আমায় এত রাইতে ক্যানে ডাক দিলি
প্রাণ কোকিলারে!
দেলোয়ারা ভাবছিলেন বাদলারে লেখাপড়া শিখাবেন। প্রথমে খাইগোবাড়ির স্কুলে তারপর কাজির পাগলা হাইস্কুলে ভরতি করাইয়া দিবেন। পড়ায় বাদলার মনই নাই। রব্বান চায়ের দোকান দেওয়ার পর রাবি একদিন নূরজাহানের কাছে আইসা হাজির। আমার পোলাডারে দোকানের কামে লইয়া লইতে ক তর জামাইরে। একটা ছেমড়া তো লাগে দোকানে।
নূরজাহান বলার লগে লগেঐ রব্বান বাদলারে দোকানে রাখছে। দোকান ভাল রকম চালু হইছে। পাঁচ-ছয়শো টাকা বিক্রি রোজ। চায়ের দোকানে লাভ অনেক। ছয়শো টাকা বিক্রি হইলে সব বাদ দিয়া দুই-আড়াইশো টাকা টিকে। মাসে ছয়-সাত হাজার টাকা। দেশগ্রামে ছয়-সাত হাজার অনেক টাকা। রব্বান আর নূরজাহানের জীবন সুখে আনন্দেই কাটছিল। বাদলাও মহা উৎসাহে দোকান চালায়। কোনও কোনওদিন দবিরও গিয়া দোকানে বসে। রব্বান যদি গোয়ালিমান্দ্রার হাটে যায়, দিঘলি বাজারে যায়, ওইসব দিকে গেলে দিন পার হইয়া যায়, তখন দবির গিয়া বসে দোকানে। সে চা বানাইতে পারে না। চা বানায় বাদলা। অন্যান্য জিনিসপত্র বেচে সে। টাকাপয়সা গুইনা রাখে ক্যাশ বাক্সে। দোকানের আয় উন্নতি দেইখা, মাইয়ার সুখ শান্তি আনন্দ দেইখা ভাবছে দরকার হইলে অর্ধেকখানি জমিন বেইচা বড় কইরা আরেকখান দোকান দিব রাস্তার ধারে। দুইখান দোকান যুদি হয়, তয় টেকা পয়সার আকাল থাকবো না সংসারে। নূরহাজানের পোলাপান হইলে খরচ বাড়বো না!
তয় বছর পার হইয়া আইলো পোলাপান হওনের নাম নাই নূরজাহানের। একদিন এইসব লইয়া হামিদার লগে কথা কইছিল দবির। হামিদা বলছে, আইজকাইলকার পোলাপানে সহাজে পোলাপান হওয়াইতে চায় না। অগো যহন ইচ্ছা অরা হওয়াইবো!
তুমি নূরজাহানরে এই হগল লইয়া কিছু জিগাও নাই।
একদিন জিগাইছিলাম।
কী কয়!
কয় জামাই এত তাড়াতাড়ি পোলাপান চায় না।
তয় ঠিক আছে। আর নূরজাহান কী কয়? জামাই পাইয়া খুশি?
হ খুশি।
খুশি যে হেইডা আমিও বুজি। মাইয়ার মুখ দেখলেই বুজা যায়, জামাইর মুখ দেখলেই বুজা যায়।
ঘরের ওটায় বসে তামাক টানতে টানতে নূরজাহানের সুখী জীবনের কথা ভাইবা বহুত আনন্দে ছিল দবির। হামিদাও ছিল তার মতন আনন্দে। একটা বছর চোখের পলকে যেন কাইটা গেল। চায়ের দোকান দিয়া বেশ গুছাইয়া গাছাইয়া দোকান আর সংসার করছিল রব্বান। এই অবস্থায় হঠাৎ একদিন নাই। নাই তো নাইই। কই যে গেল!
কিছুদিন ধইরা বাবরি চুল রাখছিল, মুখের দাড়িমোচ কামাইতেছিল না। দোকানের দিকে তেমুন মন নাই, নূরজাহানের দিকে তেমুন মন নাই, কেমন জানি উদাস উদাস ভাব। নূরজাহান এক রাইতে তারে ধরল। কী অইছে তোমার?
