বুদ্ধিডা কইলাম মন্দ না।
মন্দ যে না হেইডা আমিও বুজি। তয় একহান বাস নামাইতে কত টেকা লাগে জানো?
কত আর লাগবো? চৌদ্দো পোনরো লাক টেকা?
আরে না মিয়া। আঠরো-উনিশ লাক টেকা। অর তো আছে চাইর লাক।
আপনের জাপাইন্না পোলারে কন টেকা দিতে। দুই ভাইয়ে মিল্লা কারবার করুক।
আজাহারে মনে হয় টেকা দিব না।
ক্যা?
আমার ওই পোলাড়া অন্যপদের। নিজের টেকা কের হাতে ছাড়বো না।
তয় আপনে কিছু জমিন বেচেন। বাপপোলায় মিল্লা বাসের কারবার করেন। পাঁচ বচ্ছরে লাল অইয়া যাইবেন।
দেহি কী করন যায়।
চা শেষ করে উঠলেন মান্নান মাওলানা। মোতালেবের গেলাসে চায়ের একটুখানি তলানি রয়ে গেছে। সেইটুকুও ফুরুক করে একটা টান দিল সে। বাইত্তে যাইবেননি হুজুর?
না। একবারে মাগরিব এশা পইড়াঐ যামু।
তয় এতক্ষুন কী করবেন?
তোমার কোনও কাম আছে নি?
আরে না। আমার আর কী কাম?
তয় লও এইমিহি ওইমিহি ইট্টু আডি আর গল্পসল্প করি।
লন তয় হজরতগো বাড়ির ওইমিহি যাই। মাগরিবের ওক্ত অইলে আইয়া পড়ম নে।
লও।
মান্নান মাওলানার লগে হাঁটা দেওয়ার আগে ইনুসের দিকে তাকায়া মোতালেব বলল, ওই ইনুস, চা’র পয়সা পরে লইচ। আমিই দিমু নে।
ইনুস মুখে বলল, আইচ্ছা মামা, দিয়েন।
মনে মনে বলল, তুই আর দিছস চুতমারানির পো। তর কাছে কত কাপ চা’র দাম পাই তুই জানচ? ফোকটে খাইতে খাইতে তো জিন্দেগি পার করলি?
হালট দিয়া হাইটা বড় সড়কের দিকে যাইতে যাইতে মোতালেব বলল, হুজুরের মনডা আইজ ইট্টু খারাপনি?
মান্নান মাওলানা সড়কের দিকে তাকায়া বললেন, তোমার মনে অইতাছে?
হ।
ক্যা মনে অইতাছে কও তো?
আপনের মুখ দেখলে বুজা যায়।
মান্নান মাওলানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। হ মনডা ইট্ট খারাপ।
ক্যা?
এত আশা কইরা আতাহাররে বিয়া করাইলাম, আতাহার আগ্রহ লইয়াঐ বিয়াড়া করল, বিয়ার পর থিকা দেহি পোলাডার মন কেমুন উচাটন। বউডার মিহি তেমুন ফিরাও চায় না। উটতে বইতে খারাপ ব্যবহার করে বউর লগে। একদিন একটা থাবড় মারছে, আরেকদিন রাইত্রে বলে লাখি দিয়া খাট থিকা হালাইয়া দিছে।
কন কী?
হ মিয়া। তুমি আমার আপন মানুষ দেইখা সংসারের ভিতরের এই হগল কথা তোমারে কইলাম। বিশ্বাস কইরা কইলাম। তুমি কইলাম দাদা কেঐরে এই হগল কথা কইয়ো না। শরমের কথা।
আরে না হুজুর। পাগল অইছেন নি আপনে? এই হগল কথা আমি কেঐরে কমু না। মজজিদ বানাইতে গিয়া আমি অইছি আপনের মুরিদ আর আপনে আমার পির, হুজুর। বুজুরগ ব্যক্তি। আপনের সংসারের গোপন কথা বিশ্বাস কইরা আপনে আমারে কইছেন, এইডা আমি মইরা গেলেও কেঐরে কমু না। তয় একটা কথা আমি বুজলাম না, বউ আতাহার পছন্দ করে নাই?
