পারু বাপের বাড়িতে আসছিল পয়সা থেকে তার মাজারো বইন নাহাররে নিয়া। নাহারের জামাইবাড়িতে ছিল পাঁচদিন। সেই পাঁচদিনে বিবাহিত জীবনের সব কথাই বোনকে সে খুইলা বলছিল। নাহার তো কিছুটা জানতই, যা না জানত পারু তা সবই বলছে। শেষ তরি শাশুড়িরে মুখ ফুইটা বলা, আতাহারের লগে বিয়ার কথাবার্তা, মান্নান মাওলানা আর আতাহারের বেইমানি, শাশুড়ির মৃত্যু, তারপর সবকথা কীভাবে তার কানে আসল সব নাহারকে সে বলল। পোলাপান লইয়া না খাইয়া মইরা গেলেও আর কোনওদিন ওই বাড়িতে ফিরত যাইবো না তাও সাফ সাফ বলল।
নাহাররে নিয়া বাপের বাড়িতে আসার পরও ওই একই কথা বাপ-মা’রে বলছে পারু। ভাই রফু কামরুল একদম ছোট মিজু বাড়িতে ছিল, তাদেরও বলছে। খবর পাইয়া ছোটবোন গোলাপি তার জামাই নিয়া আসছে নূরপুর থেকে। নাহারের লগে আসছিল নাহারের জামাই। হাকিম আর তাদের দুই পোলা মাইয়া। রাজা আর বইচি।
পারু এই বাড়ির সাইজ্জা মাইয়া। আদরের মাইয়া। খুবই নরম কোমল মাইয়া। ভাল মনের মাইয়া। সে আইসা যখন বেবাক কথা বলল, শুইনা বাড়ির লোকে বলল কঠিন দুঃখ না পাইলে এইভাবে মাইয়া চইলা আসে নাই। জামাই মইরা যাওনের পরও যেই মাইয়া বাপের বাড়িতে আসার কথা ভাবে নাই, সে কোন দুঃখে এতদিন পর আসছে, আর ফিরত যাবে না বলছে, সেই ব্যাপারটা সবাই বুঝছে। এই নিয়া কেউ কোনও কথা প্রথম কয়েকদিন বলে নাই। তারপর একদিন বলছে। বলছে পারুর বাপ আফাজউদ্দিন। ঠিক আছে। পারুর আর ফিরত যাওনের কাম নাই। সে এই বাড়িতেই থাকবো। পোলাপান মানুষ করার দায়িত্ব পারুর বাপ যতদিন আছে ততদিন তার, তিনি মারা যাওয়ার পর দায়িত্ব নিবে ভাইরা। বোনরা যে যতটা পারে সাহায্য করবে।
পারুর মাজারো ভাই কামরুল অবশ্য জাগাসম্পত্তির কথা তুলছিল। শিরি নসুরা তার বাপের সম্পত্তি থেকে কেন বঞ্চিত হবে? পারু ওই বাড়িতে আর যাউক না যাউক দরকার হইলে আমরা যাই। মান্নান মাওলানার লগে কথাবার্তি কইয়া টেকাপয়সা কিছু আদায় করি।
পারু কঠিন গলায় বলেছে, না, ওই পাপের সম্পিত্তি আমি আমার পোলাপানরে খাইতে দিমু না। ওই বাড়ির লগে যে আমগো কোনও সম্পর্ক আছে ওইডাই আমি আর স্বীকার করুম না।
পারুর বাপ মা ভাই বইনরা, সবাই পারুর মনোভাবটা বুঝতে পারছিল। শেষ তরি তারা বেবাকতে একসময় বলছে, না ঠিক আছে। অর মন যখন এমতে উইঠা গেছে ঐ বাড়ির উপরে থিকা তয় অরে আর জোর করনের কাম নাই। ও এই বাড়িতেই থাকবো।
