রব্বান পা চালায়া মাওয়ার বাজারের দিকে মেলা দিল। এখন সেন্টুর দোকানে গিয়া ফাসকেলাস এককাপ চা খাইব।
.
আগে আমারে এক গেলাস পানি দেন গো ভাবিছাব। পান খাইছি তো, কুলি (কুলকুচি) কইরা লই। তারবাদে কথাবার্তি কইতাছি। এহ হগল কথা কইতে অয় মুখ পয়পরিষ্কার কইরা।
হামিদা দৌড়ায়া গেল রমিজের জন্য পানি আনতে। দবির দাঁড়ায়া ছিল উঠানে। রমিজ ঘটক তার দিকে তাকায়া বলল, বাইত্তে একটা চাপকল বহাও গাছি। মাইয়া বিয়াশাদি দিবা, মাইনষেরে কি ওই পচা পুকইরের পানি খাওয়াইবানি?
দবির হাসিমুখে বলল, ঠিলার পাইনতে ফিটকারি দিয়া রাখি। পানির নিগরা (ময়লা, তলানি) বেবাকঐ নীচে পইড়া যায়। ঠিলার পানিতে ময়লা থাকে না।
তাও বাইত্তে আইজকাইল একখান চাপকল থাকন দরকার।
হামিদা ততক্ষণে একটা কাঁচের গেলাসে পানি নিয়া আসছে। সেই পানি দিয়া রমিজ তার দুই দিককার তুবড়ানো গাল ফুলাইয়া, মুখের ভিতর কুলকুল কুলকুল আওজ কইরা ফুরুক কইরা কুলির পানি ফালাইল দবিরের বাড়ির নামার দিকে। দুই-তিনবার করল কাজটা। তারপর গেলাস গাছির হাতে ফিরত দিয়া পকেট থেকে ময়লা রুমাল বাইর কইরা মুখ মুছল। হামিদা একটা জলচকি আর ফিরি আইনা রাখছে উঠানে। দবির বলল, বহো ঘটক, বহো।
রমিজ বেশ একটা ভাব ধরে জলচকিতে বসল। বিয়াল অইয়া গেছে। আগে মুড়ি মিডাই খাওয়াও গাছি, তারবাদে চা দেও এককাপ ফাসকেলাস কইরা।
দবির ফিরিতে বসল। এইডা আর কওন লাগবো না। তোমার ভাবিছাবে দিতাছে।
মাইয়া কো? নূরজাহান?
বাঁশঝাড়তলার মিহি গেল। একটা কুত্তা আছে, ওইডার লগে খেলতাছে।
হ মাইয়া ইট্ট দূরে থাকনঐ ভাল। এই ফাঁকে কামের কথা সাইরা হালাই।
রিকাবিতে করে মুড়ি মিঠাই আইনা রমিজের হাত দিল হামিদা। মিঠাইডা খাইয়া দেহেন ঘটকদাদা। আমি নিজ হাতে বানাইছি। নাইরকল দেওয়া আছে। তিলের মিডাইও আছে। তয় ওইডা আপনেরে দিলাম না। ওইডার থিকা এইডা ভাল। স্বাদ বেশি।
হেইডা আমি বুজছি। তয় ভাবিছাব আপনেও বহেন। রব্বানের লগে কী কথা হইল, হোনেন। আরে পোলাডা তো আপনেগো সুনাম গাইতে গাইতে মইরা গেল। কয় গাছিকাকায় যেমন ভাল মানুষ কাকিও তেমুন ভাল মানুষ। তাগো মাইয়া ভাল না অয় কেমতে?
হামিদা বসল বড়ঘরের ওটায়। পোলায় মত দিছে?
একমুঠ মুড়ি মুখে দিল রমিজ, এককামড় মিঠাই মুখে দিল। দিয়া দুই-তিনটা চাবান দিয়া বলল, মিঠাইটা ভাবিছাব সত্যই ভাল। এত ভাল মিঠাই জিন্দেগিতে কম খাইছি।
দবির বলল, তোমার ভাবি মিঠাই বহুত ভাল বানায়।
একটু থেমে বলল, অহন কও দেহি রব্বানের লগে কথা কী হইল? রাজি?
