থো ডো, জব কইরা হালাইবো! আমার বাপে আমার থিকাও বড় জালেম। তুই বুজবি না, আমি বুজি। অহন যা, যা যা কইলাম কইরা আয়। তারবাদে আমার মাথাডা ইট্টু বানাই দিবি। বেদনা করতাছে। মদ খাইয়া অরঘুমা আছিলাম তো, এর লেইগা।
আপনে অরঘুমা আছিলেন আর আপনের লগে বইয়া খাইলো কনটেকদার সাবে হেয় দিহি ঘুমাইতাছে?
হেয় আর আমি এক না। আমি ইট্টু বেশি খাই। কেঐ মদ খায় ঘুমানের লেইগা কেঐ খায় জাইগগা থাকনের লেইগা, প্যাচাইল পারনের লেইগা। আমি খাইয়া দাইয়া ইট্টু জাইগগা থাকি, ইট্টু প্যাচাইল পোচাইল পারি।
নিঃশব্দে হাসল আতাহার।
তাকে হাসতে দেখে কাশেমও হাসল। হ এইডা আইজ বোজলাম। এত প্যাচাইল আমার লগে কোনওদিন পারেন নাই আপনে। অহনতরি মনে অয় নিশা কাডে নাই আপনের।
আতাহার কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই হন হন করে হেঁটে মজনু এসে উঠল বাড়িতে। আতাহারের সামনে এসে দাঁড়াল। হুজুর বাইত্তে আছে না?
চোখ ঢুলু ঢুলু করে মজনুর দিকে তাকাল আতাহার। হুজুরডা জানি কেডা?
মজনু থতমত খেল তারপর হেসে ফেলল। ফাইজলামি কইরেন না দাদা। আছেনি কন, বহুত দরকার।
আছে।
কো?
নিজেকে দেখিয়ে আতাহার বলল, এই যে!
মজনু কথা বলবার আগেই কাশেম বলল, কী শুরু করলেন মিয়াবাই! মাইনষে কইবো কী!
কাশেমের দিকে তাকিয়ে মজনু বলল, হুজুর যুদি বাইত্তে থাকে তারে আপনে ইট্টু খবর দেন। কন ছনুবুড়ি মইরা গেছে তার জানাজা পড়তে যাওন লাগবো। আমি তারে নিতে আইছি।
হঠাৎ করে মৃত্যু সংবাদ আশা করেনি কেউ। কাশেম এবং আতাহার দুজনেই থতমত খেয়ে গেল। আতাহার তাকিয়ে রইল মজনুর মুখের দিকে আর কাশেম দিশাহারা গলায় বলল, কও কী! কুনসুম মরলো?
মজনু কথা বলবার আগেই খরমে চটর পটর শব্দ তুলে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন মান্নান মাওলানা। বিনীতভাবে তাকে সালাম দিল মজনু। আসোলামালাইকুম।
সালামের জবাব দিলেন না তিনি। গম্ভীর গলায় বললেন, কেডা মরছে?
ছনুবুড়ি।
মান্নান মাওলানা ভুরু কুঁচকালেন। ঐ চুন্নি! ভাল অইছে। একটা খারাপ জিনিস গেছে।
এতক্ষণ ধরে বসে থাকা আতাহার উঠে দাঁড়িয়েছে কিন্তু মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাচ্ছে না। যেন তাকালেই তার লালচোখ দেখে যা বোঝার বুঝে যাবেন বাবা। কথা বললে মুখের গন্ধে উদিস পেয়ে যাবেন তার নেশার কথা। কায়দা করে মুখ লুকিয়ে বাংলাঘরের দিকে চলে গেল আতাহার। যাওয়ার আগে ইশারা করে গেল কাশেমকে। সেই ইশারা পাত্তা দিল না কাশেম। হঠাৎ করেই বাড়ির নামার দিকে দৌড় দিল। দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, ছনুবুজি মইরা গেছে, যাই তারে ইউ শেষ দেহা দেইক্কাহি।
কাশেমের দৌড় দেখে রাগে গা জ্বলে গেল আতাহারের। ঘরে মেজবান আছে, এখনই ঘুম ভাঙবে তার। তারপর কত কাজ, এসব এখন কে করবে!
