আমি এই ঘরের দরজা জানালা বেবাক ভিতরে থিকা বন্ধ কইরা রাখুম। এই ঘরের ছাইছের মিহি যেই জানালাডা আছে, কলিমরে কইবা বিয়ানবেলা তারে ছাইছের জানালার সামনে আইন্না খাড়া করাইবো। কলিম যাইবো গা। সে জানালার বাইরে থিকা কথা কইবো, ঘরের ভিতরে বন্ধ জানালার সামনে খাড়াইয়া আমি কথা কমু। তারবাদে তোমগো আর চিন্তা নাই। ও যাইবো গা। আর কোনওদিন এইমিহি আইবো না।
রাবেয়া বললেন, ঠিক আছে মা। আমরা ওইভাবেই ব্যবস্থা করুম।
.
কেমুন আছো, পারু?
বন্ধ জানালার দিকে পিঠ দিয়া দাঁড়ায়া আছে পারু। যেন জানালার ফাঁকফোকর দিয়া, ছিদরি মিদরি (ছিদ্রটিদ্র) দিয়াও পারুর মুখ আতাহার দেখতে না পায়। তবে আতাহারের গলা শুইনা ভিতরে ভিতরে কাইপা উঠল পারু। আতাহারের হাতে সিগ্রেট জ্বলছে, সিগ্রেটের গন্ধটাও পাইল পারু। একদিকে আতাহারের গলা, অন্যদিকে তার সিগ্রেটের গন্ধ। ফেলে আসা দিনের একটা রোমাঞ্চ, একটা দোলা পলকের জন্য মনে আর শরীরে লাগল পারুর। তবে পলকেই ভাবটা পারু কাটায়া ফেলল।
তার কথা মতনই মা বাপে কলিমরে দিয়া এই ব্যবস্থা করছে। সকালবেলার নাস্তাপানি খাওয়াইয়া আতাহাররে এই ঘরের ছাইছে, জানালার লগে আইনা খাড়া করাইয়া দিছে কলিম। দিয়া নিজে চইলা গেছে উঠানের দিকে। পারুর তিন পোলাপান নানা নানির লগে আছে বড় ঘরে। কলিম এমনভাবে চোখ রাখছে চারদিকে, তার চোখ ফাঁকি দিয়া এই বাড়ির কেউর লগে আতাহার দেখা করতে পারব না।
তবে পারুর লগে কথা বলার ব্যবস্থা হইছে তাতেই সে খুশি। অন্য কোনওদিকে তার খেয়াল নাই।
আতাহার বলল, তুমি আমার কথা শোনতাছো, পারু?
গলায় নরম, অনুনয়ের সুর। আতাহারের এই সুর কোনওদিন শোনে নাই পারু। তার মধ্যে ছিল গোঁয়ারতুমি, বদরাগী ভাব, উগ্রতা। মায়া মমতা, নম্রতা কোমলতা তার চরিত্রে নাই। প্রেম করার সময়ও সে রুক্ষই থাকত। জীবনে আজ প্রথম তার গলায় নরম সুর শুনছে পারু। পারু টের পাইল তার মন একটু যেন নরম হইতে চায়। মনরে কঠিনভাবে শাসন করল সে। পাটাপুতার মতন কঠিন, ভারী গলায় বলল, কী কইবা কও।
পারু বুঝল তার গলা শুইনা অস্থির হইছে আতাহার। ফুক ফুক কইরা দুইবার সিগ্রেটে টান দিল, সেই আওয়াজ পাইল পারু। ধুমার গন্ধও পাইল।
আতাহার আগের মতনই নরম গলায় বলল, কইতে চাই অনেক কিছু। অনেক কথা।
কেঐর আজাইরা প্যাচাইল শোননের সময় নাই আমার।
আজাইরা প্যাচাইল না। কামের প্যাচাইল।
দেরি করলে কোনও কথাই আমি হুনুম না। যা কওনের তাড়াতাড়ি কও।
আমি তোমার লেইগা বহুত কষ্ট পাইতাছি।
কও কী?
হ।
কষ্ট কারে কয় তোমার মতন মাইনষে হেইডা বোজে?
আগে বুজি নাই। অহন বুজি। অহন সত্যই বুজি।
হুইনা আমি হাসুম না কান্দুম বুজতাছি না।
ক্যা?
