এই ঘরে পুরানা আমলের খাট। সেই খাটে নূরির মাথার কাছে বইসা আছে পারু। তার একপাশে শিরি। দুইজনের মুখই গম্ভীর। পারুর মা আইসা ঘরে ঢোকার পর পারু বলল, মা, তোমারে সোজা দুই একখান কথা কই। ও ক্যান এই বাইত্তে আইছে আমি বুজছি। আইছে আমার লগে কথা কইতে। আমি অর লগে কথা কমু না, আমার মুখও ওরে দেহামু না। তোমরা যা করনের এইডা মনে কইরা করবা। তোমগো উচিত অরে অহনঐ বাইত থিকা বাইর কইরা দেওয়া। তয় সেইটা পারবা না। অরা তোমগো আত্মীয়। ঠিক আছে আত্মীয়র লগে যা ব্যবহার করনের করবা, খালি আমার কথা মনে রাখবা। আমি যা কইলাম আমার ব্যাপারে ওইটাই হইবো। আমি অর লগে কথা কমু না, অর মুখ দেখুম না।
মা বললেন, এতদূর থিকা কষ্ট কইরা আইছে। কী মনে কইরা আইছে হেইডা হোন। কথা কইতে দোষ কী!
পারু কঠিন চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। সব জাইনা শুইনাও তুমি আমারে কও অর লগে কথা কইতে, অর মুখ দেখতে? তোমগো ঘিন্নাপিত্তি কিছু নাই, নাকি! ও তো মানুষ না। ও তো একহান গুয়ের পোক। ও এক পোক অর বাপে আরেক পোক। তোমগো তো উচিত অরে অহনঐ পিছা দিয়া পিডাইয়া বাড়িত থিকা বাইর কইরা দেওন। আমি জানি। সেইটা সম্ভব না। তোমরা পারবা না। তয় আমি যেইডা কইলাম, ওইডা মনে রাইখো। আমি দুয়ার আটকাইয়া এই ঘরে বইয়া রইলাম।
শিরির দিকে তাকাল পারু। কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই শিরি বলল, আমিও তোমার লগে এই ঘরে দুয়ার বন্দ কইরা বইয়া থাকুম। আমিও চাই না সে আমারে দেখুক, আমার লগে কথা কউক।
মেয়ের কথা শুইনা পারু অবাক। কচ কী?
ঠিকঐ কই। যে আমার মা’র লগে বেইমানি করছে, অমুন শয়তান বদমাইশের মুখ আমি দেহি না। তুমি নসুরে না করলা আর আমারে কিছু কইলা না দেইখা আমিঐ আমার কথা কইলাম।
মেয়ের কথায় মনটা ভাল লাগল পারুর।
নানির দিকে তাকাল শিরি। তুমি যাও নানি। আমি দুয়ার লাগামু।
পারুর মা চিন্তিত মুখে দরজার দিকে আগায়া গেলেন।
এখন বাড়িতে লোকজন কম। আফাজউদ্দিন আছেন। তাঁর বয়স হয়েছে। এখন আর ছেলেদের সঙ্গে কায়কারবার করেন না। ছেলেরাও বরিশাল পটুয়াখালির ওই নৌকায় কইরা হাটে হাটে গিয়া কাটা কাপড় বিক্রির কাজ করে না। ঢাকার সদরঘাটে থান কাপড়ের দোকান দিছে রফু আর কামরুল, কামু। দুই ভাইয়ের আলাদা দোকান। তারা ঢাকায়ই বাসাবাড়ি নিয়া থাকে। দুইজনই বিয়াশাদি করছে। ছোট মিজু সাত বছর ছিল সৌদি আরবে। ফিরা আইসা সেও ভাইদের লগে নতুন একটা থান কাপড়ের দোকান করছে। ঢাকায় তিনভাই এক বাসায় থাকে। পারুর খবর পাইয়া সবাই বাড়িতে আসছিল। দুই চাইরদিন থাইকা, সবাই মিলা পারুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়া যে যার মতন ফিরা গেছে। তবে পারুর দায়িত্ব যে সব ভাইবোনের, পারুর ছেলেমেয়েদের দায়িত্বও যে তারা নিজেদের পোলাপানের মতনই পালন করব, মাসে মাসে কোন ভাই কত টাকা দিবে পারুরে, বড়বোন মোরশেদা দিব কত সব ঠিকঠাক কইরা, পারুরে অনেক সাহস ভরসা দিয়া গেছে তারা। ভরসা মতন মাসকাবারি টাকাপয়সা সব ঠিকঠাক মতনই দিচ্ছে। টাকাপয়সা পারুর হাতে পুরাটাই জমছে। তার তো আসলে কোনও খরচা নাই। খাওয়াদাওয়া সবই তো বাবার সংসারে। আছে সে ভালই।
এই ভাল অবস্থায় ও গুয়ের পোকটা আইসা ক্যান হাজির হইল?
