কথা বলতে বলতে গলা ভাইঙা আসল আতাহারের।
আফাজউদ্দিন আর রাবেয়া তখন দুইজন দুইজনের দিকে তাকায়া আছেন। কী করবেন না করবেন বুঝতে পারছেন না।
.
পারু কঠিন গলায় বলল, না।
রাত তেমন হয় নাই। নূরিকে রাতের খাবার আর অষুদ খাওয়াইয়া ঘুম পাড়ায়া দিছে শিরি। আতাহার এই বাড়িতে আসার পর থেকে পারুর চেহারা অন্যরকম। নরম কোমল মায়াবী মুখটা পাথর হয়ে আছে। নূরির দিকে ফিরাও তাকায় নাই। মেয়ের জ্বর কমল না বাড়ল কিছুই সে খেয়াল করল না। বোনকে সামাল দিল শিরি। নূরি যখন গভীর ঘুমে আফাজউদ্দিন আর রাবেয়া আইসা ঢুকলেন এই ঘরে। শিরি নসু বই নিয়া বসছে। রাতের খাওয়াদাওয়া এখনও কারও হয় নাই। বাড়ির পরিবেশটাই বদলাইয়া গেছে।
আফাজউদ্দিন আর রাবেয়া এই ঘরে আসার আগে পারু নসুকে জিজ্ঞাসা করেছিল, তরে সে দেখছে? তুই অর সামনে গেছিলি?
না মা। তারে দূর থিকা দেইখাই আমি দৌড়াইয়া আইয়া তোমারে কইছি। তারবাদে খেলতে গেছি গা। সন্ধ্যার সময় আইসা এই ঘরে ঢুকছি। সেও আমারে দেহে নাই আমিও তারে দেহি নাই। আর তুমি না আমারে না করলা!
হ। আমি চাই সে য্যান তগো কেরে না দেখে। তরা কেঐ য্যান তারে না দেখছ।
আইচ্ছা।
নসুও বোধহয় শিরির মতন ভিতরে ভিতরে বুঝতে পারে আতাহার কাকার ওপর বিরাট রাগ মা’র। মা’র কথার বাইরে তারা যাইব না।
আফাজউদ্দিন আর রাবেয়া আইসা ঢোকার পর হারিকেনের আলোয় প্রথমে তারা ঘুমন্ত নূরিকে দেখল তারপর শিরি নসুকে বলল, মরিয়মরে গিয়া ক, তগো ভাত দিতে।
ওরা দুইজন বের হবে, পারু বলল, সাবধান, কইছি ওইভাবে চলবি।
দুই ছেলেমেয়ে একলগে বলল, আইচ্ছা মা।
রাবেয়া মেয়ের মন জানেন। বললেন, না, আতাহারের লগে অগো দেখা হইবো না। ও আছে বাংলাঘরে। রান্নঘর থিকা বাংলাঘর অনেকখানি দূরে। আর ওইদিকে কলিম আছে। ভিতর বাড়ির দিকে সে আসতে চাইলে কলিম আইসা খবর দিবো।
কেমতে বুজলা?
