আতাহার বিনীত ভঙ্গিতে তাঁর পায়ে হাত দিয়া কদমবুসি করল। আসলাম ইকটু দরকারে। আপনেরা ভাল আছেন তালুইসাব?
হ আছি। ভালই আছি। তয় তুমি জামাকাপড় বদলাও, এই ফাঁকে আমিও আছরের নামাজটা পড়ি তারবাদে কথা কমু নে।
জি আইচ্ছা।
আধাঘণ্টাখানিক পর আফাজউদ্দিন আর পারুর মা রাবেয়া খাতুন আইসা বাংলাঘরে ঢুকলেন। ততক্ষণে জামাকাপড় বদলাইয়া হাতমুখ ধুইয়া, নাস্তাপানি খাওয়া শেষ করছে আতাহার। এই ফাঁকে তাকে খাঁটি গাওয়া ঘি দিয়া পরোটা আর সুজির হালুয়া বানাইয়া দিছে কাজের ঝি মরিয়ম। এককাপ চা বানাইয়া দিছে। আফাজউদ্দিন আর রাবেয়া আইসা যখন ঢুকলেন আতাহার তখন চা প্রায় শেষ করেছে। এখন সিগ্রেট ধরাবার তালে ছিল। তালুই মাএঁকে দেইখা সিগ্রেটের আশা বাদ দিল। চায়ের কাপ নামাইয়া বিনয়ী ভঙ্গিতে মাথা নিচা করল।
এই ঘরে একটা খাট আছে। খাটে সব সময়ই তোশকের ওপর সুন্দর চাদর বিছানো। জোড়া বালিশ আছে সুন্দর গিলাপ দেওয়া। টিনের বেড়ায় সুতার কাজ করা সুন্দর সুন্দর ছবি। একটা হরিণের ছবির তলায় সুতার বেঁকা বেঁকা হরফে লেখা ‘সোনার হরিণ কোন বনেতে থাকো। একটা টেবিল আছে ঘরে। গোটা চারেক চেয়ার আছে। একটা চেয়ারে বইসা টেবিলের ওপর খাবার রাইখা খাইতেছিল আতাহার। খালি চায়ের কাপ সেই টেবিলেই রাখল।
আফাজউদ্দিন বললেন, এইবার বলো দেখি কী মনে কইরা আইছো?
আতাহার মাথা নিচা কইরা বলল, ভাবিরে লইয়া যাইতে আইছি।
কই?
আমগো বাড়িতে।
রাবেয়া গম্ভীর গলায় বললেন, কীর লেইগা?
সে আমার বড়ভাইর বউ। আমার ভাবি। পোলাপান তিনটা আমার ভাইস্তা ভাস্তি। আমগো জাগাসম্পত্তির অংশীদার অরাও। ভাই মইরা গেছে, অগো ভরণপোষণের দায়িত্ব তো আমগো। এর লেইগা আমি…
আফাজউদ্দিন বললেন, অর্থহীন কথা।
আতাহার তার দিকে তাকালো। জে?
