নাড়ার পালার পুর দক্ষিণ কোণে গরুর আধাল (গোয়ালঘর)। লম্বা মতন এক চালাটায় দামড়া দামড়ি (এঁড়ে বকনা) নিয়ে এগারোটা গরু। এই বাড়ির অনেকদিনের বাসিন্দা তারা, বাড়ির খুঁটিনাটি সবই জানে, তবু কোনও কোনও রাতে আধাল থেকে গলা বাড়িয়ে কেউ কেউ নাড়ার পালার দিকে তাকায়। তাকিয়ে লেজ খাড়া করে তারপর হাম্বা রবে গিরস্তকে সাবধান করে। যে রূপেই থাকে গৃহপালিত পশুরা নাকি এক পলক। দেখেই তেনাদের চিনতে পারে। চিনতে পারার লগে লগে ভয়ে লেজ খাড়া হয়ে যায় তাদের। হাম্বা রবে দশদিক মুখরিত করে। তেনাদের চিনতে যে গরুরাও ভুল করে মান্নান মাওলানার বাড়ির সামনের নাড়ার পালা তার প্রমাণ।
আজ সকালে এই নাড়ার পালার তলায় উদাস হয়ে বসে আছে আতাহার। পরনে লুঙ্গি, গায়ে গেরুয়া রঙের চাদর। এমন জবুথুবু হয়ে বসেছে, দেখে মনে হয় শীতে মরে যাচ্ছে, এখানে বসেছে রোদ পোহাবার জন্য। খানিক আগে ঘুম থেকে উঠেই এখানে। চলে এসেছে। চোখ দুইটা লাল টকটকা হয়ে আছে, যেন চোখ উঠেছে আতাহারের। বাড়ির গোমস্তা কাশেম টুকটাক কাজ করতাছে আথালে। ফুর্তিবাজ মানুষ কাশেম। কাজ করবার সময় মাঝারি স্বরে গান গাওয়ার অভ্যাস আছে। এখনও গান গাইছে সে।
আগে জানি না রে দয়াল
তর পিরিতে এ পরান যাবে
কাশেমের গান শুনে চোখ তুলে আথালের দিকে তাকাল আতাহার। খ্যারাখ্যারা গলায় ডাকল, ঐ কাইশ্যা।
গান থামিয়ে সাড়া দিল কাশেম। কন।
এমিহি আয়।
কাজ ফেলে একদৌড়ে নাড়ার পালার সামনে এসে দাঁড়াল কাশেম। ছেঁড়া লুঙ্গি হাঁটুর কাছ পর্যন্ত তুলে পরা। লুঙ্গির ওপর মাজায় গিঁট দিয়ে বান্ধা গামছা। ডান বাহুতে কালো কাইতানের (এক ধরনের মোটা সুতা) লগে বান্ধা রূপার বড় একখান মাদলি। এছাড়া শরীরে আর কিছু নাই কাশেমের। খালি গায়ের কাশেম দেখতে অদ্ভুত। গায়ের রঙ বাইল্লা (বেলে) মাছের মতো ফ্যাকাশে। বুকে পিঠে কোথাও একখান পশম নাই। ভাঙা মুখে, নাকের তলায় আছে গলাছিলা করার গর্দানের কাছে ভুল করে গজানো দুইচারটা পশমের মতন দুইচারটা মোচ, থুতনির কাছে আছে মোচের মতন কয়েকখান দাঁড়ি। দাঁড়িমোচের রঙ কাশেমের মাথার চুল মোচ ভুরু আর চোখের পাপড়ির মতোই লালচে ধরনের। এই দাঁড়িমোচ কাজির পাগলা বাজারে গিয়ে প্রায়ই কামিয়ে আসে সে। গায়ে পশম নাই, মুখে দাঁড়িমোচ নাই দেখে দুষ্টু লোকেরা কাশেমের নাম দিয়েছে মাকুন্দা কাশেম। এই নাম শুনে প্রথম প্রথম খুব ক্ষেপত কাশেম, আজকাল আর ক্ষেপে না। সয়ে গেছে।
আরেকখানা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তার মুখের হাঁ বেশ বড়। হাসলে দুইকান তরি ছড়িয়ে যায় হাসি এবং প্রত্যেক কথায় হাসে কাশেম।
এই যেমন এখন, নাড়ার পালার তলায় বসা আতাহারের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল।
লালচোখ তুলে কাশেমের দিকে তাকাল আতাহার। নাক ফুলিয়ে বলল, হাসছ ক্যা?
