নূরজাহান এবারও কথা বলল না। মনে মনে আবার বলল, মজনু মজনু।
.
সড়ক থেকে ঠাকুরবাড়ির দিকে যাওয়ার চিকন একখান হালট হইছে।
মসজিদের দক্ষিণ দিকে, সেই হালটের পাশে, ঠাকুরবাড়ির কোনায় টংঘরের একখান চায়ের দোকান দিছে হাফেজের পোলা ইনুস। রাস্তার কাজ শেষের পথে। এখন ঠাকুর চদরি বাড়ির দিকটায় মেয়েদের একটা কলেজ করার কথা ভাবছেন খাইগোবাড়ির কর্তারা। একটা প্রাইমারি স্কুল করার কথা ভাবছেন। ধীরে ধীরে আগাচ্ছে সবকাজ। এইসব টের পাইয়াই ব্যাবসাদার মানুষরা আগেভাগেই নানানপদের ব্যাবসার ফিকির করতাছে। ইনুস ওইসব ভাইবাই দোকান দিয়া বসছে। চালান খুবই কম। শুধু টংঘর তোলা আর চায়ের জিনিসপত্র, কিছু বিসকুট বনরুটি কলা, এই তো। দোকান চালু করার কয়েক দিন পরই বুইঝা গেল শুধু চায়ের দোকানে পোষাবে না। লগে মুদি মনোহারি মাল রাখলে দোকান জইমা যাইব। টাকাপয়সা আর কিছু জোগাড় কইরা, দোকানে র্যাক বানাইল দুইখান, মুদি মনোহারি জিনিস তুলল। বেচা বিক্রি ভাল রকম বাইড়া গেল। ইনুসের দোকানের সামনের বেঞ্চে সবসময়ই গাহেক দুই-চাইরজন আছে। ফুরুক ফুরুক চা খাচ্ছে, সিগ্রেট বিড়ি পান। খাচ্ছে। বনরুটি কলা খাচ্ছে, চায়ে ভিজাইয়া খাচ্ছে টোস্ট বিসকুট। দোকান চালাইতে গিয়া আজাইরই পায় না ইনুস। বড়পোলা কামাল আইসা বাপের লগে হাত লাগায়।
আছরের নামাজ পড়ে আজ বিকালে মান্নান মাওলানা আর মোতালেব হাঁটতে হাঁটতে আসল ইনুসের দোকানের সামনে। প্রথমে কেউ কিছুই ভাবে নাই, মোতালেব আসছিল হুজুররে আগায়া দিতে। তারপর নিজে হয়তো ইনুসের দোকানের সামনের বেঞ্চে বইসা এককাপ চা খাইব ফোকটে, একটু চাউমি মারবো।
নামাজ কালাম ধরার পরও মোতালেবের স্বভাব বদলায় নাই।
দোকানের সামনে আইসা মান্নান মাওলানা হঠাৎ কইরা বললেন, মোতালেব, লও চা খাই।
মোতালেব বিরাট উৎসাহী। লন খাই হুজুর। আমি তো এইমিহি আইলামঐ এর লেইগা। আপনেরে আউন্নাইয়া দিয়া ইনুসের দোকানে বইয়া এককাপ চা খামু। ইনুস বহুত ভাল চা বানায়। আপনে খান নাই অর দোকানের চা?
খাইছি মনে অয় দুই-একদিন। তাও মনে নাই।
দোকানে ইনুস আছে। সড়কে কাজ করা লেবার ধরনের একজন কেংলামতন লোক চায়ের গেলাসে টোস্ট বিসকুট ভিজাইয়া খাইতাছিল। মান্নান মাওলানা আর মোতালেবকে দেইখা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খাওয়া শেষ কইরা, পয়সা দিয়া ঠাকুরবাড়ির দিকে চইলা গেল।
মোতালেব বিনীত গলায় মান্নান মাওলানাকে বলল, বহেন হুজুর, বহেন।
হাত দিয়া বেঞ্চটা একটু ঝাইড়া দিল।
মান্নান মাওলানা বসলেন। মোতালেব বসল তার পাশে। ইনুস, দুই কাপ চা বানা। হুজুরে খাইবো। চা য্যান ভাল অয়।
ইনুস হাসল। আমার চা খারাপ হইবো না মামা। খাইয়া কইয়েন।
কেটলি থেকে গেলাসে চা ঢালল ইনুস, চামচে করে চিনি মিশাইয়া ফটাফট কয়েকটা নাড়া দিল। দুইজনের হাতে দুইকাপ চা ধরায়া দিয়া বলল, খাইয়া দেহেন। আমি দুধ আর লিকার আলাদা বানাই না। দুধপানি একলগে জ্বাল দেই। তারবাদে ছাড়ি চা-পাতা। চিনি মিশাই পরে। এর লেইগা আমার চা ভাল অয়।
মান্নান মাওলানা চায়ে চুমুক দিলেন। মোতালেবও দিল। দিয়া হুজুরের মুখের দিকে তাকাল। কেমুন চা হুজুর?
