রব্বানের সেই দিনকার সেই কথার পর সকালের নাস্তা দুপুরের ভাত রাতের ভাত, তিনবেলার খাবারই রব্বানের লগে বইসা খায় নূরজাহান। যতই মন জুইড়া থাউক মজনু, রব্বানের জন্যও একটা মায়া মমতা ভাল লাগা নূরজাহানের তৈরি হইছে। এইটা ভালবাসা কিনা কে জানে! তবে মায়াটা রব্বানের জন্য লাগে। দুপুরবেলা দেরি কইরা বাড়িতে আসলে অপেক্ষার একটা কষ্ট হয়। রাতেরবেলা দেরি কইরা আসলে মনের ভিতর তৈরি হয় অদ্ভুত এক ছটফটানি। সব মিলায়া সম্পর্কটা মায়া মমতার, ভাললাগার, হয়তো বা এও এক রকমের ভালবাসা। মজনুর জন্য যেমন তেমন না, অন্যরকম।
তবে রব্বান মানুষটা খারাপ না। মায়া মমতা তারও আছে। একটু উদাস টাইপের। মাঝে মাঝে কী জানি চিন্তা করে। আনমনা হইয়া থাকে। কোনও কোনও রাত্রে অনেকটা রাত হয়ে যায় ঘুম আসে না। বিছানায় শুইয়া নিয়াস ছাড়ে, এইপাশ ওইপাশ করে। ওইরকম এক রাতে নূরজাহান তার বুকে হাত বুলাইয়া জিজ্ঞাসা করছে, কী হইছে তোমার? ঘুমাইতাছে না ক্যা?
জী জানি। ঘুম আহে না। মনডা কেমুন জানি লাগে?
ক্যান গো?
হেইডা কইতে পারি না।
নূরজাহান ঠাট্টা কইরা বলছে, কেঐরে কোনওহানে রাইখা আইছোনি? তার লেইগা মন কান্দে? ঘুম আহে না?
রব্বানও ঠাট্টা করছে। হ একখান বউ রাইক্কাইছি। মাত্র জন্মাইছে এমুন একহান মাইয়া রাইক্কাইছি। তাগো লেইগা পরান কান্দে। রাইত্রে ঘুম আহে না। খাইতে ইচ্ছা করে না। খালি একহান কাম করতে ইচ্ছা করে।
কী কাম?
তোমারে আদর সোহাগ করতে। তোমার লগে সহবাস করতে।
নূরজাহান লাজুক ভঙ্গিতে রব্বানের বুকে ছোট্ট কইরা একটা কিল মারছে।
এক জ্যোৎস্না রাইতে অদ্ভুত এক কাম করল রব্বান। রাইত দোফরে নূরজাহানরে বলল, লও বাইরে যাই।
নূরজাহান অবাক। ক্যা, এত রাইতে বাইরে যাইবা ক্যা?
এমুন সোন্দর জ্যোৎস্না রাইত। লও বাঁশঝাড়তলার ওইমিহি দিয়া ইট্টু হাঁইট্টা হুইটা (হেঁটে টেটে) আহি। ওই দিককার চকে দেইখো কী সোন্দর জ্যোত্মা। জ্যোত্সা দেখলে মাথা খারাপ হইয়া যাইবো। লও।
অনেকটা জোর কইরাঐ নূরজাহানরে লইয়া ঘর থেকে বাইর হইল। নূরজাহান বলল, রাইত দোফরে বাঁশঝাড়তলার মিহি যাইতে আমার ডর করে।
কীয়ের ডর? ভূতের? আরে ধুরো। আমি আছি না! কীয়ের ভূত।
বাঁশঝাড়তলায় আইসা চকের দিকে চাইয়া সত্যঐ মাথা খারাপ হইয়া গেল নূরজাহানের। কী সুন্দর জ্যোত্সা। কী সুন্দর লাগতাছে আল্লাহপাকের দুনিয়া। দক্ষিণ দিকে পদ্মা নদী। সেই নদী থেকে আসছে হু হু করা হাওয়া। পদ্মার ঠিক উপরেই ফুইটা আছে চাঁদ। বৈশাখ মাস। দিনেরবেলা জানমারা গরম। সেই রাইত দোফরে কী সুন্দর হাওয়া। কীসের গরম! ভারী আরামদায়ক হাওয়া।
রব্বান বলল, কী অহন ডর করতাছে না ভাল লাগতাছে?
