মাইয়ার বাপে ছেলের আগ্রহ দেইখা অবাক হয়। সে ছেলেরে সব কিছু খুইলা বলে। আমার মাইয়াটা বাবা একটু পাজি, এমনিতে স্বভাব চরিত্র ভাল কিন্তু খুব বদরাগী। তুমি বাবা পরে বলতে পারো কিন্তু আমি আগেই বলে নিলাম। শেষে আমারে দোষ দিতে পারবা না। আমি আগেই সবকিছু বইলা দিলাম। মেয়ের বাবার কথা শুইনা ছেলে বলল যে, আমার পাজি মাইয়াই পছন্দ। আমি এমন একজনরেই খুঁজতাছিলাম। আর মনে মনে বলল, পাজি মাইয়া কেমুন কইরা মানুষ করতে হয় তা আমার জানা আছে।
শুভলগ্নে শুভক্ষণে তাদের বিয়া হইয়া গেল, বিয়ার দিন সাধারণত পালকি দিয়া নতুন বউ নিয়া যায়। কিন্তু এই ছেলে বলে যে, আমার মানত আছে। আমি মানত করছিলাম। বিয়ার সময় আমার বউরে হাঁটাইয়া বাড়িতে নিব।
বউ তো হাঁটতে হাঁটতে বহুকষ্টে বাড়ি গেল। বাড়ি গিয়া বউ একটু বসতে চাইলো। জামাই বলল, এখন বসা যাইব না। আমার মানত আছে বিয়ার দিন বউরে একঘণ্টা উঠানে দাঁড়ায়া থাকতে হইব পাটার উপরে। না দাঁড়াইলে অনেক অমঙ্গল হইব। বউ তো রাগে কটমট করতাছে। ভাবছে বিয়ার দিনটা যাউক না তারপর দেখামু মজা।
আধাঘণ্টা দাঁড়ায়া থাকার পর বলল, আমার ক্ষুধা লাগছে। জামাই বলল, খাবার সময় হইলেই বলব। এখনও খাবার সময় হয় নাই। সময় হইলে খাবার দেওয়া হইলো। খাবার খাইয়া বউ বলল আইজ বিয়ার দিন দেইখা তোমারে ছাড়লাম কিন্তু অন্যদিন হইলে অন্যকিছু হইতো।
জামাই ভাবতাছে তোমারে আইজ কিছুই বলব না। আগামী কাইল দেখামু মজা। তুমি পাজি আর আমি হইলাম পাজির বাপ!
জামাই খুব সেয়ানা। সে ভাবছে বউ যত পাজিই হোক বিয়ার প্রথম রাইতে বিড়াল মারতে না পারলে অর্থাৎ বউটারে সিধা করতে না পারলে কাজ হবে না।
পরদিন ঘুম থেকে ওইঠা স্বামী স্ত্রী দুইজন দাঁত মাজতাছিল। এমন সময় স্বামীর পালা কবুতর বাকবাকুম করে ডাইকা উঠল। সে কবুতররে লক্ষ কইরা বলল, দেখ কবুতর, আমার সামনে বাকবাকুম করিস না। আমার সামনে কেউ বাকুম বাকুম করবো এইটা আমি সইজ্জ করুম না। চুপ কইরা থাক। নাইলে তোর দুই পাও টান দিয়া ছিড়া এক পাও ফালামু। ওই চালে আর এক পাও এই চালে। কবুতর তো আর তার কথা বুঝে নাই। তাই সে আবার বাকবাকুম কইরা উঠল।
জামাই বলল, তবে রে কবুতরের পো, তোর একদিন কী আমার একদিন। এইকথা বইলা সে কবুতরের খাঁচা থেকে কবুতরটারে ধইরা আইনা দুই হাতে দুই পাও ধইরা দুইদিকে টান দিয়া জীবন্ত কবুতররে দুইভাগ কইরা ফালাইলো। এরপর দুই পাও দুই চালের উপর ফিক্কা ফালাইলো।
স্ত্রী বলল, এত নিষ্ঠুর তুমি! কবুতর তো তোমার কথা বুঝতে পারে নাই। তুমি ওরে এইভাবে হত্যা করলা কেন?