মান্নান মাওলানা মাথা নাড়লেন। না, ভাল। বহুত ভাল চা।
শুনে ইনুস খুবই খুশি। হুজুরের মতন পরহেজগার লোকে তার দোকানের চা খাইয়া বলছে ভাল, তয় এই দোকানের আয় উন্নতি হইবই। ইনুসের বরাত মনে অয় খুইল্লা গেল।
মোতালেব চায়ে চুমুক দিয়া বলল, হুজুরের এইবার কপাল কইতে অইবো। তার কথা মতন আমার ভাইগনায় মজজিদ বানাইয়া দিল। মসজিদ অওনের কয়দিন পর ঐ হুজুরে আতাহাররে বিয়া করাইলো বিরাট ধনী বাপের মাইয়া। সোনাদানা খাট পালং সোফা মোফা দিয়া বাড়ি তো ভইরা দিছেঐ, বিয়ার খরচাপাতি বাদ দিয়াও নগদ টেকা দিছে চাইর লাখ।
ইনুস বলল, হ এইডা বিরাট ভাগ্যি। হুজুর, তয় আতাহার অহন কী করবো? কায়কারবার ধরছে?
মান্নান মাওলানা উদাস গলায় বললেন, না অহন তরি ধরে নাই। ধরবো ধরবো করতাছে।
মোতালেব বলল, কী কারবার করবো?
পয়লা চাইছিল মাওয়ার বাজারে একখান বরফকল দিতে।
বরফকল?
হ।
মাওয়ার বাজারে বরফকল দিয়া লাব অইবো?
ভাল লাব অইবো মিয়া। বরফকল দিতে বেশি টেকা লাগে না। তিন-চাইর লাখে অইয়া যায়। তয় রোজগার ভাল।
কেমতে? দেশগেরামে এত বরফ দিয়া মাইনষে কী করবো?
মান্নান মাওলানা চায়ে চুমুক দিয়া মোতালেবের দিকে তাকালেন। তুমি বোজো নাই?
না হুজুর, বুজি নাই।
ইনুস বলল, আমি বুজছি। রাস্তা চালু অইয়া গেলে মাওয়া অইয়া যাইবো বিরাট কায়কারবারের জাগা। মাছের বিরাট বিরাট আড়ত অইবো…
ইনুসের কথা শেষ করতে দিল না মোতালেব। বলল, আর কওন লাগবো না। বুইজ্জা হালাইছি। মাছের আড়তে বরফ লাগে শয়ে শয়ে মন।
মান্নান মাওলানা হাসলেন। এইত্তো বুজছো। খালি মাওয়ার বাজারের মাছের আড়তে। বরফ সাপলাই দিয়া কুলাইতে পারবো না একখান বরফকলে।
তয় দেরি করতাছে ক্যা? নগদ টেকা আছে হাতে। কইরা হালাউক।
মান্নান মাওলানা মন খারাপ করা গলায় বললেন, না বরফকল হেয় করবো না।
কন কী?
হ।
ক্যা?
হেয় অহন অন্য কারবার ধরনের কথা চিন্তা করতাছে।
কী কারবার?
বাসের কারবার।
কী?
হ। ঢাকা-মাওয়া লাইনে বড় একখান বাস নামাইতে চায়। রাস্তা চালু অওনের লগে লগে বাস নামাইবো। বাসের কারবার বলে বহুত লাভজনক হইবো এই লাইনে। দিনে টিপের পরে টিপ দিব (ট্রিপ)। ঢাকার যাত্রাবাড়ি আর নাইলে গুলিস্থান থিকা আইবো আর যাইবো। একবচ্ছর একহান বাস চালাইতে পারলে পরের বচ্ছর ওই রোজগার দিয়া আরেকখান বাস করতে পারবো। এইভাবে চললে চাইর-পাঁচ বচ্ছরের মইদ্যে চাইর-পাঁচহান বাসের মালিক অইয়া যাইতে পারবো।
