রমিজ মুড়ি মিঠাই খাইতে খাইতে বলল, কও গাছি, অহন কেমতে কী করবা? বিয়ার দিন তারিখ করতে চাও কবে?
দবির না, কথা বলল হামিদা। আগামি শুক্রবারই করতে চাই। বেককিছু যহন ঠিক আছে তহন আর দেরি করুম ক্যা?
আলহামদুলিল্লাহ। ভাল কথা। কইরা হালান।
দবিরের দিকে তাকাল রমিজ। গাছি, বুদ্ধি কইরা বাড়ির কাম লাগায়া ভাল করছে। ভাবিছাবের কথাঐ ঠিক। দেরি কইরো না। আগামী শুক্কুরবার বিয়ার দিন তারিক করো। আমি অহনঐ রব্বানরে গিয়া বেবাক কথা কইতাছি। আর দেরি করন ঠিকও হইবো না। কে কোনহানদা ভাঙ্গানি দিবো, রব্বানের মন বিগড়াইয়া দিবো, কে কইবো? দেশগেরামে বদ মাইনষের আকাল নাই। নূরজাহানের লগে রব্বানের বিয়া হইতাছে হুইন্না হয়তো মান্নান মাওলানার লগে নূরজাহান যা করছিল হেই ঘটনা কইয়া দিল। রব্বানরে বুজাইলো, এই মাইয়া বিয়া কইরো না মিয়া। মাইয়া সাই পাজি। তোমার জান খাইয়া হালাইবো।
হামিদা বলল, না না দেরি আমরা করুম না। আগামী শুক্রবারই বিয়া। আপনে যহন। ভাল খবর লইয়া আইছেন তয় আর দেরি করুম ক্যা?
দবির তামাক খাওয়া শেষ করে একটা ফিরি নিয়া রমিজের সামনে আইসা বসল। আমগো দিক থিকা বেবাক ঠিক আছে। তুমি অহন রব্বানরে গিয়া কও, ও ইচ্ছা করলে পশুদিন থিকাঐ আমগো বাইত্তে আইয়া থাকতে পারে। কাউলকার মইদ্যে ঘর আর চকির কাম শেষ হইয়া যাইবো। ও আইয়া ওই ঘরে উটতে পারে। আমি টেকা দিলাম তার পরদিন গিয়া বিয়ার বাজার বোজার করলো। লগে আমি লোক দিমু নে। অর নিজের জিনিসপত্র, মাইয়ার বিয়ার শাড়ি ছায়া বেলাউজ সেন্ডেল এই হগলও কিন্না আনলো অর পছন্দ মতন। দরকার অইলে তুমি লগে গেলা।
রমিজ উৎসাহী গলায় বলল, হ যামু নে। অসুবিদা কী?
মনে মনে বলল, আরে যাওন তো আমার লাগবোঐ। আমার স্বার্থ আছে না? দুই হাজার পাওন লাগবো না? আইজ পামু গাছির একহাজার। দুই-তিনদিন পর পামু রব্বানের দুই হাজার। দশদিন পর পামু বাকি দুই হাজার। হেদিন পাইছি এক হাজার। দশদিনের মইদ্যে সব মিলাইয়া ছয় হাজার টেকার কাম। য্যানত্যান কথা!
হামিদা বলল, তয় রব্বানরে আপনে কইবেন পশশু আমগো বাইত্তে আইয়া উডনের আগে দুলালের সেলুনে গিয়া য্যান খেরি করে। মাথার বাবরি চুল য্যান না থাকে, মুখের দাড়িমোচ য্যান না থাকে। পয়পরিষ্কার অইয়া য্যান বাইত্তে আহে। জামাইজন দাড়িআলা অইলে, বাবরিচুলের অইলে মাইনষে কী কইবো!