উঠানের উত্তর দিকে মাঝারি সাইজের একটা পাটাতন ঘর। সেই ঘরটা খালিই পইড়া থাকে। পারুকে সেই ঘর দেওয়া হল। তিন পোলাপান নিয়া সেই ঘরে থাকে সে। রান্নাবান্না বাড়ির কাজ মায়ের লগে সবই করে। শিরি নসুরে স্কুলেও ভরতি করা হইছে। এর মধ্যে আতাহারের বিয়ার খবরও পাইছে। দাওয়াত দিতে মদিনার জামাইরে এই বাড়িতে পাঠাইছিলেন মান্নান মাওলানা। আত্মীয় মানুষ। সমাদর যেটুকু করার তাকে করা হইছে, তবে বিয়াতে কেউ যায় নাই।
যেই বাড়িতে একদিন জন্মাইছিল পারু, বড় হইছিল, বিয়ার পর যেই বাড়ি ছাইড়া একদিন চইলা গেছিল, সেই বাড়িতে ফিরা আইসা আবার নতুন কইরা জীবন শুরু করল। আগে ছিল একা, এখন তার লগে আছে তিনটা পোলাপান। মাঝখানকার জীবনটা আনন্দময়ই ছিল। শেষ তরি সেই জীবন হইয়া গেল দুঃখের জীবন। বেদনা আর কষ্টের জীবন। নিজের ওপর আর দুইজন মানুষের ওপর ঘৃণার জীবন।
তবু বাপের বাড়িতে জীবনটা নিজের মতন কইরা গুছাইতে শুরু করছে পারু। এই সময় এক বিকালে আসল দুইজন ঘৃণিত মানুষের একজন। আতাহার। দুই গুয়ের পোকের একটা।
নসুর মুখে আতাহারের কথা শুইনা মেয়ের মাথায় বদনার নল দিয়া পানি ঢালতে থাকা হাত থাইমা গেল পারুর। সে বালতি থেকে বদনা ভইরা পানি তুইলা নল দিয়া ঢালতাছিল আর শিরি বোনের মাথার তালুতে হাত বুলায়া পানিটা যাতে চুলের গোড়ায় গোড়ায় লাগে সেই চেষ্টা করছিল। আতাহারের কথা শুইনা পারুর মতন তার হাতও থাইমা গেল। জ্বরের ঘোরে চোখ বুইজা আছে নূরি। সে চোখ খুলল। কে আইছে মা?
পারু গম্ভীর গলায় বলল, কেঐ না। তুই চুপ কইরা থাক।
নসুরে বলল, কলিমরে গিয়া ক, আর বাবায় বাইত্তে আছে তারে গিয়া করা যাওনের সময় দুয়ার টাইন্না দিয়া যা। আমরা যে এই ঘরে আছি এইডা য্যান হেয় না জানে।
পারুর ব্যবহারে নসুর উত্তেজনা একদম পানি হইয়া গেছে। ঠান্ডা গলায় সে বলল, আইচ্ছা।
তারপর ঘর থেকে বাইর হইয়া, দুয়ারের কপাট টাইনা দিয়া নানা নানির ঘরের দিকে যাবে, পারু বলল, নসু, খাড়া।
নসু দাঁড়াল। তর নানিরে এই ঘরে আইতে ক। সে ছাড়া আর য্যান কেঐ এই ঘরে না ঢোকে। আর তুই এমুন ভাবে চলাফিরা করবি সে য্যান তরে না দেহে, তুই য্যান তারে না দেহচ।
নসু আবার বলল, আইচ্ছা।
কিছুক্ষণ পর পারুর মা রাবেয়া খাতুন আইসা ঢুকলেন এই ঘরে। নূরির মাথায় পানি দেওয়া শেষ কইরা গামছা দিয়া তার মাথা ভাল মতন মুছাইয়া দিছে পারু। জ্বর এখনও আছে নূরির। দিঘিরপার বাজারের গোবিন্দ ডাক্তার গতকাইল আইসা দেইখা গেছে। একটা মাত্র ট্যাবলেট দিছে। তিনবেলা সেই ট্যাবলেট আর কুনসুম কুনসুম গরম পানিতে তোয়াইলা ভিজাইয়া শরীর মোছায়া দিতে বলছে, মাথায় পানি দিতে বলছে। খাওয়াদাওয়ার কোনও বাছবিচার নাই, যা খাইতে চায় মাইয়ায় তাই খাইতে পারব। এই জ্বর তিনদিন থাকবো। সেই হিসাবে কাইল জ্বর আর আসব না। পরশু থেকে আল্লার রহমতে সুস্থ হয়ে যাবে মাইয়া।
