পারু আগের চেয়েও বেশি শ্লেষের গলায় বলল, তর আবার কইলজাও আছে নি? কচ কী?
পারু!
আমি আর কোনও কথা শুনতে চাই না। তুই যা, বাইর অ আমগো বাড়ি থিকা। এইডা ভদ্রলোকের বাড়ি। তর লেইগা বাড়ি নষ্ট অইতাছে। তুই যতক্ষণ থাকবি এই বাড়ির মানুষ দম নিতে পারবো না। বেবাকতে অস্থির অইয়া গেছে।
এবার আতাহারের গলা ভাইঙা আসল। পারু, পারু আমি তোমার পায়ে ধরি। আমি তোমার কোনও কথার প্রতিবাদ করতাছি না। তুমি আমারে বাঁচাও পারু। আমি তোমার লেইগা মইরা যাইতাছি।
এই খবরদার। তর কথায় আমার গা ঘিনঘিন করতাছে। তুই আমার পায়ে ধরতে চাস হুইনা আমার মনে অইতাছে একটা গুয়ের পোক পায়খানা থিকা আমার পায়ের মিহি আইতাছে। তুই আর কথা কইচ না, তুই যা।
আতাহার কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, আমি বাঁচতে চাই পারু। আমি তোমারে লইয়া, পোলাপান তিনডারে লইয়া বাঁচতে চাই। এক ট্যারিরে আমি বিয়া করছি, ও আমারে কিছুই দিতে পারে না। অর লগে সহবাস কইরা আমি আরাম পাই না। ওর মুখের মিহি চাইলে আমার মিজাজ খারাপ হয়। অর কথা হোনলে গাও জ্বলে। ও আমারে ভাত আইন্না দিলে, চা-নাস্তা দিলে আমার ঘিন্না লাগে। অর শইল্লের গন্ধে অর লগে আমি শুইতে পারি না।
ও এইবার বুজছি! আমার সব্বনাশ কইরা তুই অহন আরেকটা মাইয়ার সব্বনাশ করতে নামছস। টেকাপয়সা সোনাদানা আর নতুন মাইয়া মাইনষের শইল্লের লোভে তুই একটা মাইয়ারে নিজে দেইক্কা পছন্দ কইরা বিয়া করছস। অহন সব পাইয়া তারে আর ভাল্লাগে না। ওই, তরে আমি কী কমু রে? গুয়ের পোক কইলাম, শুয়োরের পো কইলাম, আর কী কওন যায় রে তরে? তরে কওনের মতন খারাপ শব্দঐত্তো বিচড়াইয়া পাইতাছি না আমি। আমি কি বাইর অইয়া তরে মুইড়া পিছাড়াদা পিডামু? না হেইডা করতেও আমার ঘিন্না। লাগবো। তুই যা, তাড়াতাড়ি যা, তাড়াতাড়ি। নইলে কোন শনি তর কপালে ঘটবো আমি বুজতাছি না। তরে আমি বডি (বঁটি) দিয়া কোপ দিয়া কল্লা নামায়া দিতে পারি।
এবার শিশুর ভঙ্গিতে কাঁদতে আরম্ভ করল আতাহার। করো, হেইডা করো। বডি দিয়া কোপ দিয়া আমার কল্লা নামায়া দেও। আমার আর বাঁইচ্চা থাকতে ভাল্লাগে না। তোমারে ছাড়া আমি টিকতে পারতাছি না। বিয়ার আগে এই বুজি নাই। বাসররাইত থিকা বুজছি। তারপর থিকা আমার পাগল পাগল লাগে। কিছু ভাল্লাগে না। আমি মইরা যামু পারু, আমি মইরা যামু। তুমি আমারে বাঁচাও। আল্লারস্তে তুমি আমারে বাঁচাও।