রব্বানের হাত ধরল নূরজাহান। ভাল্লাগতাছে, বহুত ভাল্লাগতাছে। মনে হইতাছে তোমার হাত ধইরা ওই চক দিয়া একখান দৌড় দেই। দৌড় দিয়া পদ্মার পারে চইলা যায়। গাঙ্গের পানিতে নাইম্মা ডুবাডুবি করি। তোমার বুকে মাথা দিয়া গাঙপারের বালিতে শুইয়া থাকি।
ল যাই।
আরে না। কেঐ দেকলে কী কইবো?
কে দেখবো?
দেখতে পারে। সড়কের কামে দেশগেরামে অহন ম্যালা মানুষ। দেশগেরামে অহন আর দিন রাইত নাই।
বাঁশঝাড়তলায় একটা নাড়ার পালা দিয়া রাখছে দবির। বেশি বড় পালা না। সেই পালায় ঢেলান দিয়া রব্বানের হাত ধইরা চকের দিকে চাইয়া দাঁড়ায়া রইল নূরজাহান। মনের মধ্যে সত্যঐ দারুণ এক আনন্দ। জীবনে যেন এত আনন্দের রাইত আর আসে নাই।
এই সময় ঘটল সেই কাণ্ড।
রব্বান ধীরে ধীরে আদর করতে লাগল নূরজাহানরে। পিঠের কাছে গলার কাছে মুখ ঘষতে লাগল, গালে ঠোঁটে ছোট ছোট কামড়, চুমা, ব্লাউজের তলা দিয়া বুকে হাত, পটাপট একসময় ব্লাউজের টিপ বোতাম খুলল, নূরজাহানের বুকে মুখ দিল। নূরজাহান ছটফট করতে করতে বলল, ঘরে লও।
রব্বান কোনও কথা বলল না। সে যেন পাগল হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন হল, নাড়ার পালার সঙ্গে ঢেলান দেওয়া অবস্থাতেই, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই নূরজাহানের লগে মিলিত হইল সে। সেইটা অদ্ভুত রকমের এক পাগলামি, অদ্ভুত রকমের এক আনন্দ। ব্যাপারটা শেষ হওয়ার পর নূরজাহান টের পাইল এইরকম আনন্দ বিয়ার পর, এতবার স্বামীর লগে মিলিত হওয়ার পর একদিনও পায় নাই নূরজাহান। সে তখন আঁচলে মুখ গলা গাল মুচছে আর হাঁপাচ্ছে।
রব্বানের অবস্থাও তেমন। নূরজাহানের আঁচল টাইনা সেও মুখ মুছল। বলল, কী, কেমুন লাগলো?
নূরজাহান কথা বলল না। লাজুক ভঙ্গিতে রব্বানের পিঠে একটা কিল দিল। মিষ্টি কইরা একখান গাইল দিল। শয়তান।
রব্বান বলল, আমার অহন কী ইচ্ছা করতাছে জানো?
কী?
জ্যাটিঙ্গা পাখি হইয়া যাইতে।
জ্যাটিঙ্গা পাখি আবার কোনডা?
হেই পাখি আমগো দেশে থাকে না। থাকে আসামের জঙ্গলে।
তোমার আথকা হেই পাখি হইয়া যাইতে ইচ্ছা করতাছে ক্যা?
এই জ্যোৎস্না রাইত দেইখা, পূর্ণিমা রাইত দেইখা। আর ওই যে ইট্টু আগে যেই আনন্দটা পাইলাম সেই আনন্দে আমার জ্যাটিঙ্গা পাখি হইয়া যাইতে ইচ্ছা করতাছে। তোমারে কইলাম না জ্যাটিঙ্গা পাখিরা থাকে আসামের গভীর জঙ্গলে। ভরা পূর্ণিমা রাইতে চান্দের আলো দেইখা, জ্যোৎস্না দেইখা হেই পাখির মাথা খারাপ হইয়া যায়। জঙ্গল থিকা দলে দলে বাইর হয় পাখিড়ি। বাইর অইয়া কী করে জানো?
