একটু থামল রমিজ। দবির আর হামিদা উৎকণ্ঠিত হল।
দবির বলল, আর?
আর বিশ-পঁচিশ হাজার টেকা চাইছে একটা চা-র দোকান দেওনের লেইগা। কামলা কোমলার কাম পোলায় আর করবো না হেইডা তো আগেঐ কইলাম। পোলায় চা খুব ভাল বানায়। এতবড় সড়ক অইতাছে, এই সড়কের ধারে তোমার বাড়ি বরাবইর বিশ-পঁচিশ হাজার টেকা খরচা কইরা যুদি একহান চা-র দোকান দিয়া বইতে পারে তয় কায়কারবার ভাল করতে পারবো। দিনে দিনে উন্নতি হইব।
দবির তাকাল হামিদার দিকে, হামিদা তাকাল দবিরের দিকে। কেউ কোনও কথা বলল না।
রমিজ বলল, আমি মনে করি এইডা এমুন বড় কোনও ব্যাপার না। বেবাক কিছু মিল্লা পনচাশ থিকা ষাইট হাজার টেকায় তোমার মাইয়ার বিয়াশাদির কাম অইয়া যাইবো।
দবির বলল, আরে না মিয়া। জামাই বাইত্তে থাকবো, বাইত্তে কিছু আলগা খরচা আছে না? বাঁশঝাড়তলার ঘরডা ঠিকঠাক করন লাগবো, পায়খানাটা ঠিকঠাক করন লাগবো। তুমি একহান চাপকলের কথা কইলা, একটা চাপকল বহানের কাম। সইত্তর-আশি হাজার লাইগ্যা যাইবোনে।
তোমার একটা মাত্র মাইয়া, এডু খরচা করবা না? তয় ঘরবাড়ি ঠিকঠাক করন, চাপকল, চা-র দোকান যাই করবা হেইডি তো তোমার মাইয়ারঐ থাকবো। বাড়িঘরের কাম তো তুমিই করবা। জামাইর বিয়ার জিনিসপত্র আর চা-র দোকান দেওনের টেকা তার হাতে দিবা সে তার লাহান কইরা হালাইবো। ঘরজামাই অইলো বাড়ির পোলার লাহান। ও তো আর তোমার কোনও জিনিস লইয়া পলাইয়া যাইতাছে না।
বুজলাম সবঐ। তয় টেকা তো ম্যালা।
হামিদা বলল, অইলো। এই হগল দেহা যাইবো নে। অহন আপনে আপনের আসল কাম করেন। মালখানগর যান।
আরে হেইডা তো আমি কাইলঐ যাইতাছি। কাইল হইল মঙ্গলবার। মঙ্গল বুঁদ বিষুদ এই তিনদিন লাইগ্যা যাইবো মালখানগরের কামে। বিষুদবার বিয়ালে বাইত্তে আমু। আইয়া জিরামু। পরদিন শুক্কুরবার বাদ জুম্মা তোমগো বাইত্তে মালখানগরের খবর লইয়া আমু। ইনশাল্লাহ ভাল খবরঐ আনুম দেইখোনে। আমি ঘটকালি করি বহুত বচ্ছর ধইরা। মাইনষের আওজেঐ কোনডা হাচা কোনডা মিছা বুইজ্জা যাই। রব্বানের লগে কথা কইয়া যা বোজনের আমি বুজছি। আরও ভাল মতন বোজনের লেইগা মালখানগর যাইতাছি। আইজ একহাজার দেও গাছি। আল্লাহ আল্লাহ কইরা বেবাক ঠিকঠাক থাকলে শুক্কুরবার বাকি একহাজার দিয়ো। আর বিয়ার দিন আমার ওই লুঙ্গি আর সিল্কের পাঞ্জাবি, বুজলা না?