পারু তবু একটুও নরম হল না, একটুও কোমল হল না। আগের মতোই কঠিন গলায় বলল, তোর মুখে আল্লার নাম শোভা পায় না। তুই এই বাড়িতে মরিছ না। তর মতন। গুয়ের পোক বাঁচলেও যা, মরলেও তা। তুই তগো বাইত্তে গিয়া মর। বড় গুয়ের পোকরে প্যাচাইয়া ধইরা মর। পারলে ওইডারে লইয়া মর। তয় আল্লাহপাকের দুনিয়া একটু পাকসাফ হইবো।
তারপরও শেষ চেষ্টা করল আতাহার। পারু, আমি ওই ট্যারিরে তালাক দিমু। তুমি যেমতে যা কইবা তাই করুম। তোমার পায়ে ধরি পারু। আল্লারস্তে আমার কথা শোনো। আমারে মাপ কইরা দেও। লও আবার আমরা দুইজনে আগের লাহান জীবন কাডাই। ওই ট্যারিগো বাড়ির জিনিসপত্র টেকা পয়সা বেবাক আমি ফিরত দিয়া দিমু।
পারু বলল, তর লগে আমার আর কোনও কথা নাই। শেষ কথা হইল তুই অহনঐ এই বাড়ি থিকা বাইর হইয়া যাবি। আর একমিনিটও এই বাড়িতে থাকবি না। আমার মা-বাপে কইছে দেইখা আমি তর লগে কথা কইছি। এরপর তুই এহেনে খাড়াইয়া কানতে কানতে মইরা গেলেও আমার গলা আর হুনবি না।
পারুর ঘরের ছাইছের দিককার বন্ধ জানালায় মাথা ঠেকায়া আতাহার তখন শিশুর মতন কাঁদছে।
.
পরের বছর চৈত্রমাসের মাঝামাঝি একদিন রব্বান উধাও হয়ে গেল।
কিছুদিন ধইরা সেই প্রথম দিককার মতন বাবরি চুল রাখতে শুরু করছিল সে, দাড়িমোচ কামানো ছাইড়া দিছিল। কীরকম উড়নচণ্ডী উড়নচণ্ডী ভাব। ঠিকঠাক মতন চায়ের দোকানটাও চালায় না। সকালবেলা যখন ইচ্ছা গিয়া দোকান খোলে। দুপুরে বিকালে যখন ইচ্ছা দোকান বন্ধ কইরা বাজারের দিকে চইলা যায় আড্ডা চাডামি মারতে। কখনও কখনও বাড়িতে আইসা শুইয়া থাকে। রাবির পোলা বাদলারে রাখছে কর্মচারী। মাসে বেতন দুইশো টাকা আর তিনবেলার খাওয়া। বাদলা চটপট পোলা। বিয়ানবেলা রব্বানের কোনওদিন দোকান খুলতে দেরি হইলে নিজে দৌড়াইয়া আসে গাছির বাড়িতে। রব্বানরে ডাইকা নিয়া যায়। দোকানে গিয়া চা আর বনরুটি নাইলে টোস্ট বিস্কুট দিয়া নাস্তা করে। দুপুরে প্রথমে সে গাছির বাড়িতে আইসা ভাত খাইয়া যায় তারপর আসে রব্বান। গোসল টোসল কইরা ভাত খাইয়া একটুখানি জিরাইয়া তারবাদে আবার যায় দোকানে। সেই ফাঁকে। দোকান চালায় বাদলা। চা ভালই বানাইতে শিখছে। টাকাপয়সার হিসাবও বোঝে। চুরি চামারির অভ্যাস নাই। একটা পয়সাও এদিক ওদিক করে না। সন্ধ্যার দিকে আইয়া রাতের ভাত খাইয়া আবার যায় দোকানে। তারপর যতক্ষণ দোকান খোলা থাকে দোকানে থাকে বাদলা। রব্বানের লগে দোকান বন্ধ কইরা বাড়ি যায়।
এখন এই দিকটায় দিনরাইত বইলা কোনও কথা নাই। রাইতদোফরে মানুষজন থাকে। রাস্তার কাজ ফেরিঘাট তরি চইলা গেছে। মাটি ফালানো শেষ। এখন ইট বিছানের কাজ চলছে একদিকে, আরেক দিকে রোলার চলছে, কার্পেটিং চলছে। রাত আটটা নয়টার দিকে বাদলা গান গাইতে গাইতে বাড়িতে যায়।
