নূরজাহানের লগে আছে মরনি, বানেছা, আবদুলের বউ। মরনি আম্মার দেওয়া নাকফুল পরছে নূরজাহান, হামিদার কানের দুলজোড়া পরছে, মামাতো ভাই ফজল নিয়া আসছে দশ আনা ওজনের চেন, সেইটা পরছে গলায়। মাথায় খোঁপা বাইন্ধা দিছে বানেছা, হাতভরতি চুড়ি। খুব সুন্দর লাগছে নূরজাহানকে। তবে মেয়েটির মুখে কোথায় যেন সূক্ষ্ম একটা বিষণ্ণতার ছায়া। মরনি আম্মার দিকে সে একবারও তাকায় নাই। কেমন জানি লাগছে তাকাতে। গভীর কোনও অভিমান, নাকি অন্যকিছু কে জানে!
মরনি একবার মজনুর কথা তুলেছিল। মাহাজনে তারে ছুটি দেয় নাই। নাইলে নূরজাহানের বিয়ায় সে আসত।
শুইনা নূরজাহান মনে মনে বলছে, না আইয়া ভাল করছে। আমি চাই না আমার বিয়াতে সে থাকুক। তার লগে আমার আর দেখা হউক।
মজ্জেম মাতবরের খাসির গোস্ত আর ডাইল খাইয়া, সেন্টুর দোকানের দই খাইয়া মহাখুশি বেবাকতে। বিকালের দিকে সবকাজ শেষ। এখন মাইয়া উঠাইয়া দেওন। এই ফাঁকে রব্বান। আর নূরজাহানও খাইয়া নিছে। সরা পড়ানের সময় নূরজাহানের হাত রব্বানের হাতে দিয়া দবির-হামিদা দুইজনেই কানছিল। দবির বলছিল, বহুত আদর কইরা মাইয়াডারে আমি বড় করছি বাজান। অরে তুমি ভাল রাইখো। অর মনে তুমি কোনও দুঃখু দিয়ো না।
হামিদা কোনও কথা বলে নাই। সে শুধু চোখ মুছছিল।
কান্নাকাটি শুরু হইল সন্ধ্যাবেলা। বড়ঘর থেকে নতুন ঘরটায় যাবে নূরজাহান। বড়ঘর তার বাপের বাড়ি, নতুন ঘর হইল জামাইবাড়ি। মাঝখানে শুধু একখান উঠান। বড়ঘরের সামনে দাঁড়ায়া আছে রব্বান। বউ লইয়া নিজের ঘরে যাইবো। মরনি আবদুলের বউ হামিদা তারা ধইরা ধইরা ঘর থেকে বাইর করল নূরজাহানরে। দবির দাঁড়ায়া আছে রব্বানের পাশে। রমিজ আছে, আবদুল আলফু আছে। গাওয়াল চইলা গেছে বাড়িতে। তার নামাজ কালাম আছে। উঠানে হ্যাঁজাক বাতি জ্বলছে। চাঁদের আলোও আছে। বড়ঘর আর নতুনঘরে পরিষ্কার কাঁচের হারিকেন জ্বলছে। আবদুলের দেওয়া তোশক চকিতে বিছানো হয়েছে। তার ওপর নতুন আকাশি রঙের চাদর। নতুন বালিশে লাগানো হয়েছে সাদা গিলাপ। আলনায় রাখা আছে রব্বানের পুরানা জামা কাপড়। সব ঠিকঠাক।
তবে ঘর থেকে উঠানে নাইমাই হামিদার গলা জড়াইয়া ধইরা হাউমাউ কইরা কানতে লাগল নূরজাহান। হামিদাও কাঁদছে। দবির চোখ মুছতে মুছতে গেল মাইয়ারে সান্ত্বনা দিতে। কান্দিছ না মা, কান্দিছ না। তুই তো দূরে কোনওখানে যাইতাছস না, তুই তো আমার বাইত্তেঐ রইলি। কান্দিছ না।
হামিদারে ছাইড়া নূরজাহান তারপর দবিরের গলা প্যাঁচাইয়া ধরল। তারপর সেই সেদিনকার রাতের মতন হাউমাউ কান্না। বাবাগো, ও বাবা, আইজ থিকা আমি তোমার পর অইয়া গেলাম বাবা। আমি তোমার পর অইয়া গেলাম।