কষ্ট তো মানুষ মানুষের লেইগা পায়। তুমি মানুষনি?
তয় আমি কী?
হোনবা কী?
হ হুনুম।
তুমি অইলা পোক। তাও ভাল পোক না। গুয়ের পোক। গুয়ের পোকের লগে মানুষের কথা সাজে না। তোমার ভাগ্যি আমি একটা গুয়ের পেপাকের লগে কথা কইতাছি।
তোমার যা ইচ্ছা কও, তাও আমার কথা হোনো।
আমার কান পরিষ্কার আছে।
পয়লা কথা হইল, আমি তোমার কাছে মাপ চাই।
কীর লেইগা?
আমার ভুলের লেইগা।
কোন ভুল?
বেক জাইন্না বুইজ্জাও ক্যান তুমি প্রশ্ন করতাছো?
না আমি কিছুই বুজি নাই। কীয়ের ভুল?
আমার জীবনের বড় ভুল।
হেইডা কোনডা?
তোমার লগে বেইমানি।
কীয়ের বেইমানি?
পারু, আমি আর কীভাবে কমু?
না না আমি তোমার কথা বুজতাছি না। তুমি একবার কইলা ভুল, আরেকবার কইলা বেইমানি। ভুল করে মানুষে। বেইমানি করে যার ইমান থাকে। আমি তো আগেঐ কইলাম, তুমি তো মানুষই না। যে মানুষঐ না, তার আবার ভুল কী? বেইমানি কী? আজাইরা প্যাচাইল বাদ দেও।
আতাহার কাতর গলায় বলল, বাবার আর আমার বেইমানির লেইগা মা’য় মরছে, তোমারে আমি হারায়া ফালাইছি।
তোমার বাপে তো হইল তোমার থিকাও বড় গুয়ের পোক। আমি ভদ্রলোকের মাইয়া দেইখা আর কিছু কইলাম না। যুদি বকা জানতাম তয় তোমার বাপরে কইতাম শুয়োর। যেই শুয়োর গু খায়, গুয়ের মইদ্যে পইড়া থাকে। আর তুমি হইলা তার পোলা। আমারে দিয়া খারাপ কথা আর কওয়াইয়ো না। তাড়াতাড়ি কথা শেষ কইরা বিদায় হও। তোমার কারণে আমগো বাড়ির পরিবেশ নষ্ট হইয়া গেছে। বাতাসে গুয়ের গন্ধ। বন্ধ ঘরে থাইকাও হেই গন্ধ আমি পাইতাছি।
পারু আমারে তুমি দয়া করো। আমারে তুমি মাপ করো।
তারপর?
আমি তোমারে ফিরায়া নিতে চাই।
কই?
আমগো বাড়িতে?
কীর লেইগা?
আমি তোমারে ভালবাসি। তোমারে বিয়া করুম। আমার পোলাপান তিনডারে বাপের আসল পরিচয় দিমু!
আইচ্ছা!
তারপর আর নিজেরে ধইরা রাখতে পারল না পারু। দাঁতে দাঁত চাইপা বলল, ওই শুয়োরের পো, ভালবাসা কারে কয় তুই জানছ? আর কারে বিয়া করতে চাছ তুই? আমি। হইলাম মানুষ তুই হইলি গুয়ের পোক। গুয়ের পোকের লগে মানুষের বিয়া অয় কেমতে? আর তর পোলাপান তিনডার অর্থ কী? পোলাপান তিনডা তো মানুষের! আমার পোলাপান কোনও শুয়োরের পোর না। এই তুই যা এহেন থিকা যা। আমগো বাড়ি থিকা বাইর অ। নাইলে, আমি দুয়ার খুইল্লা বাইর অমু। মুইড়া পিছা দিয়া পিডাইয়া তরে বাইর করুম।
আতাহার আগের মতোই কাতর গলায় বলল, তাও তুমি বাইর অও। মুইড়া পিছা দিয়া যত ইচ্ছা পিড়াও আমারে। তাও তোমার মুখটা আমি ইট্ট দেহি। তোমারে দেহনের লেইগা। কইলজাড়া আমার ফাইট্টা যাইতাছে।