করবো না ক্যা? অরে দেহাইয়াই তো বিয়া করাইলাম।
বউ যে ট্যারা ও আগে দেহে নাই?
দেখছে, দেখছে। তয় এত ট্যারা তহন মনে অয় বোজে নাই। আমিও বুজি নাই মিয়া। ভাবছি লক্ষ্মীট্যারা। বিয়ার পর দেহি পুরা ট্যারা। আতাহার উটতে বইতে টেরি মেরি কইয়া বকাবাজ্জি করে বউডারে। বউডা মিয়া দিনরাইত কান্দে। এক-দেড়মাসও অইলো না বিয়া অইছে, অহনঐ যুদি এই দশা অয়, তয় বাকি জিন্দেগি এই বউর লগে কাডাইবো কেমতে?
মোতালেব মাথা নাড়ায়া বলল, হেইডা তো ঠিক। তয় হুজুর আপনেরে একটা কথা কই?
কও।
কিছু মনে কইরেন না।
না মনে করুম না। আমি বুজছি তুমি কী কইবা। কও।
মোতাহারের বউর লগে বিয়াড়া আতাহারের করাইলেন না ক্যা?
আরে মিয়া উইডা তো আমার একলা দোষ না। ও ওতো চাইছে অন্য জাগায় বিয়া করতে। ও না চাইলে আমি পারতামনি অরে অন্য জাগায় বিয়া করাইতে?
তয় অহন পোলা বিগড়াইলো ক্যা?
হেইডা মিয়া আমি বুজতে পারতাছি না। মাইয়া লক্ষ্মীট্যারা অউক আর যাই অউক ও তো নিজে যাইয়া দেখলো, তহন না করলেঐত্তো পারতো যে না আমি এই মাইয়া বিয়া। করুম না। অহন বিয়ার পর মাইয়াড়ার লগে খারাপ ব্যবহার করতাছে ক্যা? ওয়াজদ্দি সাব। গাউদ্দার বিরাট নামকরা মানুষ, হের কানে যুদি এই হগল কথা যায়, আমার মান ইজ্জত থাকবো, কও?
না হেইডা তো ঠিকঐ। আইচ্ছা আরেকখান কথা। আতাহারের বিয়ায় বলে মোতাহারের বউ পোলাপানরে আপনে দাওতঐ দেন নাই?
কে কইছে দেই নাই। দিছি।
তয় তারা আহে নাই ক্যা?
ক্যান যে আহে নাই হেইডা তো তুমি বোজোঐ। দেশগেরামের বেবাক মাইনষেঐ বুজছে। আহে তো নাঐ, মদিনার জামাইরে পাডাইছিলাম দাওত দিতে, পারু তারে সোজাসুজি কইয়া দিছে জিন্দেগিতেও আমার বাইত্তে সে আর আইবো না। আমগো লগে। কোনও সম্পর্ক রাখবো না। জাগাসম্পত্তির ভাগ নিতেও আইবো না, আমগো কোনওদিন। চিনবোও না। সে যে এই বাড়ির বউ আছিল, তার পোলাপান যে আমার নাতি নাতকুড় এই পরিচয়ও কোনওদিন দিবো না।
মাইয়াডা বহুত দুঃখু পাইছে হুজুর। এর লেইগা এই হগল কথা কইছে।
হ হেইডা আমিও বুজছি।
হাঁটতে হাঁটতে দবির গাছির বাড়ি বরাবর আসছে তারা। বাড়ি বরাবর রাস্তার ধারে নতুন একটা চায়ের দোকান। সড়কের কাজের কয়েকজন মজুর দোকানের সামনের বেঞ্চে বইসা চা খাচ্ছে। দেখতে শুনতে ভাল একটা ছেলে দোকান চালাচ্ছে। হাসিমুখে গাহেকদের লগে। কথা বলছে। একবার সেই ছেলের দিকে তাকায়া মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাল মোতালেব। চিনছেননি হুজুর ছেমড়াডারে?
মান্নান মাওলানা গম্ভীর গলায় বললেন, চিনছি মিয়া। ওই ট্যাটনি ছেমড়ির জামাই। অর নাম অইলো রব্বান।
