, মুখ দেখলেই বুঝা যাইত মাইয়াটা সুখে আছে। শরীর স্বাস্থ্যের লগে চেহারাও বদলাইছে, সুন্দর হইছে।
এই অবস্থায় কোথায় চইলা গেল রব্বান!
দোকানের চাবি বাদলার হাতে দিল দবির। তুই গিয়া দোকান খোল বাদলা। চা বানাইয়া বেচাবিক্রি কর। আমি জামাইরে বিচড়াইয়া দোকানে আইতাছি। যা। আর রব্বানের কথা কেঐরে কইছ না। কেঐ জিগাইলে কবি, তার শইল খারাপ। মনে হয় জ্বর আইছে। বাইত্তে হুইয়া রইছে।
আইচ্ছা মামা।
বাদলা চাবি নিয়া চক পাথালে দৌড় দিল।
নূরজাহান তখন ভাঙাচোরা হতাশ মানুষের মতন রান্নাচালার মাটিতে বইসা পড়ছে।
দবির বলল, তুই এত ভাইঙ্গা পরিচ না মা। আমি দেকতাছি কই গেল হেয়, কী বিত্তান্ত।
হামিদা বলল, এইডা কেমুন কারবার জামাইর? কথা নাই বার্তি নাই বিয়ানবেলা উইট্টা ব্যাগ লইয়া কই গেল গা? কোনওহানে যাইতে অইলে আমগো কইয়া যাইবো না? আমরা তারে যাইতে না করতাম!
সেই যে গেল রব্বান, গেল তো গেলই। আর কোনও হদিসই নাই। প্রথম প্রথম দুই তিনদিন রব্বানের উধাও হয়ে যাওয়ার কথা চাইপা থাকল দবির হামিদা বাদলা। বাদলা চায়ের দোকানটা খোলে, দোকানটা তার মতন কইরা চালায়, বন্ধ করে। কত বেচা বিক্রি হয় না হয় কেউ খবরও রাখে না। রাতেরবেলা দোকানের চাবি আর বেচা বিক্রির টাকা দবিরের হাতে আইনা বুঝাইয়া দিয়া যায়। বাদলা মুখ দিয়া যা বলে তাই, টাকা পয়সা দবির গইনাও দেখে না।
যেদিন রব্বান উধাও হয়ে গেল সেদিন অনেকটা রাত তরি উঠানে বইসা ছিল তিনজন মানুষ। দবির হামিদা আর নূরজাহান। ভিতরে ভিতরে অপেক্ষা করেছে, এই বুঝি ব্যাগ হাতে, ব্যাগ কান্ধে ফিরা আসল রব্বান। আইসা তার মধুমাখা হাসিখান দিয়া বলল, আপনেগো ডর দেহানের লেইগা গেছিলাম গা একমিহি, দেকতে চাইলাম আমার লেইগা আপনেগো কেমুন মায়া। তয় আপনেগো ছাইড়া একটা দিনও থাকতে পারলাম না। ফিরত আইলাম। নূরজাহান ভাত দেও আমারে খিদা লাগছে।
বেশি রাত্রে চাঁদ উঠল। দবির বলল, নূরজাহান, মাগো, আর বইয়া থাইক্কা লাব নাই। আইলে এতক্ষুনে আইয়া পড়তো। আমগো এইমিহি হেয় নাই। আমি তো দিনডা ভর। বেবাক মিহি বিচড়াইলাম, কেঐরে তো আর জিগাইতে পারি না যে আমার জামাইরে আপনেরা দেকছেননি? তয় আর দুই-একটা দিন দেইক্কা তারবাদে জিগামু। তুই তর ঘরে গিয়া তর বালিশটা লইয়া আয়। একলা ঘরে থাকনের কাম নাই। আমগো ঘরে থাক।
নূরজাহান মরার মতন উঠল। সারাদিন বলতে গেলে কিছু খায় নাই। সন্ধ্যার দিকে জোর কইরা তারে একটু ভাত খাওয়াইছে হামিদা। বিয়ার পর এমনিতেই একটু ভার ভারিক্কি হইয়া উঠছে নুরজাহান। আগের সেই চঞ্চল ছটফটা দৌড়াদৌড়ি করা মাইয়াটা আর নাই। ধীর স্থির, একটু গম্ভীর, সবকিছু মিলাইয়া এক নতুন নূরজাহান।
দবিরের কথা শুইনা নিজের ঘরে গিয়া ঢুকল সে। ঘরে ঢুইকা নিজের বালিশটা ধরতে গিয়া রব্বানের বালিশটা ধরল, ধরার লগে লগে কইলজাটা য্যান ফাইটা গেল তার, বুকটা ফাইটা গেল, উঠানে বসা মা-বাপে য্যান শুনতে না পায় এমন কইরা চাইপা চাইপা কাঁদতে লাগল। মনে মনে বলল, কই গেলাগা তুমি? আমারে থুইয়া কই গেলা গা? অহন তোমারে ছাইড়া আমার রাইত কাটবো কেমতে? দিন কাটবো কেমতে?
শেষ তরি নিজের বালিশটা বুকে চাইপা, ঘরে তালা দিয়া নূরজাহান যখন চাঁদের আলোয় তাদের ছোট্ট উঠান পার হইয়া নিজের ঘর থেকে বড়ঘরের দিকে পা বাড়াল, নূরজাহানের ক্যান যে মনে হইল জামাইবাড়ি থিকা চিরদিনের জন্য বাপের বাড়িতে চইলা যাইতাছে সে। এই জামাইবাড়িতে য্যান, জামাইর ঘরে য্যান এই জীবনে তার আর কোনওদিন ফিরা হইব না।
