সেদিন বিকাল শেষ হয়ে আসার আগেই রব্বান আইসা উঠল দবির গাছির বাড়িতে। লগে রমিজ ঘটক আছে। রব্বানের পরনে আজ খয়েরি রঙের প্যান্ট আর সাদা শার্ট। পায়ে টায়ারের স্যান্ডেলটা আছে। তবে পরনের জামাকাপড় পয়পরিষ্কার। মাথায় বাবরি চুল নাই, মুখে দাড়িমোচ নাই। কালোকোলো মুখোন ফরসা লাগছে। বাবরি চুল ছাটাবার ফলে দেখতে ভাল লাগছে।
রব্বানকে দেইখা নূরজাহান মাথায় ঘোমটা দিয়া বড়ঘরে গিয়া ঢুকল। দবির হামিদা দাঁড়ায়া ছিল উঠানে। রমিজ বলল, হাজ অইয়াইলো। আইজ আমি আর দেরি করুম না। গাছি, তোমার জামাই তোমারে বুজাইয়া দিয়া গেলাম। কাইল বিয়ানে আমু। টেকা পয়সা রেডি রাইখো। রব্বানরে লইয়া দিঘলি যামু বিয়ার বাজার করতে। রব্বানের তো কোনও গার্জিয়ান নাই। এর লেইগা আমিই হইলাম অর গার্জিয়ান।
দবির বলল, কোনও অসুবিদা নাই ঘটক। তুমি আইয়ো।
রব্বানরে বলল, যাও বাজান, ওই ঘরে যাও। তোমার ব্যাগবোগ রাইখা লুঙ্গিমুঙ্গি পরো। হাতমুখ ধুইয়া চা পানি খাও। পরে ভাত খাইয়োনে।
রব্বান লাজুক গলায় বলল, আইচ্ছা কাকা।
সেই রাতে অদ্ভুত একটা দৃশ্য চোখে পড়ল রব্বানের। সে রাতের খাওয়া সারছে নতুন ঘরে বইসা। হামিদা তার খাবার দাবার আইনা দিছে, সামনে বসাইয়া খাওয়াইছে। মুরগি ভুনা আর মুশরি ডাইল। হামিদার রান্না ভাল। খাইয়া আরাম পাইছে রব্বান। নতুন ঘরে নতুন চৌকি পাতা। চৌকিতে পুরানা কাঁথা বালিশের বিছানা। নতুন বিছানা হবে বিয়ার রাতে। খাইয়াদাইয়া শুইয়া পড়ছে রব্বান। এতদিন গাছতলায় আর নয়তো মাইট্টাল কামলাগো ছইয়ের নীচে শুইছে, ভাল ঘুম এক রাইতেও ঘুমাইতে পারে নাই। দুয়ার বন্ধ কইরা, উঠানের দিককার জানালা আর মাথার দিককার জানালা খোলা রাইখা। শুইছে, চোখ মাত্র লাইগা আসছে, হঠাৎ শোনে উঠানের দিকে কে জানি কানতাছে। মাইয়ালোকের কণ্ঠ। আস্তে কইরা মাথা তুইলা জানালা দিয়া চাইছে। চাইয়া দেখে উঠান। ভরা ফকফকা জ্যোৎস্না। সেই জ্যোৎস্নায় গাছিকাকা আর কাকি হোগলা বিছাইয়া বইসা রইছে, গাছিকাকার কুলে বইসা একদম শিশু বাচ্চার মতন কইরা তার গলা প্যাঁচাইয়া। ধইরা কানতাছে নূরজাহান। শুধু একটা কথাই তার শুনা যাইতাছে, বাবাগো বাবা, ও বাবা, বাবা। আর কিছু না। অনেকক্ষণ ধইরা এইভাবে কানল নূরজাহান। ওইদিকে হামিদা মাইয়ার পিঠে হাত বুলায় আর চক্ষু পোছে, দবির মাইয়ার মাথায় হাত বুলায় আর চক্ষু পোছে। অনেকক্ষণ ধইরা এই দৃশ্যটা দেখল রব্বান। দেইখা বুকটা কীরকম তোলপাড় করল তার। এত আরামের বিছানায়ও অনেকটা রাত তরি ঘুম আসল না তার। বুকটা ভার হইয়া রইল।