তর বাপে আর আমি তারে কইছি আমগো না বইলা, কলিমরে দিয়া খবর না দিয়া সে য্যান ভিতর বাড়ির দিকে না আসে।
পারু কথা বলল না।
আফাজউদ্দিন বললেন, তরে দুই-চাইরড়া কথা কইতে আইলাম মা।
হেইডা তোমগো দুইজনরে দেইখাই আমি বুজছি। তয় এমুন কোনও কথা কইবা না। যেইডা আমি হুনুম না।
রাবেয়া বললেন, আগে তর বাপের কথা হোন মা।
তারপর স্বামীর দিকে তাকালেন তিনি। কন, আপনে যা কইতে চান কন।
আতাহার কীভাবে তাঁদের পা প্যাচাইয়া ধরল, কী বলল সবই পারুকে বললেন তিনি। শুইনা পারু ওই কথাটা বলল, না।
তয় শয়তানডা তো বহুত জ্বালাইবো। যুদি বাইত্তে বইয়া থাকে অরে খেদামু কেমতে? ও তো বিরাট গোঁয়ার।
কাইল বিয়ানে মুইড়া পিছা দিয়া পিডাইয়া খেদাইয়া দেও। কুত্তা যেমতে খেদায় অমতে খেদাও।
এইডা কি আমগো মতন মাইনষে পারে মা? মাইনষে কইবো কী? ও যেই পদের পোলা দেহা গেলো গেরামের মাইনষেগো ডাইকা ডাইকা তর নামে আকথা কুকথা কইয়া গেল।
পারু একটু চমকাল। হ এইডা ও কইতে পারে। ও আর অর বাপে পারে না এমুন কাম দুনিয়াতে নাই।
রাবেয়া বললেন, তয় বুদ্ধি কইরা অরে খেদানঐ ভাল। নাইলে মান ইজ্জত মাইরা দিয়া যাইতে পারে শয়তানডায়।
কিন্তু আমি অরে আমার মুখ দেহামু না। অর সামনে আমি যাইতে পারুম না। অর মুখের মিহি চাইলে ওই যে অগো গেরামের নূরজাহান অর বাপের মুখে যেমতে ছ্যাপ দিছিল হেইডা অর মুখে আমি দিমু। স্যান্ডেল সোন্ডেল দিয়া বাড়িও দিতে পারি।
রাবেয়া আফাজউদ্দিনের দিকে তাকালেন। কী করবেন এই অবস্থায়। বিরাট ভেজালে পড়ছেন তো?
আফাজউদ্দিন গম্ভীর প্রকৃতির, চিন্তাশীল মানুষ। বললেন, অন্য কোনও ভাবে অর লগে কথা কইয়া অরে বিদায় করতে পারছনি মা?
কোনভাবে?
হেইডা আমি বুজতাছি না। আমার মাথায় এই হগল আহে না।
পারু কাতর গলায় বলল, বাবা, অর লগে কেমতে কথা কমু আমি কও তো! মানুষের লগে মানুষে কথা কয়, গুয়ের পোকের লগে মানুষে কথা কয় কেমতে?
একটু আমগো মুখের মিহি চা মা। এই ঝামেলার হাত থিকা বাঁচা। মান ইজ্জত লইয়া তো গেরামে থাকন লাগবো না কি?
পারু ভাল রকম চিন্তায় পইড়া গেল। মেদিনমণ্ডল গ্রামের অনেকে তার আর আতাহারের সম্পর্কের কথা জানে। পোলাপানের কথা জানে, বিয়াশাদি হওয়ার কথা ছিল তাও জানে। বেসনালের কেউ ওইসব জানে না। আতাহার যুদি ওইসব কথা গ্রামের লোকজনরে বইলা যায় তয় মান ইজ্জত সত্যই যাইব। পারুর থেকে ক্ষতি বেশি হইব পোলাপান তিনটার। শিরি নসু স্কুলে পড়ে। গ্রামের পোলাপানরা একটু বেশি পাকনা হয়। স্কুলে ওইসব নিয়া কথা বললে শিরি নসু শরমে স্কুলে যাইতে পারব না। মেদিনমণ্ডলে তো মান্নান মাওলানা আর আতাহারের ডরে কেঐ মুখ খোলে নাই। এই গ্রামে তো আর মান্নান মাওলানা নাই, আতাহার নাই।
শেষ তরি একটা বুদ্ধি বাইর করল পারু। একটা কাম করন যায় বাবা।
আফাজউদ্দিন উৎসাহী হলেন। কী কাম মা?
আমি অর লগে কথা কমু। তয় এই ঘরের দুয়ার জানালা বেবাক ভিতর থিকা বন্ধ থাকবো। পোলাপান তিনডারে পাডাইয়া দিবা তোমগো ঘরে। ওই ঘরে য্যান সে যাইতে না পারে, উক্কি (উঁকি) দিতে না পারে। দরকার হইলে দুয়ার বাইরে থিকা তালা দিয়া রাখবা। আমার পোলাপানের মুখ ও য্যান দেখতে না পারে, আমার পোলাপানে য্যান দেখতে না পারে অর মুখ।
ঠিক আছে। ওই ব্যবস্থা করুম নে। তয় তুই কথা কবি কেমতে?
