কী?
আত্মহত্যা?
কী?
হ আত্মহত্যা করে। দলে দলে আত্মহত্যা করে।
একটু থামল রব্বান। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, আমার অহন আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করতাছে।
নূরজাহান তাকে একটা ধাক্কা দিল। কী অলইক্ষা কথা কও।
অলইক্ষা কথা না। সত্যঐ। সত্যঐ আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করতাছে। এই আনন্দ আমি সইজ্য করতে পারতাছি না। লও দুইজনে মিল্লা আত্মহত্যা করি। তোমার। শাড়ি দিয়া গলায় দড়ি দেই। আর নাইলে আমগো ঘরে তোমার বাপে ইরিখেতের মাজরা পোক মারনের লেইগা এনডিরিন (এনড্রিন) না কী জানি একটা কীটনাশক আইন্না রাখছে, লও ওই কীটনাশক খাইয়া দুইজনে আত্মহত্যা করি।
নূরজাহান তারপর ভয় পাইয়া গেল। এইরকম জ্যোত্সা রাইতে বাঁশঝাড়তলায় দাঁড়ায়া ওই কাজ করছে তারা, বদ হাওয়া লাগলোনি শইল্লে, জিনে ভূতে ধরলনি রব্বানরে? নাইলে। এই হগল কী কয়!
রব্বানের হাত ধইরা টানতে টানতে তারে ঘরে নিয়া আসল নূরজাহান। লও ঘরে লও। এহেনে আর থাকনের কাম নাই। বহুত থাকছো, যা করনের করছো, অহন ঘরে লও।
বিয়ার পরের একটা বছরে কত ছোট ছোট সুখ আহ্লাদের ঘটনা, কত আনন্দের দিন, সুখ স্বপ্নের রাত, তার কিছুই আইজ মনে পড়ল না নূরজাহানের। মনে পড়ল শুধু সেই জ্যোৎস্না। রাতটার কথা। প্রথমে মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার মতন জ্যোত্সা, নূরজাহানের পদ্মা তীরে দৌড়াইয়া যাওয়ার ইচ্ছা, গাঙ্গের পানিতে ডুবাডুবি করার ইচ্ছা, তীরের বালিতে রব্বানের গলা। প্যাচাইয়া শুইয়া থাকার ইচ্ছা। তারপর ঘটল সেই ঘটনা। ঘটনার পর জ্যাটিঙ্গা পাখির কথা তুইলা আত্মহত্যা করতে চাইল রব্বান! নূরজাহান ভাবল বাঁশঝাড়তলার ওদিককার বদ হাওয়া লাগছে। স্বামীর গায়ে, শরীরে আছর করছে বদ কিছু। তাড়াতাড়ি তারে নিয়া ঘরে চইলা আসছে।
আইজ এইসবই মনে পড়ছে নূরজাহানের।
বিয়ানবেলা ঘুম থেকে উইঠা সে দেখে রব্বান ঘরে নাই। ঘরের দুয়ার আবজানো। মাথার সামনের জানালা খোলা। চৈত্রমাসের গরমে জানালা দিয়া মিঠেল হাওয়া আসে। রাতদুপুরে। সেই হাওয়ায় আরামছে ঘুমান যায়। উঠানের দিককার জানালাটা বন্ধই রাখে নূরজাহান। কারণ ওই জানালা দিয়া তাকালেই বড়ঘর দেখা যায়, দবির-হামিদাকে দেখা যায়। কীরকম শরম করে নূরজাহানের।
ঘুম ভাঙার পর রব্বানরে চকিতে না দেইখা নূরজাহান ভাবছে পায়খানায় গেছে। হাতমুখ ধুইয়া ঘরে আইসাই দোকান খুলতে চইলা যাইব। সে ঘর থেকে বাইর হইছে। হইয়া দেখে না রব্বান ওই দিকটায় নাই। চাপকল একহাতে চাইপা অন্যহাতে মুখ ধুইতাছে দবির। রান্নাচালায় হামিদা আটার রুটি ভাজতাছে।
নূরজাহান রান্নাচালায় আসল। হেয় কো মা? তোমগো জামাই?
তাওয়ার রুটি খুন্তি দিয়া উলটাইয়া দিয়া হামিদা বলল, দেহি নাই তো! ক্যা, ঘরে নাই?
না।
দোকানে গেছেগা নি?
দোকানে গেলে আমারে কইয়া যাইবো না? বেশি বেলাও তো অয় নাই। হেয় আর আমি তো একলগেই ঘুম থিকা উডি। আইজ সে কুনসুম উটছে আমি উদিসই পাই নাই।
হামিদা একটু চিন্তিত হল। তয় কই গেল এত বিয়ানে?