তার পরদিন থেকে কথা মতন আগাইল সবকিছু। রমিজরে নিয়া বারো হাজার টাকা পকেটে নিয়া রব্বান গেল দিঘলি বাজার। নিজের জিনিসপত্র কিনল, নূরজাহানের শাড়ি ছায়া ব্লাউজ স্যান্ডেল লগে অল্প দামি একখান সুটকেস কিনল, হিসাবের গরমিল কইরা। রমিজরে বুঝাইয়া দিল তার দুই হাজার। সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরা জিনিসপত্র সব দিল হামিদার হাতে। জিনিসপত্র পছন্দ অপছন্দের কোনও কারণ নাই। সুটকেস খুইলা প্রত্যেকটা জিনিসই দবির হামিদা দেখল, নূরজাহানরে দেখাল তার বিয়ার লাল রঙের লায়লনের শাড়িটা, ছায়া ব্লাউজ, বাটার স্যান্ডেল। নূরজাহান কোনও কথা বলল না।
বিয়ার আগের দিন থেকে শুরু হইয়া গেল বাড়ি সাজানের কাজ। বাদলা নাদের আলালদ্দিরা শুরু কইরা দিল সাজানের কাজ। পরদিন ফজরের আজানের লগে লগে শহিদ মিন্টুদের বাড়ির পাশের বাড়ির মজ্জেম মাতবর দুইজন লোক লইয়া আইসা খাসি দুইখান জবাই করল। খাসি কিনতে হাটে যাইতে হয় নাই দবিরের। কুমারভোগের এক লোকের চাইরখান খাসির দুইখান কিন্না আনছে তিনহাজার টাকা দিয়া। মজ্জেম মাতবর হইতাছে মেজবানি রান্ধনের ওস্তাদ। কাইল বিকালে আইসা মোশলা বাইট্টা দিয়া গেছে রাবি আর আবদুলের বউ। পিঁয়াজ বাইট্টা দিয়া গেছে। বাজার সদাই বেবাকঐ কইরা রাখছে দবির। জুম্মার নামাজের আগে আগে রান্নাবান্না শেষ। নামাজের পর পর সরা পড়ালেন আমিন মুনশি। কাবিননামায় সই দিল রব্বান, টিপসই দিল নুরজাহান। কাবিন হইল দশ হাজার এক টাকা। উসিল আধাআধি। পাঁচ হাজার। নূরজাহানের উকিল বাপ হইছে আজিজ গাওয়াল, সাক্ষী আবদুল আর আলফু। রব্বানের দিক থেকে রমিজ ঘটক নিজে আর মাঝিবাড়ির ওহাব। সরা পড়ানের পর শুরু হল খাওয়াদাওয়া। আকাশে মেঘ বৃষ্টির চিহ্ন নাই দেইখা শামিয়ানা টাঙাইতে হয় নাই। উঠানে হোগলা বিছাইয়া খাওনের ব্যাবস্থা। নূরজাহান বউ সাইজ্জা বইসা আছে বড়ঘরের চকিতে। লাল শাড়িটায় তাকে খুব মানাইছে। কাইল থেকে কাঁচা হলুদ মাখা ছিল শরীরে। সকালবেলা গোসল করার পর শরীরের রং হইছে হলুদ বর্ণ। একই অবস্থা রব্বানেরও। তারেও কাঁচা হলুদ মাখাইয়া দিছিল বাদলা আর নাদের। সেও গোসল করছে সকালবেলা। গোসল কইরা সাদা পায়জামা আর হালকা হলুদ রঙের সিল্কের পাঞ্জাবি পরছে, মাথায় সাদা টুপি। হাতে ঘড়ি, আঙুলে আংটি। চকির যেদিকটায় পা নামাইব সেইখানে বাটার নতুন স্যান্ডেল।
রব্বানরেও দেখতে ভাল লাগছে। তার লগে আছে বাদলা আলালদ্দি, নাদের হামেদ। দুলাভাই দুলাভাই কইরা ভালই রঙ্গরস তারা রব্বানের লগে করছে।