দাঁতে দাঁত চেপে কাশেমকে একটা বকা দিল আতাহার। বাইত আহো বউয়ার পো, শেষ দেহা তোমারে দেহামু নে।
কিন্তু কাশেম আতাহার কারও দিকেই তখন মন নাই মান্নান মাওলানার। মজনুর দিকেও তাকালেন না তিনি। কোন ফাঁকে পানজাবির জেল থেকে ছোট্ট কাঁকুই বের করেছেন। এখন কাঁকুই দিয়ে দাঁড়ি আঁচড়াচ্ছেন। চোখে বদদৃষ্টি। সেই দৃষ্টি নাড়ার পালার দিকে ফেলে বললেন, কেমতে মরলো?
মজনু বিনীত গলায় ঘটনা বলল। শুনে শিয়ালের মতো খ্যাক করে উঠলেন তিনি। কী আত্মহত্যা করতাছে? মাইট্টাতেল খাইছে
মজনু বলল, মনে অয় ইচ্ছা কইরা খায় নাই। তিয়াস লাগছিল, পানি মনে কইরা খাইছে।
যেমতেই খাউক, খাইছে তো! এইডা আত্মহত্যাঐ। ঐ বাইত্তে আমি যামু না। একে চোর দুইয়ে আত্মহত্যা, এই রকম মুদ্দারের জানাজা অয় না।
কথাটা বুঝতে পারল না মজনু। অবাক হয়ে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাল। তয়?
তয় আবার কী? জানাজা অইবো না।
জানাজা না অইলে মাডি দিবো কেমতে
মাডি দিবো না।
কন কী!
হ।
মুদ্দার লইয়া তইলে কী করবো?
কাথা কাপড়ে প্যাচাইয়া মড়কখোলায় (গৃহপালিত মৃত জীব যে স্থানে ফেলে) হালাইয়া দিবো! গরু বরকি (ছাগল) মরলে যেমতে হালায়! কাউয়া চিলে ঠোকরাইয়া ঠোকরাইয়া খাইবো, হকুনে খাইবো, শিয়াল কুত্তায়ও খাইতে পারে। আর নাইলে গাঙ্গে হালায় দিবো। মাছে খাইবো, কাউট্টা কাছিমে খাইবো। এই মুদ্দার মাডিতে লইবো না। গোড় দিলে হায় হায় রব করবো মাডি। যেই মাওলানা জানাজা পড়বো তার গুণা অইবো। সইত্তর হাজার বচ্ছর জ্বলন লাগবো দোজকের আশুনে। জাইন্না হুইন্না এই কাম আমি করতে পারুম না।
কোনও মুর্দারের যে মাটি হয় না, জানাজা হয় না একথা জীবনে প্রথম শুনল মজনু। আগামাথা কিছুই বুঝল না, আগের মতোই অবাক হয়ে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আড়চোখে মজনুকে একবার দেখে দাঁড়ি আঁচড়ানোর কাঁকুই জেবে রেখে অন্য জেব থেকে জামরুল রঙের তসবি বের করলেন মান্নান মাওলানা, তসবি জপতে জপতে কেরাতের সুরে বললেন, আল্লাপাক বলেছেন, হে আমার পেয়ারে বান্দা, হে মোমিন মোসলমান, তোমরা চুরি করিও না, জেনা করিও না। যুদি করো আমার কোনও মুসল্লি, কোনও পরহেজগার বান্দা তোমার জানাজা পড়াইবে না, জানাজায় শরিক হইবে না। আমার দুইন্নাইতে তোমার জইন্য কোনও কবর নাই আমার মাডি তোমারে জাগা দিবো না। ক সোবানাল্লা, সোবানাল্লা।
সোবাহানআল্লাহ বলল না মজনু। চিন্তিত গলায় বলল, মোতালেব কাকায় যে তাইলে কাফোন আনতে গেল, মতলা গেল বাঁশ কাটতে, আলফু গেল কবর খোদতে। হেরা কি এই হগল জানে না ?
