লোকজন আসছে মন্দ না। মরনি আসছে সকালবেলাই, গাওয়াল বাড়ির লোকজন। আসছে, হাজামবাড়ির আবদুল আসছে বউ পোলাপান নিয়া। শুধু আসতে পারে নাই আবদুলের মা। সে তো আছে তছি পাগলনিরে নিয়া। আলফু আসছে। কুট্টি আসতে পারে নাই দেইখা খুবই হায়আপশোস করছে। কয়দিন আগে তার একটা পোলা হইছে। অতটু পোলা লইয়া বিয়া খাইতে আসন যায় না। বাদলা তো আছেই, রাবি মতলাও আছে। পুকুরের ওপারকার মাঝিবাড়ির লোকজনরা আছে, রমিজ ঘটক আছে। পয়সা থেকে নূরজাহানের মামা আউয়াল আসতে পারে নাই। তার জ্বর। তবে সে তার বড় পোলা ফজলরে পাঠাইছে। ভাগনির জন্য দশআনা ওজনের সোনার একখান চেন পাঠাইছে। মরনি দিছে একটা নাকফুল। পুরানা নাকফুল। তয় কাজির পাগলার সোনারু পরিতোষের কাছ থেকে বোয়াইয়া আনছে। দেখতে নতুন মনে হয়। হামিদার একজোড়া কানের দুল আছিল। সেই দুলও পরিতোষের কাছ থেকে বোয়াইয়া আনাইছে দবির। সেইটার চেহারাও নতুন। আজিজ গাওয়াল দিয়ে মাঝারি সাইজের পিতলের একটা কলসি। আবদুল তোশক। বালিশ বানাইয়া দিছে সেইগুলির দাম নেয় নাই। ওইটাই তার উপহার। আলফু দিছে একশো টাকা, রাবি যে রাবি সেও দিছে পঞ্চাশ টাকা। মাঝিবাড়ির বেবাকতে মিল্লা দিছে। পাঁচশো টাকা। আর এনামুল সাবে দিছে পাঁচ হাজার টাকা।
সব থেকে বড়কাজটা করেছে হামিদা।
রমিজ তার কথা মতন শুক্কুরবার বাদ জুমা দবির গাছির বাড়িতে আইসা হাজির। মুখে কেলানো হাসি। বাড়িতে উইঠাই হইহই করা গলায় বলল, কী গাছি, কইছিলাম না, আমার আন্তাজ কোওদিন ভুল অয় না। এতদিন ধইরা ঘটকালি করি, তিরিশ-চল্লিশ বচ্ছর হইব, অভিজ্ঞতার একটা দাম আছে না মিয়া। রব্বান যা যা কইছে, ঘটনা তার থিকাও বেশি। ও তো কম কইরাঐ কইছে। আমি পুরা মালখানগরডা ঘুরছি। যারে পাইছি তারে শিকদার বাড়ির আশ্রাবউল্লা শিকদারের পোলা রব্বানের ব্যাপারে জিগাইছি। আরে মিয়া তার ঘটনা তো বেবাকতে জানে। চাচায় অরে পালছে ঠিকঐ তারবাদে যেই বেইমানিডা করছে, সাইজ্জা পোলাডারে লাগাইয়া দিছিল রব্বানের পিছনে। তয় রব্বানরে মালখানগরের বেবাকতে বিরাট ভাল জানে। যারে জিগাই হেয়ই কয় বহুত ভাল পোলা রব্বান। চরিত্রবান, কোনও বদনিশা নাই। আহা আপনা চাচায় অরে কী ঠকানডা ঠকাইলো। তয় আল্লায় যুদি কেঐরে না ঠকায় মাইনষে ঠকাইয়া কী করবো, কও। আল্লার মাইর দুনিয়ার বাইর। আল্লায় কোনদিক দিয়া রব্বানের চাচা আর চাচতো ভাইগো মাইর দিয়া দিব অরা উদিসও পাইবো না।
হামিদার দিকে তাকাল রমিজ। ভাবিছাব, মুড়ি আর ওই নাইরকলের মিডাই খাওয়ান। তারবাদে চা দিতে কন মাইয়ারে। আল্লায় অর কপালডা বহুত ভাল দিছে। বহুত ভাল জামাই পাইতাছে।
জলচকিতে বইসা বাড়ির চাইরদিকে তাকাতে লাগল রমিজ। নন্দ মিস্তিরি ঘরের কাজ ধরছে দুইদিন হইল। চালে বেড়ায় নতুন ঢেউটিন লাগাইছে, জানলার শিক কপাট, একখান মাত্র দরজায় নতুন কপাট সব লাগাইয়া ঘর একদম ফিটফাট। এখন ঘরের সামনে অল্পবয়সি একজন জোগানদার লইয়া চকি বানাইতাছে নন্দ। চকির কাম শেষ কইরা জানলার কপাট দুয়ারের কপাট রং করব। তারবাদে ধরব পায়খানার কাজ। পায়খানার ওইদিকটায় বাঁশঝাড়তলার একপাশে চাপকল বসানের কামও শুরু করছে ওসমান মিস্তিরি। তিনজন লোক পাইপ বসানো নিয়া ব্যস্ত।
হামিদা মুড়ি মিঠাই দেওয়ার পর, খাইতে খাইতে রমিজ বলল, গাছি, আমি আহনের আগেঐ দিহি বেবাক কাম লাগায়া দিছো। ঘটনাক কী?
