মিন্টু সেই সময় মুক্তিযুদ্ধে চইলা গেল।
সে আর তার ছোটভাই থাকতো একঘরে। রাতের অন্ধকারে ছোট ভাইর পাশ থিকা উইঠা, বাড়ির কাউরে কিছু না বইলা গেল ইন্ডিয়ায়। ইন্ডিয়ার কল্যাণী নামের এক জাগায়। সেখানে ততদিনে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শুরু হইয়া গেছে। এক মাস ট্রেনিং লইয়া বয়রা বর্ডার দিয়া বাংলাদেশে ঢুকলো মিন্টু। আট নম্বর সেক্টর কমান্ডার ফ্লাইট ল্যাফনেনেন্ট জামাল চৌধুরীর নেতৃত্বে মিন্টু যুদ্ধ করতে চইলা গেল ফরিদপুর জিলার ভাটিয়া পাড়ায়। সেখানে পাকিস্তানিগো লগে যুদ্ধ করতে লাগল।
ততক্ষণে দুই গেলাস চা বানাইয়া আফজাল আর বকুলের হাতে ধরাইয়া দিছে রব্বান। মান্নান মাওলানা আর মোতালেব আইসা দাঁড়াইছে দোকানের একটু দূরে। হয়তো দুইটা যুবক পোলা বইসা চা খাইতাছে দেইখা তারা একটু অপেক্ষা করছে। বেঞ্চ খালি হইলে আইসা বসবো।
রব্বান একবার তাদের দিকে তাকাল, কথা বলল না, আফজাল আর বকুলের কথা শুনতে লাগল।
আফজাল চায়ে চুমুক দিয়া বলল, আমগো এই মাওয়ার পোলা মিন্টু। বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার আগের দিন তরি যুদ্ধ করছে। পনেরোই ডিসেম্বর যুদ্ধ করতে করতে মিন্টু চইলা যায় পাকিস্তান আর্মির ক্যাম্পের একেবারে কাছে। ক্রোলিং কইরা গিয়া শুইয়া শুইয়া যুদ্ধ করতে করতে যুদ্ধের উত্তেজনায় এক সময় উইঠা দাঁড়ায়। আর তখনই এক সময় পাকিস্তানিগো বুলেট আইসা তার কপালে লাগে। মস্তক ছিন্নভিন্ন কইরা ফালায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা, কিশোর মিন্টু বাংলার মাটিতে লুটায়া পড়ে। ততক্ষণে বিকাল হইয়া গেছে। ডিসেম্বরের পনেরো তারিখ। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, মোলোই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়া গেল।
মান্নান মাওলানা মোতালেবের হাত ধইরা টান দিলেন। শহিদ মুক্তিযোদ্ধা মিন্টুর কথা শুইনা তিনি যেন একটু বিরক্ত। বললেন, লও মিয়া, যাইগা। এহেনে পোলাপান চাডামি মারতাছে। এহেনে চা খাওনের কাম নাই।
মোতালেব হাসল। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা বলতাছে অরা, শহিদ মিন্টুর কথা বলতাছে আর। আপনে কইতাছেন অরা চাডামি মারতাছে?
অইছে লও মিয়া। কথা কইয়ো না।
মোতালেবরে নিয়া দ্রুত পায়ে ফিরতি পথে পা বাড়াইলেন মান্নান মাওলানা। আফজাল আর বকুল দুইজনেই ততক্ষণে খেয়াল করেছে মান্নান মাওলানার। বকুল রব্বানরে বলল, তোমার দুইজন গাহেক আমরা নষ্ট করলাম ভাই। আমগো লেইগা মাওলানা সাবে তোমার এহেনে চা খাইতে আইলো না।
রব্বান বলল, হেইডা মনে অয় খালি আপনেগো লেইগা না। আমার লেইগাও অইতে পারে। আমার বউয়ে তার মুখে ছ্যাপ দিছিল না?
