মোতালেব হাসল। তয় দিহি বেবাক খবরঐ আছে আপনের কাছে?
থাকবো না। তোমার ভাইগনার লেইগা সেন নূরজাহানিরে আমি বিয়া করতে পারলাম না।
না কইরা ভালই করছেন।
ক্যা?
এমতেঐ পোলার বউ লইয়া সংসারে অশান্তি, তহন নূরজাহানরে লইয়া লাগতো আরেক অশান্তি। শেষ তরি বাপেপুতে কাইজ্জাকিত্তন লাইগ্যা যাইতো। পোলায় কইতো নিজে বুড়া বসে একহান ভাল মাইয়া বিয়া কইরা আমারে ধরাইয়া দিছে একহান টেরি।
মান্নান মাওলানা কথা বললেন না, চুপ কইরা রইলেন।
তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন গলায় মোতাহার বলল, আরে আপনেরে তো আসল খবর দেওয়া অই নাই হুজুর।
মান্নান মাওলানা মোতালেবের মুখের দিকে তাকালেন। আসল খবর আবার কোনডা?
আরে দারুণ দুইহান খবর আছে।
কী কী কও তো?
এক হইল, আপনের পোলার দোস্ত আছিল না মাটির কনটেকদার আলী আমজাত, ও তো জেলে।
কী?
হ। সিলেট থিকা পুলিশ অরে এরেস্ট করছে। হজরত শাহজালাল সাবের দরবার শরিফে গিয়া ফকির মিসকিনের মতন পইড়া আছিল। পুলিশে অরে ওহেন থিকাই ধরছে। সরকারি কামে টালটি পালটি করছে, কেস অইয়া গেছে, পুলিশে তো অরে ধরবোঐ।
বোজলাম। আরেকখান খবর কী?
আরেকখান খবর অইলো আপনের মাকুন্দার।
মান্নান মাওলানা চমকালেন। মাকুন্দার কী অইছে?
মাকুন্দা খালাস পাইছে।
কও কী?
হ। তয় এই মিহি আর আইবো না। মুনশিগুইনজেই রইয়া গেছে। মুনশিগুইনজের হরগঙ্গা কলেজের ওইমিহি বিরাট নামকরা একজন ডাক্তার আছে, কাদির ডাক্তার। তার একপোলা বহুত নামকরা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খবর পড়তো। স্বাধীনতার পর রেডিয়ো টেলিভিশনেও খবর পড়ে। নাম হইল বাবুল আকতার। হেই বাড়িতে কাম লইছে মাকুন্দা। তারা মানুষ ভাল। মাকুন্দা বহুত ভাল আছে তাগো বাইত্তে। বাড়ির একপোলা থাকে ফেরান্সের প্যারিস শহরে।
তোমারে এই হগল খবর কে দিল?
কুতুব আলীগো বাড়ির মাতাব আলী মকদ্দমার কামে গেছিল মুনসিগুইনজ, হেয় হুইন্না আইছে আলী আমজাতের কথা। আর মাকুন্দার লগে তার দেহা হইছিল।
মান্নান মাওলানা কথা বললেন না, কীরকম চিন্তিত হয়ে রইলেন।
মোতালেব বলল, মাতাব আলী অরে জিগাইছিল, কী রে মাকুন্দা, আমগো মেদিনমেণ্ডল গেরামে আর যাবি না? মাকুন্দা আপনেরে খুব খারাপ একটা বকা দিয়া কইছে, অমুন মানুষ যেই গেরামে আছে ওহেনে আর যামু না। তয় ওই গেরামে বহুত ভাল মানুষও আছে। বেশিরভাগ মানুষই ভাল। তাগো লেইগা মনডা বহুত কান্দে। যাইতে ইচ্ছা করে। আপনের নাম লইয়া কইছে, আপনে মরলে বলে আইবো।
মান্নান মাওলানা বিরক্ত হলেন। আরে থোও মিয়া ওই হগল চোরচোট্টার কথা। মাকুন্দা মুকুন্দা লইয়া কে চিন্তা করে? আমি অহন আছি আমার চিন্তায়। আতাহাররে কেমতে বাস নামাইয়া দিমু, এত টেকা কই থিকা জোগাড় করুম, এই হগল চিন্তায়। ছেমড়াডার বুদ্ধিশুদ্ধি ভাল না। বুদ্ধি ভাল অইলে বউডার লগে খাতির কইরা, বউরে পটাইয়া হৌর আর সমন্দিগো কাছে থিকা টেকা আইন্না নিজেঐ বাস নামাইতে পারতো। হেইডা না কইরা চুতমারানির পোয় বউডারে পিড়ায়।