রমিজ কেলানো একখানা হাসি দিল।
নূরজাহান দুইহাতে দুইকাপ চা নিয়া আসল। একটা কাপ দবিরের হাতে দিয়া রমিজের দিকে খালি হাতটা বাড়াল। রিকাবিডা দেন।
রিকাবির মুড়ি মিঠাই কোন ফাঁকে খালি হয়ে গেছে খেয়ালই নাই রমিজের। সে আছে নিজের ধান্দায়। যেভাবে যা চাইছে তাই হচ্ছে। বহুদিন এত সহজভাবে এতগুলি টাকা ঘটকালির কাজে রুজি হয় নাই। ভিতরে ভিতরে আনন্দে সে একেবারে শিমুল ফুলের মতন ফাইটা পড়তাছে।
রিকাবিটা নূরজাহানের হাতে দিয়া চায়ের কাপ নিল। নিয়াই চুমুক দিল। দিয়া খুবই আমোদের একখান আওজ করল। আরে, মায় তো বিরাট ভাল চা বানাইছে। আমগো বাজারের মোস্তফাও তো এত ভাল চা বানায় না। রব্বান কইলো সে চা খুব ভাল বানায়। এর লেইগা চা-র দোকান দিতে চাইতাছে। হোনো মা আল্লাহ আল্লাহ কইরা বিয়াড়া যুদি হইয়া যায়, তয় জামাইরে তুমি এমুন চা বানাইতে হিগাইয়া দিয়ো। তয় দেখবা তোমার জামাইর চা-র দোকান বিরাট চালু হইয়া যাইবো।
নূরজাহান শরম পাইল। মাথা নিচা কইরা রিকাবি হাতে বড়ঘরে ঢুইকা গেল।
.
সন্ধ্যারাতে একটুখানি চাঁদের আলো আছে। সেই আলোয় উঠানে পায়চারি করতে করতে দবির বলল, টেকা পয়সার কথা হুইন্ন তুমি যে ঘটকারে কইলা, অইলো দেহা যাইবো নে। আপনে আগে মালখানগর গিয়া খোঁজ খবর লইয়াহেন। এইডা কইলা ক্যা? আমার মনে অইতাছে এই পোলার লগেই নূরজাহানের বিয়া অইবো। আমার কাছে তো এত টেকা পয়সা নাই, বিয়া ঠিক অইয়া গেলে কেমতে কী করবা?
হামিদা রান্নাচালার সামনে বইসা আছে। নূরজাহান আছে বড়ঘরে। ঘরের খোলা দরজার সামনে কুপি জ্বলছে। এখনও রাতের খাওয়া দাওয়া হয় নাই। একবার বড়ঘরের দিকে তাকাল হামিদা। তারপর বলল, আমি তোমারে কিছু টেকা দিতে পারুম।
দবির অবাক। কও কী?
হ।
কেমতে দিবা? তুমি টেকা পাইবা কই? আমার যা রুজি রোজগার ওহেন থিকা তো দুই চাইর টেকাও জমান সম্ভবপর না।
ওহেন থিকা জমাই নাই।
তয়।
শুক্রবার ঘটকায় যুদি আল্লাহ আল্লাহ কইরা ভাল সমবাত লইয়াহে তয় শনিবার। পয়সা যামু আমি। আমগো বাইত্তে। বাপের সম্পিত্তির কিছু আমি পাই। তয় হেইডা এক্কেরেঐ কম। বাপের সম্পিত্তি দিয়া কিছুই অয় নাই আমার ভাইয়ের। হেয় নিজে রুজি। রোজগার কইরা কিছু জাগা সম্পিত্তি করছে। তয় আমার বাপের যেডু আছে ওই হগল তো আমি আর আনতে যামু না। ভাইর লগে ওই হগল লইয়া কাইজ্জা কিত্তনও করুম না। গিয়া ভাল মতন কমু, আমার মাইয়াডার বিয়া দাদা। বাপের সম্পিত্তির থিকা আপনে যা ভাল মনে করেন হেইডাঐ আমারে দেন। তয় আমি মাইয়াডা পার করতে পারি। যুদি বাপের সম্পিত্তি আইজ নাও পাইতাম তাও তো বড়ভাই হিসাবে ভাগনিরে আপনে কিছু দিতেন। ওই হিসাবেই দেন।
দবিরের ইচ্ছা হল ছুঁইটা গিয়া হামিদার হাত দুইটা জড়াইয়া ধরে। আমার মাইয়াডার লেইগা এত মায়া তোমার? এতকিছু ভাবছো মাইয়ার বিয়ার লেইগা! তুমি যে আমার মাইয়াডার লেইগা জান দিয়া দেও হেইডা আমি বুজছিলাম ও যেদিন ওই শুয়োরের পোর। মুখে ছ্যাপ দিছিল। তারবাদে আবার বুজলাম আইজ। তয় এইডা আমগো কপাল। মাইয়াডার লেইগা এমুন একখান পোলা পাইতাছি। ঘরজামাই থাকবো। আমার মাইয়া থাকবো আমার বাইত্তে। জিন্দেগিতে চোখের আঐল অইবো না।