আফজাল বলল, তার থিকাও বড় কথা হইল শালায় তো রাজাকার আছিল। হাতে কলমে রাজাকারি করে নাই। অর্থাৎ আর্মি ক্যাম্প কেম্পে গিয়া খবরাখবর দেয় নাই। রাজাকারি অস্ত্রও হাতে লয় নাই। তয় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করছে। পোলাগো মুক্তিযুদ্ধে যাইতে দেয় নাই। স্বাধীনতার পর বহুতদিন পলাইয়া আছিল। মোতাহার আতাহারের দোস্ত বন্ধুরা মুক্তিযোদ্ধা আছিল। তাগো লেইগা শালায় বাঁইচা গেছে। নাইলে তহনঐ অরে বিচড়াইয়া বাইর কইরা মাইরা হালাইতো মুক্তিযোদ্ধারা।
রব্বান বলল, বাদ দেন তার কথা। শহিদ মিন্টুর কথা কন।
আফজাল আবার চায়ে চুমুক দিল। যুদ্ধ শেষ কইরা, বাংলাদেশ স্বাধীন কইরা আমগো বীর মুক্তিযোদ্ধারা ফিরা আসলো। আমগো এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা গেল শহিদ মিন্টুগো বাড়িতে। মিন্টুর মা কানতে কানতে তাগো কাছে জানতে চাইলো, বাজানরা, তোমরা তো। ফিরা আইলা, আমার মিন্টুরে কই থুইয়া আইলা? তারা কেউ কোনও কথা বলতে পারে না। মিন্টুর মায়ের হাতে তুইলা দেয় ছেলের মানিব্যাগ, তার একটা ছবি আর একটা কয়েক লাইনের চিঠি। মা, আমি আপনাকে না বলিয়া যুদ্ধে আসিয়াছি। আমাকে ক্ষমা করিবেন আর দোয়া করিবেন যেন দেশকে শত্রুমুক্ত করিয়া, বাংলাদেশ স্বাধীন করিয়া আপনার বুকে ফিরিয়া আসিতে পারি। সেই ছেলে আর ফিরা আসে নাই।
রব্বান বলল, তয় তো ভাই আপনেগো এই মাওয়া এলাকা বিরাট পবিত্র জাগা। এই গেরামের পোলা মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হইছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা। প্রত্যেকদিন তার উদ্দেশে সালাম জানান উচিত আমগো।
কপালে স্যালুট করার ভঙ্গিতে হাত তুলে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ মিন্টুর উদ্দেশে সালাম জানাল রব্বান।
বকুল বলল, মাওয়া শব্দের অর্থ হইতাছে স্বর্গের বাগান। যেই গেরামে মিন্টুর মতন দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্মায় সেই গ্রাম সত্য সত্যই স্বর্গের বাগান।
৩.৮ নূরির জ্বর
নসু দৌড়ায়া আইসা বলল, মা ওমা, আতাহার কাকায় আইছে। আতাহার কাকায়।
দুইদিন ধইরা নূরির জ্বর। সকালের দিকে জ্বরটা থাকে না, দুপুরের পর থেকে আসে। আজও তাই হইছে। পারু আর শিরি তার মাথায় পানি দিচ্ছে। দুপুরে শিংমাছের ঝোল দিয়া অল্প একটু ভাত খাইছিল নূরি। তাও খাইতে চায় না। ঘ্যানঘ্যান করে। জ্বউরা (জ্বরের) মুখে খাইতে ভাল্লাগছিল না মাইয়াটার। দুই-তিনবার উটকি পারছে। উকাল কইরা ফালায় কিনা এই ডরে তারে আর ভাত খাওয়ানের চেষ্টা করে নাই পারু।
মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে চইলা আসার পর থেকে শিরি যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, পারুর লগে লগে থাকে। শিরি আর নসুরে স্বর্ণগ্রাম হাইস্কুলে ভরতি করে দেওয়া হইছে। একজন ক্লাস ফোরে আরেকজন ক্লাস টুতে। স্কুল যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ ছাড়া বাকি সময় পারুর লগে লগেই আছে শিরি। নূরি আছে বাড়ির পোলাপানের লগে।