কাঁধের গামছায় মুখ মুছতে মুছতে কলতলা থেকে আসল দবির। কী অইছে?
হামিদা বলল, জামাই বিয়ানে উইট্টা কই জানি গেছে গা।
কই গেছে গা?
হেইডাঐত্তো নূরজাহান বুজতাছে না। এত বিয়ানে তো হেয় ওড়ে না।
দোকান মিহি গেলনি?
নূরজাহান বলল, কেরে কিছু না কইয়া, আমারে ডাক না দিয়া তো কোনওদিন যায় না।
এই সময় বাদলা আসল। রব্বানরে সে ডাকে দুলাভাই। বাড়ির উঠানে খাড়ইয়া ছটফটা গলায় বলল, দুলাভাই কো? বেইল অইয়া গেল, দোকান খুলবো না?
নূরজাহান চমকাল। হেয় দোকানে যায় নাই?
না। দোকান বন্ধ। এর লেইগাইঐত্তো আমি বাইত্তে আইলাম। দোকানের এইমিহি ওইমিহি গাহেকরা খাড়ইয়া রইছে। এক বেডা আমারে জিগাইলো, কী রে বাদলা, দোকান খুলবি না? আমগো তো চা খাওন লাগবো। আমি তারবাদেও ইট্টু খাড়ইয়া রইলাম। তারবাদে দৌড়াইয়া আইলাম।
এবার দবির-হামিদাও চিন্তিত।
দবির বলল, কই গেল এত বিয়ানে?
হামিদা বলল, নূরজাহান, দেখ তো দোকানের চাবি ঘরে আছেনি?
নূরজাহান দৌড় দিয়া ঘরে ঢুকল। দোকানের চাবি থাকে বিছানার নীচে, সেই জায়গাটায় হাত দিল। না, চাবি তো আছে। চাবি নিয়া সে বাইর হয় নাই।
চাবি হাতে নিয়া নূরজাহান খুবই চিন্তিত হল। ঘরের এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। বিয়ার পর রব্বান নিজেই নন্দ মিস্তিরিরে ডাইকা একটা অল্পদামি আলমারি বানাইছিল। নিজের দুই-একখান ভাল জামা কাপড়, নূরজাহানের শাড়ি ছায়া ব্লাউজ আর যেইটুক গয়না আছে সেইটুক যাতে রাখন যায়। আলমারিটা তালা দেওয়া। আলমারির মাথার উপরে থাকে রব্বান যে কালো ব্যাগটা লইয়া এই বাড়িতে আসছিল সেই ব্যাগ। নূরজাহানের চোখে পড়ল, ব্যাগটা নাই। তবে আলমারি আগের মতনই তালা মারা।
নূরজাহান ফ্যালফ্যাল কইরা আলমারিটার দিকে তাকায়া রইল। আলমারির চাবিও থাকে বিছানার তলায়। আলমারিতে রব্বান আর নূরজাহানের অতি গোপন কিছু জিনিসও থাকে। কী মনে কইরা ধীর পায়ে গিয়া আলমারিটা খুলল নুরজাহান। খুইলা দেখে জিনিসপত্র সব ঠিক আছে। তার চেনটা কানের দুলটা, শাড়ি ছায়া ব্লাউজ, দোকানের টাকা পয়সা আর বিয়ার সময় রব্বানরে যে সিল্কের পাঞ্জাবি, পায়জামা শার্ট প্যান্ট ঘড়ি আংটি দেওয়া হইছিল সবই আছে। শুধু তার পুরানো শার্ট প্যান্ট দুইটা নাই। দুই-তিনটা শার্ট আর দুইটা প্যান্ট, পুরানা দুইটা লুঙ্গি রব্বান ব্যাগে কইরা নিয়া আসছিল। এক বছরে সেইগুলি আরও পুরান হইছে, লুঙ্গি ছিড়া গেছে, দুইটা লুঙ্গি সে কিনছিল, দুইটা কোরাগেঞ্জি কিনছিল সেই সবই আছে। শার্ট প্যান্ট পুরানাগুলিই চালাচ্ছিল। মাসেকখানি ধইরা বাবরি চুল আর দাড়িমোচের লগে লগে কাপড় চোপড়ের ব্যাপারেও উদাসীন হইয়া গেছিল রব্বান। নিজের পুরানা শার্ট প্যান্ট পরত, নতুন কিনা লুঙ্গি গেঞ্জি পরত, সেইগুলি সবই আলমারিতে আছে, আলনায় আছে, নাই শুধু ব্যাগটা, পুরানা শার্ট প্যান্ট।