পারু এই বাড়িতে আইছে শাওন মাসে। তারবাদে অনেক ঘটনা ঘইটা গেছে তোমগো বাড়িতে। তোমার বিয়াশাদি…। যাউকগা, এত কথা আমি তোমারে বলতে চাই না। তোমার বিয়ার সময় মদিনার জামাই আইছিল দাওয়াত দিতে, তারে আমরা পরিষ্কার বইলা দিছি, পারু নিজেও বলছে সে আর কোনওদিন তোমগো বাড়িতে ফিরত যাইবো না। ওই জাগাসম্পত্তি অর পোলাপান কোনওদিন দাবি করবো না। পারুর জীবনে মেদিনমণ্ডল গ্রামের কোনও কিছু আর নাই।
রাবেয়া বললেন, এই যে এতগুলি দিন গেল, তুমি কোনওদিন আইলা না ক্যা? আইয়া কইলা না ক্যা পারুরে তুমি লইয়া যাইতে চাও? আর ঘটনা তো তোমারে কওনের কিছু নাই। বেবাক ঘটনা তো আসলে তোমারে লইয়াঐ। আমার মাইয়ার লগে এই বেইমানিডা তুমি ক্যান করছো? এতকিছু কইরা কোন মুখে তুমি আইজ আমগো বাড়িতে আইছো? কোন মুখে এই হগল কথা কইতাছো? সব শেষ কইরা আইজ এতদিন বাদে পুরানা ঘায়ে নুন ছিডাইতে আইছো? আমার মাইয়া কোনওদিন তোমগো বাড়িতে যাইবো না। তোমগো পরিচয়ও কোনওদিন দিবো না। ওই দিককার সবকিছু সে শেষ কইরা দিছে। সে এখন নতুন কইরা পোলাপান লইয়া সংসার গুছাইছে। আমার ছেলেমেয়েরা তাগো বইনরে দেখবো। এমুন কথাও পারুর ভাইবইনরা পারুরে কইছে, দরকার হইলে তাগো যার যার ভাগের সম্পত্তি সব তারা পারুরে, পারুর পোলাপানরে দিয়া দিবো। পারুর কোনও অভাব থাকবো না। পোলাপান তিনডারে লেখাপড়া শিখাইয়া মানুষ করুম আমরা। অগো লইয়া তোমগো আর চিন্তা করনের কাম নাই।
আতাহার মাথা নিচা কইরা রইল।
আফাজউদ্দিন বললেন, তোমারে কি তোমার বাপে পাঠাইছে না তুমি নিজে থিকাই আইছো?
আমি নিজে থিকাই আইছি। বাবায় জানে না যে আমি বেসনাল আইছি।
আর তোমার বউ?
সেও জানে না।
এই আসনডা তোমার ঠিক হয় নাই।
রাবেয়া বললেন, পারুর দিক ছাড়াও তোমরা আমগো দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আত্মীয় বাড়িতে আত্মীয় আইতেই পারে। আইছো যহন থাকো আইজকার রাইত। খাওয়াদাওয়া করো। কাইল চইলা যাইয়ো।
আতাহার মাথা নিচা কইরাই বলল, আমি ইকটু পারুর লগে দেখা করতে চাই। কথা কইতে চাই।
পারু তোমার লগে দেখা করবো না, কথা কইবো না।
আতাহার ছেলেমানুষের মতন গোঁয়ার গলায় বলল, আমি তার লগে দেখা না কইরা, কথা না কইয়া এই বাড়ি থিকা যামু না।
আফাজউদ্দিন বললেন, এইসব কইয়ো না। পারু বহুত নরম মাইয়া। তয় একবার যুদি কোনও জিদ ধরে ওই জিদ কেউ ভাঙতে পারবো না। তুমি যত চেষ্টাই করো, পারু তোমার লগে দেখা করবো না, কথা কইবো না।
তয় আমি এই বাড়ি থিকা যামুও না। তার লগে আমার দেখা করতেই হইব, কথা কইতেই হইব।
রাবেয়া আফাজউদ্দিনের দিকে তাকালেন। এইডা কেমুন কথা? একজন মানুষ তোমার লগে দেখা করবো না, কথা বলবো না, তাও তুমি জোর করতাছো? এইডা তো কোনও কথা হইল না।
আতাহার হঠাৎ করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল, তারপর নিচা হয়ে বইসা দুই হাতে আফাজউদ্দিনের পা প্যাচাইয়া ধরল। আমি আপনের পায়ে ধরি। পারুর লগে আমি খালি ইকটু দেখা করুম, দুই-চাইরটা কথা তার লগে কমু। তারপর আর এক মিনিট এই বাড়িতে
আমি থাকুম না। লগে লগে চইলা যামু।
আফাজউদ্দিনের পা ছাইড়া রাবেয়ার পা প্যাচাইয়া ধরল আতাহার। আপনেরা আমারে দয়া করেন। আমার বহুত বড় ভুল হইয়া গেছে। আমি সেই ভুলের ক্ষমা চাইতে আইছি পারুর কাছে। আমি তার কাছে মাপ চাইয়াঐ চইলা যামু। আর কিছু না। আপনেরা আমার মা-বাপের মতন। আমারে দয়া করেন। আল্লারস্তে দয়া করেন।