রাজি মাইনি? রাজির উপরে রাজি। কোনও আপিত্তি নাই। নূরজাহানরে বিয়া কইরা ঘরজামাই থাকবো। দাবিদাওয়াও তেমুন কিছু নাই। জামাইরে ঘড়ি আংটি কাপড়চোপড় ওইডা তো দিতে অয়ঐ, ওইডা দিবা।
এইডা না কইলেও দিমু।
তয় আসল কথাডা অইলো রাস্তার ওই কামলার কাম পোলাডায় করতে চায় না। কোনওদিন করে নাই তো। ঘেটি বেদনা করে। ভাল ঘরের পোলা তো, বুজলা না। তার মুখ দেইক্কা তো আমার মায়া লাগছে। তারবাদে রাস্তার কাম তো একদিন শেষ হইব। তহন করবো কী?
এইডা আমিও চিন্তা করছি। ঘরজামাই থাকলে আমরা যেমতে চলি অমতেই চলবো। খেত যেডু আছে আমার লগে চুইবো।
এইত্তো একটা বলদার মতন কথা কইলা। ওডু জমিন চুইয়া জিন্দেগি চলেনি? ভবিষ্যতে পোলাপান অইবো, সংসার বড় অইবো। পয়লা থিকাঐ ভাল একখান কিছু ছেমড়ার করন উচিত না?
দবির না, হামিদা বলল, লেইজ্য কথা। পয়লা থিকাঐ একটা কিছু করন উচিত।
এইত্তো ভাবিছাবে বুজছে। তুমি মিয়া খালি ওডু জমিনের ইরি দিয়া চলতে পারোনি? শীতের দিনে রসের কারবার না করলে উদিস পাইতা কত ধানে কত চাউল। সংসার চলে কেমতে? আমি খালি ঘটকালি দিয়া চলতে পারিনি? পোলার দোকান না থাকলে তো না খাইয়া থাকন লাগতো। সংসার চলতো না।
নূরজাহান তখন দৌড়াইতে দৌড়াইতে উঠানের দিকে আসছে। পিছন পিছন আছে ভাদাইম্মা। উঠানে যে রমিজ ঘটক বইসা আছে এইটা সে বোঝে নাই। তাকে দেইখা থমকাইয়া গেল।
রমিজ একবার নূরজাহানের দিকে তাকাল। তারপর মুড়ি মিঠাই চাবাতে চাবাতে দবিরের দিকে তাকাল। মাইয়ার সামনে কথাবার্তি কওন ঠিক অইবো?
দবির না, হামিদা বলল, আইজকাইল এই হগল কোনও বিষয় না ঘটকদাদা। আপনে কন। তারপর নূরজাহানকে বলল, ওই নূরজাহান, দুই কাপ চা বানা। চা য্যান ভাল অয়। যা তাড়াতাড়ি বানা। দেরি করি না।
নূরজাহান কথা বলল না। যেরকম চঞ্চল পায়ে দৌড়ায়া আসছিল সেই পা এখন ধীর, নরম। ওইরকম ভঙ্গিতে মায়ের পাশ দিয়া ঘরে ঢুকল সে, চায়ের জিনিসপত্র নিয়া রান্নাচালায় গিয়া চুলা জ্বালাল। চায়ের পানি বসাল চুলায়, তবে কানটা পাইতা রাখল উঠানের দিকে। রব্বানের লগে যে তার বিয়াশাদির কথা হইতাছে এইসব সে জানে। রমিজ ঘটক যে ওই কাজেই আসছে, রব্বানের লগে কথাবার্তা কইয়া আসছে এইসব বুঝতে তার বাকি নাই। সে তাকায়া রইল চুলার আগুনের দিকে, তয় কানটা বড়ঘরের সামনে বসা তিনজন মানুষের দিকে। কে কী বলে সবই সে শুনব,
দবির বলল, তোমার কথা আমি বুজছি ঘটক। রব্বান এই বিষয়ে কী কইলো অহন হেইডা কও দিহি। নগদ টেকা পয়সা চাইছেনি?
মুড়ি মিঠাই চাবাতে চাবাতে জড়ানো গলায় রমিজ বলল, হেইডা তো কিছু চাইছে। তয় এমুন কিছু না। বিয়ার লেইগা ঘড়ি আংটি জামা কাপড়ের লেইগা নদগ দশ বারো হাজার আর…।