দবির কাঁদতে কাঁদতে বলল, নারে মা, না। মাইয়া জামাইবাড়ি যায় ঠিকই, তয় পর অয় না কোনওদিনও। তুই অইলি আমার জান, আমার কইলজার টুকরা। এই ঘর থিকা ওই ঘরে যাইতাছস তুই। আমার চোক্কের সামনে থাকতাছস। তরে তো আমি দূরে বিয়া দেই নাই মা। আমার কাছেই রাখছি। কান্দিছ না, কান্দিছ না।
সেই রাতের মতো রব্বান কীরকম চোখ করে বাপ-মেয়ের দিকে তাকায়া আছে। মুখটা কীরকম উদাস তার।
মরনি বলল, রাইত অইয়া যাইতাছে। বাইত্তে যাওন লাগবো গাছিদাদা। বাড়ি খালি হালাইয়া আইছি। মাইয়া বিদায় করেন। আর কাইন্দেন না।
নূরজাহানের পিঠে হাত রাখল সে। কান্দিস না মা, কান্দিস না। কান্দস ক্যা? বাপ-মা ছাইড়া তো কোনওহানে যাইতাছস না। তর কপাল কত ভাল চিন্তা কর। তুই জামাইবাড়ি গেলি না, জামাইঐ আইলো তগো বাইত্তে। যা মা যা।
রব্বানের দিকে তাকাল সে। বাজান, বউ লইয়া ঘরে যাও।
রব্বান একটু আগায়া আসল। কী করব বুঝতে পারল না। নূরজাহানের হাত ধরবো?
আবদুলের বউ বলল, বউ ঘরে নিতে অয় কুলে কইরা। পাথালি কুলে কইরা লইয়া যান জামাই।
রব্বান কথা বলল না। হাসিমুখে নূরজাহানকে পাথালি কোলে নিল। উঠান পার হইয়া নতুন ঘরে গিয়া ঢুকল।
বাদলা আলালদ্দি বারেক ওরা তখন হি হি কইরা হাসছে।
.
থুতনি তরি ঘোমটা দিয়া বইসা আছে নূরজাহান।
টুপি পাঞ্জাবি খুইলা নতুন লুঙ্গি আর নতুন স্যান্ডো গেঞ্জি পরছে রব্বান। ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ। ঘরে হারিকেন জ্বলছে। বাইরের জ্যোত্সা ঘরের ফাঁকফোকর দিয়া ঢুকছে কিছুটা।
রব্বান আইসা একটা বালিশ টাইনা নূরজাহানের সামনে আধশোয়া হইল। অহন ঘোমটা সরাও। ইট্টু কথাবার্তি কই।
নূরজাহান ঘোমটা সরাল না। কথা তো বললই না, নড়লও না।
রব্বান হাসল। ঠিক আছে, তয় আমিঐ সরাই।
বলেই নূরজাহানের মুখের ঘোমটা সরাতে গেল, নূরজাহান আস্তে করে তার হাত সরায়া দিল। রব্বান আবার চেষ্টা করল, নূরজাহান আবারও একই কাজ করল।
রব্বান হাসিমুখে বলল, তয় ঠিক আছে। সরানের কাম নাই। যেমতে আছো অমতেই বইয়া থাকো। বইয়া বইয়া আমার কথা হোনো। তোমার খবরাখবর কইলাম বেবাকঐ আমি জানি। বহুত তেজি মাইয়া তুমি। মান্নান মাওলানার মুখে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছিলা পুলিশ দারোগার সামনে। বিরাট জিদ্দি মাইয়া তুমি। হোনো, একখান জিদ্দি মাইয়ার কিচ্ছা কই তোমারে। কিচ্ছাডা হোনলে বুজবা, তুমি কী আর আমি কী?
এক গ্রামে এক পাজি মাইয়া আছিল। তার আর বিয়া হয় না। কারণ চাইরদিকে বইটা গেছে যে মাইয়াটা খুবই বদরাগী আর সাই পাজি। এই মাইয়ারে কে বিয়া করবো? যদিও সমন্দ দুই-একটা আসে তাও আশপাশের লোকদের কাছে বদলাম শুইনা সমন্দ ফিরা যায়। মাইয়ার মা-বাপে তার বিয়ার আশা ছাইড়া দিছে। শেষ তরি এক পোলায় তারে বিয়া করতে আসলো। সে একজন পাজি মাইয়াই বিচড়াইতাছিল।