আপনে অরে এই হগল বুজান।
দুই-একদিন কথাবার্তি আমি অর লগে কইছি। চিন্তা করতাছি আবার কমু। বউর লগে খাতির কইরা হৌর আর সমন্দিগো কাছ থিকা বাস বানানের টেকা জোগারে বুদ্ধি দিমু। কমু বউরে পটা, বউরে দিয়া কাম করা। আরে বেডা তুই তো টেকা আনবি উধার। বাস চালু কইরা হাজার হাজার টেকা রুজি করবি। ওই টেকা জমাইয়া জমাইয়া তাগো টেকা শোদ কইরা দিবি। আর হৌর সমন্দির টেকা সহাজে ফিরত না দিলেই কী? তরে কি তারা খাইয়া হালাইবো।
না তা খাইবো না। তয় এইক্ষেত্রে আতাহারের উচিত বউর লগে ভাল ব্যবহার। বউ যদি হাতে থাকে, তিন ভাইয়ের এক আদরের বইন, হেই বইনে যুদি তার বাপ ভাইরে কয় আমরা আরো একখান দুইখান বাস নামাইয়া তোমগো টেকা দিমু, তয় তারা কি কোনও কথা কইবো!
আরে আমি তো মিয়া এইডাঐ কই। চুতমারানির পোয় তো বোজে না। বউ হাতে থাকলে বউঐত্তো অরে বিজনিসে খাড়া করাইয়া দিতে পারে।
এইডা অরে আপনে বুজান।
হ যেমতেই অউক অরে বুজাইয়া বাজাইয়া ঠিক করন লাগবো।
তয় লন অহন আরেক কাপ চা খাই।
তারপর হাসল মোতালেব। নূরজাহানের জামাইর দোকানের চা খাইয়া দেহি ছেমড়া চা বানায় কেমুন।
লও দেহি। তয় কোনও প্যাচাইল পোচাইলের কাম নাই।
আরে না। নূরজাহানের বিয়াশাদি অইয়া গেছে অহন হেই হগল লইয়া কথাবার্তি কইয়া লাব কী! ভাইগনার কানে গেলে হেয় রাগ করব।
রাস্তার কাজের লোকগুলি চা খাইয়া চইলা গেছে। এখন বেলদার বাড়ির পশ্চিম দিককার পাশাপাশি দুই বাড়ির ঢাকায় থাকা দুইটা ছেলে বইসা চায়ের অর্ডার দিছে। একজনের পরনে জিনসের প্যান্ট সাদা টি-শার্ট পায়ে কেডস। আরেকজনের পরনে প্রিন্টের হাফহাতা শার্ট আর কালো প্যান্ট, পায়ে স্যান্ডেল চোখে চশমা। মোতালেব তাদেরকে চিনল। জিনসের প্যান্ট পরা ছেলেটার নাম আফজাল আর প্রিন্টের শার্ট পরাটার নাম বকুল। তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়া কথা বলছিল। চা বানাতে বানাতে মুগ্ধ হয়ে তাদের কথা শুনছে রব্বান।
আফজাল ছেলেটা বলছিল, শহিদ মিন্টুর দাদা আমগো গেরামের নামকরা মানুষ আছিল। সরকারি কাম করতো। দফাদার। শুকুর দফাদার। একাত্তোর সালে মিন্টুর বয়স পনেরো বছর। ক্লাস নাইনে পড়তো। পঁচিশে মার্চ পাকিস্তানিরা যখন ঢাকার ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপায়া পড়ল, হাজার হাজার মানুষ মাইরা ফালাইলো, শহর ছাইড়া মানুষজন জান বাঁচাইতে আসতে লাগল গ্রামের দিকে। পুরা দেশের মানুষ যখন দিশাহারা, কেমন কইরা পাকিস্তানিগো ঠেকান যায়, কেমন কইরা শত্রুর হাত থিকা রক্ষা করা যায় দেশ এর লেইগা। এপ্রিল মাসেই দেশের ছাত্র জনতা সিপাহি পুলিশ সাধারণ মানুষ একত্র হইতে আরম্ব করল। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হইয়া গেল।