দবির ঘরের ওটায় বসে তামাক টানছিল। বলল, বিয়া দুইদিন আগে পরে মাইয়ার তো হইবই, এর লেইগা কামকাইজ লাগায়া দিলাম। অন্য জাগায় মাইয়ার বিয়া দিতে হইলেও তো বাইত্তে আরেকখান ঘর লাগে, এর লেইগা ঘরডা ঠিকঠাক করলাম। মাইয়া মাইয়ার জামাই আইলে থাকবো কই! আর তুমি কওনের পর চাপকলডা বহাইতাছি। এইডা ঠিক কইছো, বাইত্তে একহান চাপকল আইজকাইল লাগে। পুকইরের পানি খাওন যায় না। পেডের বেবাক অসুকের মূলে হইল পানি। খারাপ পানি থিকা পেডের অসুক বিসুক হয়।
রমিজ মুড়ি মিঠাই চাবাতে চাবাতে বলল, হ।
নূরজাহান তখন চা বানাতে গেছে রান্নাচালায়। বিয়ার কথাবার্তা হওয়ার পর থেকে সে বেশ চুপচাপ হয়ে গেছে। আগের মতন দৌড়াদৌড়ি, ভাদাইম্মার লগে খেলা, মজা কোনওটাই নাই। চালচলন ধীর হইয়া গেছে। মুখটা কেমন একটু উদাস।
মেয়ের চেহারা দেখে দবির হামিদাকে বলেছিল, ঘটনা কী? তোমার মাইয়ার মুকহান এমুন ব্যাজার ক্যা? জামাই পছন্দ হইতাছে না?
কথাটা নূরজাহানকে জিগাইছিল হামিদা। কী রে? বিয়ার কথা হওনের পর থিকা এমুন ব্যাজার অইয়া রইছস ক্যা?
নূরজাহান শান্ত গলায় বলেছে, তয় কী করুম? নাচুম?
না, নাচতে তরে আমি কই নাই। মুখ দেইখা তর বাপে আমারে জিগাইতে কইলো দেইখা আমি জিগাইলাম। রব্বানরে তর পছন্দ অয় নাই?
হেইডা আমি তোমারে কইছি?
না কছ নাই।
তয়?
তয় মুখ ব্যাজার ক্যা? এমতেঐ। মা, বাবারে তুমি কইয়া দিয়ো, তোমগো পছন্দই আমার পছন্দ। আমি বুজছি আমারে লইয়া বহুত চিন্তায় আছো তোমরা। যত তাড়াতাড়ি আমার বিয়া অয় তত তাড়াতাড়ি তোমরা বাঁইচা যাও। এর লেইগা তোমরা যা করতাছো ভালই করতাছো, আমারে লইয়া চিন্তা কইরো না। আমি ঠিকই আছি। কোনও সমস্যা নাই আমার।
এইসব শুক্রবারের আগের ঘটনা। তারপর রমিজ আসল, সব খবরাখবরই ভাল দিল। দবির-হামিদা যা আশা করেছিল তার থেকে ভাল। শুইনা দবির তামাক টানতে টানতে গভীর আনন্দে ফেটে যাচ্ছিল। হামিদার মুখটাও খুশিতে ঝলমল ঝলমল করছে।