সে তার বউরে শুনায়া শুনায়া বলল, আইজ তো কবুতরের উপরে দিয়া গেল। বাড়ির কেউ আমার কথা না শুনলে অর এই কবুতরের মতন অবস্থা হবে।
স্ত্রী ভাবে, কী পাজির হাতে আইসা পড়লাম রে বাবা, এইটা দেখি আমার থিকাও পাজি। যাউক বাপের বাড়ি গিয়া লই। তারপর দেখামু নে মজা।
তারা হাতমুখ ধুইয়া ঘরে আসছে। এমন সময় তার ঘরের পাশে বাইন্ধা রাখা ছাগলটা মে সেঁ কইরা ভ্যাবাইয়া উঠল। সে ঘর থেকে বাইরে গিয়া বলল, ওই ছাগল চুপ করলি। আর একবার চেঁ করলে কিন্তু তোর অবস্থা কবুতরের মতন করুম। ছাগল তার কথা কিছুই বুঝলো না। আবার সেঁ কইরা ভ্যাবানি দিল। জামাই হুংকার দিয়া উঠল, শালার ছাগল, এতবড় সাহস, মেঁ করতে না করলাম, আমার মুখের উপর সেঁ কইরা উঠলি! তোরে আইজকা খাইছি। এই বলে সে পাকের ঘরে গিয়ে ধারালো বঁটি নিয়া আসলো ছাগলরে কাটার জন্য। তার মা বউ সবাই বলল, খবরদার, বোবাজাত তোমার কথা বুঝতে পারে নাই। অরে মাইরো না।
সে বলল, তোমরা জানো না আমার কথা না শোনলে আমি কী করতে পারি? অর রক্ষা নাই আজ। এই বলে সে পাঠা বলির মতন এক কোপে ছাগলের কল্লা নামায়া দিল। ছাগলের রক্ত দেইখা বউ ভয়ে কাঁপতে লাগল।
বউরে শুনায়া শুনায়া জামাই বলল, এইডা তো জন্তুজানোয়ার! কোনও মানুষ আমার। কথা না শোনলে তার অবস্থাও এমন হইব, এইকথা আমি সবাইরে জানায়া দিলাম।
বউ তো পারলে অজ্ঞান হইয়া যায়। এ কী নিষ্ঠুর পাজির হাতে আইসা পড়লাম। তার কথা না শোনলে আমার প্রাণটা যাবে। এখন উপায় হইলো, হয় এর কথা শুনতে হইব নাইলে এরে ছাড়তে হইব। আর এরে ছাইড়া দিলে আমার আর জীবনে বিয়া হইবো না। নানাদিক চিন্তা কইরা শেষে স্বামী যা বলে তা মেনে চলার সিদ্ধান্তই সে নিল।
এদিকে বাবার বাড়ির লোকেরা ভাবছিল স্বামীর বাড়িতে একদিনও তাগো মাইয়া টিকবে না। তারা দেখলো না সে ঠিকই স্বামী সংসার করতাছে। তার বিরুদ্ধে শ্বশুরবাড়ির লোকের কোনও অভিযোগ নাই। তার দাদি একদিন জিজ্ঞাসা করলো, কী রে, তোর এত জিদ। আছিল, তোর এত রাগ আর এত পাজি তুই, তা কীভাবে দূর হইলো? সে বলল, তোমাদের নাতিন জামাই বিয়ার রাইতেই বিলাই মারছিল। তাতেই আমার সব রাগ চইলা গেছে।
রব্বান হাসল। আমার কিচ্ছা শেষ।
নূরজাহান মনে মনে দুইবার বলল, মজনু মজনু।
আর একখান কথা। আমি তাড়াতাড়ি কোনও পোলাপান হওয়ামু না। মাইয়া আমি দুইচোক্ষে দেখতে পারি না। আমি পছন্দ করি পোলা। চাইলাম পোলা, অইয়া গেল মাইয়া, এর লেইগা আমি সহজে পোলাপান হওয়াতে চাই না। পোলাপান যাতে না অয় আমি কইলাম সেই মতন চলুম।