নূরজাহান চা নিয়া আসছে। সেদিনকার মতন বাপ আর ঘটকের হাতে চায়ের কাপ ধরায়া দিয়া চলে গেল। বিয়ার কথাবার্তা হওয়ার পর থেকে বাড়িতে কোনও লোক দেখলেই মাথায় ঘোমটা দেয় নূরজাহান। এখনও তার মাথায় ঘোমটা। বাড়িতে কাঠ মিস্তিরি, চাপকলের মিস্তিররা কাজ করছে, তাদের দেখলেও ঘোমটা দেয় মাথায়। মাইয়াটা রাতারাতি কেমুন জানি বদলাইয়া গেল। দূর থেকে, কাছ থেকে নূরজাহানকে দেখে বুকের ভিতরটা কেমন করে দবিরের। আহা রে, দুইদিন পর মাইয়াডা আমার পর হইয়া যাইবো। থাকবো আমার বাড়িতেঐ, তয় হইয়া যাইবো আরেকজন মাইনষের। এক সংসারের মানুষ হইয়াও আসলে হইয়া যাইবো অন্য সংসারের মানুষ।
নূরজাহানের বিয়ার কথা হওয়ার পর থেকে দবিরের মুখোন কেমুন ব্যাজার ব্যাজার। শুধু আনন্দে ফাইটা পড়া মুখ হামিদার। সে আছে বিষম আনন্দে। মাইয়ার বিয়া দিতে পারতাছে পছন্দসই পোলার কাছে, এই বাড়িতেই থাকবো মাইয়া, এইটাই তার আনন্দ। এই এইদিকে যাইতাছে সে, এই ওইদিকে যাইতাছে। দবিরের লগে নানান পরামর্শ, মিস্তিরিগো কাজকামের তদারক বেবাক করতাছে দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া।
রমিজ ঘটক চা খাইয়া, তার বাকি একহাজার টাকা জেবে গুইজ্জা কেঁচি সিগ্রেট টানতে টানতে রব্বানের খোঁজে চইলা যাওয়ার পর হামিদা বলল, তয় আমি কাইল পয়সা যাই।
দবিরের হাতে তখনও চায়ের কাপ। চায়ে চুমুক দিয়া বলল, যাও। কাইল গেলে পশ্শুঐত্তো আইয়া পড়তে হইবো।
হ আইয়া পড়ম। কাইল ফয়জরের আয়জানের লগে লগে মেলা দিমু।
দেও, দেহো কাম অয়নি।
অইবোনে আল্লার রহমতে। তুমি চিন্তা কইরো না।
.
সেদিন রবিবার। দুপুরের দিকে ফিরা আসল হামিদা। বোরখা পইরা গেছিল, বোরখা পইরাই ফিরা আসল। মুখটা খুশিতে ঝলমল করছে। দবির তখন রান্নাচালায় বইসা তামাক টানছে। নন্দ মিস্তিরি ঘরের কাজ শেষ কইরা পায়খানার কাজ ধরছে। চাপকল বসানো হইয়া গেছে। ইট সিমেন্ট সুরকি দিয়া কলের চারপাশে বড় সাইজের একটা কলতলাও বানাইয়া দিছে চাপকল মিস্তিরিরা। দবির গাছির বাড়িটা এখন নতুন নতুন লাগছে।
হামিদা আইসা বাড়ি দেইখা খুশি। বড়ঘরে ঢুকে বোরখা খুলেছে। নূরজাহান দুপুরের ভাত খাইয়া শুইয়া আছে তার মতন আঁচলে মুখ ঢাইকা। দবির আইসা ঢুকল। কী খবর কী? আউয়াল দাদায় কী কইলো?
হামিদা হাসিমুখে বলল, টেকা দিছে।
দবির একটা লাফ দিল। দিছে?
হ। আমি তোমারে কইছিলাম না, আমার ভাইয়ে আমারে ঠকাইবো না। আমার হিসাবে আমি যা পামু তার থিকা ইট্টু বেশিই দিছে।
কত?
বাইশ হাজার।
কথাটা যেন বিশ্বাস হল না দবিরের। বাইশ হাজার?
হ।
কও কী?
তয় আমি কি তোমার লগে মিছাকথা কইনি?
আল্লাহ আল্লাহ। আল্লায় বিরাট রহম করছে। অহন আর আমার কোনও চিন্তা নাই। ইচ্ছা মতন মাইয়াডার বিয়া দিতে পারুম। রব্বান যা যা চাইছে বেবাক দিতে পারুম।