শিরি ততক্ষণে দুয়ার আটকাইয়া দিছে। মাথায় পানি দেওয়ার ফলে নূরি একটু আরাম পাইছে। জ্বরের তাপ কমের দিকে। দুপুরে খাওয়ার পর ট্যাবলেট খাইছে। এখন চোখ বুজে পইড়া আছে মেয়েটা। মা বোন দুইজন দুইপাশে বইসা আছে।
ঘরের দরজা জানালা বন্ধের ফলে আবছা অন্ধকারে ভরে আছে ঘর। পারু আর শিরি গম্ভীর মুখে খাটে পা ঝুলাইয়া বইসা রইল।
.
আতাহারকে বাংলাঘরে বসানো হয়েছে। বাড়ির পুরানা কাজের লোক কলিম তারে বসাইছে। নসু সেই যে দৌড়াইয়া আইসা পারুরে খবরটা দিছিল তারপর সে জানি কোনদিকে উধাও হইয়া গেছে। মনে হয় হাওলাদার বাড়ির পোলাপানের লগে মাঠে খেলতে চইলা গেছে। আতাহাররে দেইখা যতটা উত্তেজিত হইছিল, পারুর কথাবার্তা শুইনা আতাহারের ব্যাপারে আর কোনও উৎসাহ দেখায় নাই। নিজের কাজে চইলা গেছে।
আতাহারের চেহারা উদভ্রান্তের মতন। জিনস টি-শার্ট কেডস পরা, কাঁধে কালো রঙের ব্যাগ। হালকা হলুদ রঙের টি-শার্ট আর জিন্স কেডস ধুলায় ভরে আছে। মুখে কয়েকদিনের দাড়িমোচ। বাংলাঘরে ঢুইকা কাঁধের ব্যাগ খাটের ওপর রাখল, তারপর একটা চেয়ারে বসে ক্লান্তির শ্বাস ফেলল।
কলিম বলল, ব্যাগে লুঙ্গিমুঙ্গি আছে, নাকি দিমু?
না না আছে।
তয় জামাকাপড় ছাড়েন। ছাইড়া চাপকলতলায় গিয়া ভাল কইরা হাতমুখ ধোন।
ধুইতাছি, ধুইতাছি। ইট্টু জিরাইয়া লই।
আইলেন কই থিকা? ঢাকা থিকানি?
আরে না, মেদিনমণ্ডল থিকা।
এতদূর থিকা কেমতে আইলেন?
বিক্রমপুরের ভিতরে ভিতরে দিয়া ম্যালা রাস্তা হইছে। কোনও কোনও রাস্তায় রিকশা পাওয়া যায়। কোনও কোনও রাস্তায় হাঁটতে হয়। আমি কোনাকুনি আইছি, চক পাড়ি দিয়া।
তয় তো হাঁটতে হইছে ম্যালা?
হ। হাঁইটাই আইছি বেশির ভাগ রাস্তা।
তারপর আফাজউদ্দিন সাহেব আসলেন বাংলাঘরে। তার পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর সাদার ওপর হালকা সবুজ ডোরাকাটা পরিষ্কার লুঙ্গি। মুখের দাড়ি সবই পাকা। মাথায় টুপি আছে।
গম্ভীর গলায় বললেন, কী সংবাদ আতাহার? হঠাৎ আমগো বাড়িতে?