কাশেম লগে লগে বলল, কো, হাসি না তো!
বলেও হাঁ করা মুখ হাসি হাসি করে রাখল।
আতাহার বলল, মুক বন্দ কর।
প্রথমে একটা ঢোক গিলল কাশেম তারপর মুখ বন্ধ করল। দেখে খুশি হল আতাহার। গম্ভীর গলায় বলল, বাবায় কো?
পুবের ঘরে।
কী করে?
মউলকা (চাপটি। চল, খুদ সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে, সকালবেলা বেটে, পানি মিশিয়ে তরল করে মাটির খোলায় রুটির আকারে লেপটে দিতে হয়। ভাজা হলে খেতে বেশ স্বাদ) খায়।
মায় আইজ মউলকা বানাইছেনি? কীয়ের মউলকা?
খুদের।
কচ কী! কনটেকদার সাবে আছে বাইত্তে, বিয়ানে তারে খুদের মউলকা খাওয়ামুনি?
তয় কী খাওয়াইবেন?
হেইডাই চিন্তা করতাছি।
খানিক চুপ করে কী ভাবল আতাহার তারপর বলল, তর কামকাইজ শেষ?
নিজের অজান্তেই হাসল কাশেম। আসল কাম শেষ। রইদ ওডনের আগেই বেবাকটি গাই চকে নিয়া গোছর (হাতখানেক লম্বা খুঁটিতে দড়ি বেঁধে, সেই দড়ির আরেক প্রান্ত গরুর পা, গলায় বেঁধে খুঁটিটা মাঠে পুতে দেওয়া। এই খুটি ওপড়ান বেশ কঠিন। দড়ি যতটা লম্বা সেই অনুযায়ি খুঁটির চারপাশ ঘুরে ঘুরে ঘাস খেতে হয় গরু ছাগলের) দিয়াইছি। অহন আধাল সাফ করতাছি।
শেষ অইছে?
না। তয় পরে করলেও অইবো। আপনের কী কাম কন, কইরা দেই।
কনটেকদার সাবে অহনতরি ঘুমাইতাছে। উইট্টা হাতমুখ ধুইবো, পায়খানায় যাইবো। তুই এক কাম কর, এক বালতি পানি আইন্না রাখ বাংলাঘরের সামনে আর পিতলের বড় বদনাডা। একহান তোয়াইল্লা রাকিছু জানলার লগে, সাবান রাকিছ। মেজবানের লেইগা যা যা করন লাগে আর কি, বুজলি না!
হ বুজছি।
তারপরই যেন আতাহারের চোখ দুইটা দেখতে পেল কাশেম। দেখে আঁতকে উঠল। ও মিয়াবাই চোক্কে কী অইছে আপনের চকু উদাইছেনি (উঠেছে কিনা)?
আতাহার গম্ভীর গলায় বলল, না।
তয় চক্কু দিহি পানিকাউর (পানকৌড়ির) চকুর লাহান অইয়া রইছে।
হারা রাইত অরঘুমা (নির্ঘুম) আছিলাম।
ক্যা?
মদ খাইছি।
কাশেম থতমত খেয়ে বলল, তোবা, তোবা।
লগে লগে খেঁকিয়ে উঠল আতাহার। ঐ বেডা তোবা তোবা করচ ক্যা? আমি যে মদ খাই তুই জানস না? আইজ থিকা খাইনি খাই তো ছোডকাল থিকা।
ধমক পেয়ে হাসল কাশেম। বিনীত গলায় বলল, হেইডা তো খানই।
তয়?
খাইলেও এই হগল কথা কইতে অয় না। আপনে একজন আলেমের পোলা।
আতাহার হাসল। আলেমের ঘরে জালেম অয়।
তোবা তোবা, এই হগল কী কইতাছেন মিয়াবাই। হুজুরে হোনলে জব কইরা হালাইবো।