দোকান বন্ধ কইরা বাড়িতে আসছে রব্বান। নূরজাহানের লগে নিজের ঘরে বইসা রাইতের ভাত খাইছে। বিয়ার পর প্রথম প্রথম রব্বানকে একা একা ভাত খাইতে দিত নূরজাহান। নিজে সামনে বইসা এইটা ওইটা আগায়া দিত, ভাতটা সালুনটা পাতে তুইলা দিত। রব্বান আরাম কইরাই খাইত। তারপর একদিন বলল, আমার একলা একলা ভাত খাইতে ভাল্লাগে না।
নূরজাহান হাইসা বলল, তয় দোকলা পাইবা কই?
রব্বান একটা হাত বাড়াইয়া নূরজাহানের গাল ছুঁইয়া দিল। এই যে আমার দোকলা।
হ আমি তো তোমার দোকলাই।
তয় তুমি আমার লগে বইয়া খাও না ক্যা?
নূরজাহান কীরকম লজ্জা পাইলো। যাহ।
ক্যা অসুবিদা কী?
মাইয়ারা স্বামীর লগে বইয়া খায় না। তাগো সামনে বহাইয়া খাওয়ায়। আমার মায় অহন তরি বাবারে সামনে বহাইয়া খাওয়ায়।
আরে ওইদিন কি আর আছেনি? আইজকাইল বউজামাই একলগে বইয়া খায়। কাইল থিকা তুমি আমার লগে বইয়া খাইবা।
না আমার শরম করবো।
আমার কাছে তোমার কীয়ের শরম?
আমার বেবাক শরমঐত্তো তোমার কাছে। মাইয়ারা সবচাইতে বেশি শরমায় জামাইরে।
আবার সবচাইতে বেশি ভালবাসে জামাইরে।
হেইডা বাসেঐ।
ভালবাসা শব্দটা শোনার লগে লগে সেই মানুষটার কথা পলকের জন্য মনে পড়েছিল নূরজাহানের। মজনু। বিয়ার পর মরনি আম্মার লগে একবার আইছিল নূরজাহানরে দেখতে। রব্বানও সেদিন বাড়িতে। বিকালবেলা। পরনে প্রিন্টের সুন্দর একটা হাওয়াই শার্ট, শ্যাওলার মতন রং এমন প্যান্ট আর পায়ে স্যান্ডেল। দেখতে আরও সুন্দর হইছে। মজনু। সরাসরি মজনুর দিকে তাকাতে কেমন জানি লাগছিল নূরজাহানের। আড়চোখে চাইছিল। আর বুকের ভিতর কেমন করছিল। এই মানুষটার জন্য গোপন এই মন কেমন করা ভাবটা বোধহয় সারাজীবন থাইকা যাইব নূরজাহানের। কত স্বপ্ন তারে নিয়া সে দেখছিল। মরনি আম্মার সংসার হইবো তার সংসার, মরনি আম্মার পোলা হইব তার জামাই। কী স্বপ্ন দেখল আর কী হইল!
মজনুরও মুখে কীরকম বিষাদের গোপন ছায়া ছিল সেদিন। সেও যেন সরাসরি তাকাতে পারছিল না নূরজাহানের দিকে। রব্বানের লগে পরিচয় করাইয়া দিল মরনি। মজনু, এই যে দেখো বাজান নূরজাহানের জামাই। বহুত ভাল পোলা।
মজনু কথা বলে নাই। মৃদু হাসছে। তারপর চা মুড়ি খাইয়া চইলা গেছে। চইলা যাওয়ার সময় নূরজাহান দাঁড়ায়া ছিল বাড়ির নামার দিকে। এমন চোখে একবার নূরজাহানের দিকে তাকাইল মজনু, সেই চাউনিতে যে কী ছিল, নূরজাহানের কলিজাটা পুইড়া গেল। ক্যান যে চোখ ফাইটা আসতে চাইল অব্যক্ত কষ্টের এক কান্না। সেই কান্না সামাল দিয়া বাঁশঝাড়তলার দিকে চইলা গেল সে। লগে দৌড়াইতে দৌড়াইতে গেল ভাদাইম্মা। রব্বান তার আগেই চইলা গেছে দোকানে।
