রমিজের মুখের দিকে তাকায়া হাসল রব্বান। কাকা, এইডা তো আমি রাজি।
এইডা কোনডা?
আমি বুজছি, বুইজ্জাও বুজতে চাইছেন না আপনে। সোজা কইরা কই। নূরজাহানরে বিয়া কইরা গাছিকাকার বাইত্তে ঘরজামাই থাকতে আমার কোনও আপিত্তি নাই। অইলো?
রমিজ মহাখুশি। যেভাবে যা ভাবছে তার থেকেও সহজ ভাবে সবকিছু হইয়া গেল। ভাবছিল টাকা পয়সা আরও বেশি চাইব রব্বান। চলিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা লইয়া টান দিব গাছির। সেইটা মাত্র পোনরো-বিশ হাজারের উপরে দিয়া যাইতাছে। গাছির কপাল কপাল।
তবে নিজের ভিতরকার এইসব উচ্ছ্বাস রব্বানকে বুঝতে দিল না রমিজ। ঘটকালির প্যাঁচটা নিজের মধ্যে রাইখা দিল। বলল, তোমার লগে কথা কইয়াঐ গাছির বাইত্তে যাইতাছি আমি। তুমি যা যা কইলা বেবাকঐ তারে আমি কইতাছি। তোমার কথা হোনলাম অহন তাগো কথা হুইন্না তারবাদে ফয়সালা করুম। তয় সাবধান বাজান, এই হগল লইয়া কেঐর লগে কথা কইয়ো না। দেশগেরামের মানুষ ভাল না। ভেজাল ভেজাল লাগাইয়া দিব।
আরে এইডা আপনে কন কী কাকা? এই হগল আমি বুজি। আমার পেডে বোমা মারলেও কথা বাইর হইব না। আপনে আপনের ঘটকালি চালায়া যান। গাছিকাকায় রাজি অইলে, অর্থাৎ আমার যা যা কথা এই হগলে রাজি হইলে আপনেরা যেদিনঐ বিয়া ঠিক করবেন ওদিনঐ বিয়া কইরা হালামু। তয় ইট্টু তাড়াতাড়ি করলে ভাল হয় কাকা।
রমিজ মুখ ঘুরায়া রব্বানের দিকে তাকাল। ক্যা?
এই কামলাগিরি করতে ভাল্লাগতাছে না। ঘেটি বেদনা করে।
বুজছি বুজছি। হ যত তাড়াতাড়ি অয় ববস্তা আমি করতাছি। তয় আমার যে আরেকখান। বড়কাম বাকি আছে?
আবার কোন কাম বাকি রইল কাকা?
বোজো নাই?
কয়েক পলক কিছু ভাবল রব্বান তারপর বলল, বুজছি বুজছি। গাছিকাকারে আমি যা যা কইছি, অর্থাৎ বাড়িঘর বাপদাদার ঠিকানা, জাগা সম্পিত্তির ব্যাপার, চাচার সংসার, জানের ডর এই হগল ঠিক আছে কি না হেইডা আপনে যাচাই করবেন?
রমিজ মুগ্ধ। তুমি মিয়া বিরাট বুদ্ধিমান পোলা। ক কইলে কইলকাত্তা বোজো। হ এইডা আমি কইতে চাইছি। কাইল আমি মালখানগর যাইতে চাই। তোমার কথা মতন। বেবাক মিলাইয়া দেইক্কাহি।
রব্বান মাথা নাড়ল। হেইডা আপনে যাইতে পারেন। তয় আমার কথার এদিক ওদিক কিছু পাইবেন না। অযথা এতদূর হাঁইট্টা গিয়া কষ্ট কইরা আইবেন। আমি মিছাকথা কউন্না পোলা না।
রমিজ তীক্ষ্ণচোখে রব্বানের মুখের দিকে তাকাল। তয় আমার লগে সমঝোতা করো।
জে।
হ। আমি গেলাম না মালখানগর। গাছিরে কমু, হ গেছিলাম। রব্বান যা যা কইছে বেবাক একদোম ঠিক। ইট্টুও মিছা না। চকু বুইজ্জা মাইয়া বিয়া দিয়া দেও।
করেন, এইভাবে করেন।
তয় আমার ফায়দা?
ফায়দা আদায় করবেন গাছিকাকার কাছ থিকা।
হেইডা তো করুমঐ। ঘটকরা তো মিয়া দুই মিহি থিকাঐ মাল কামায়। তুমি আমার লেইগা কী করবা হেইডা কও? আমারে দিবা কতো?
আপনেঐ কন।
রমিজ কোনও কিছু ভাবল না। বলল, পাঁচ দিবা, পাঁচ।
পাঁচ কী?
হাজার হাজার।
রব্বান যেন আকাশ থেকে পড়ল। কন কী কাকা? পাঁচ হাজার?
হ মিয়া। পাঁচঐ দেওন লাগবো। তয় তুমি তো তোমার জেবে থিকা দিবা না, দিবা গাছির কাছ থিকা লইয়া। তরিকাড়া হিগাইয়া দেই…
হিগান লাগবো না। আমি বুজছি। চা-র দোকানের ওহেন থিকা ইধার কা মাল উধার করতে হইব। দোকান দিতে পোনরো-বিশ হাজার না কইয়া কইতে হইবো বিশ-পঁচিশ হাজার, নাকি?
কারেট। তয় টেকাডা তুমি আগে নগদ হাতে লইয়া লইবা। গাছির হাতে টেকা থাকলে আমার দিকটা সামাল দিতে তোমার অসুবিদা হইব। দেহা গেল গাছি নিজেঐ নিজের হাতে টেকা খরচা কইরা দোকান সাজাইয়া তোমারে বহাইয়া দিল।
ওইডা আপনেঐ গাছিকাকার লগে ভাইঙ্গা লইয়েন। তয় কাকা পাঁচ না, কাম করতে হইবো তিনে। গাছিকাকায় আপনেরে কী দিবো না দিবো আমি জানি না, আমি দিমু তিন। আর বিয়ার খরচাপাতি, আমার কাপড় জামা, জুতা আংটি ঘড়ি বেবাকঐ কইলাম তাগো। আমার জেবে চাইরআনাও নাই। আমি কইলাম এক পয়সাও খরচা করতে পারুম না। পারলে দুই-চাইর দিনের মইদ্যে গাছিকাকার বাইত্তে আমারে ঢুকাইয়া দেন। আমার থাকন। খাওনের বিরাট অসুবিদা অইতাছে, ইটা বালি টানতে টানতে ঘেটি বেদনা করতাছে। এই আজাব থিকা আমারে বাঁচান।
রমিজ সিগ্রেট ফালাইয়া রব্বানের দিকে তাকাল। হোনো মিয়া, বেবাকঐ আমি কইরা। দিতাছি। একটা সপ্তাহ টাইম দেও। আইজ সমবার, আগামী সমবার গাছির বাইত্তে তোমারে উড়াইয়া দিমু। এই কয়ডা দিন কষ্ট মষ্ট কইরা থাকো। একদিন কাম করবা, হেই পয়সা। দিয়া দুইদিন চলবা। এইভাবে সাতটা দিন পার করো। তারবাদে দেখবা আরাম কারে কয়। আর ফাইনাল কথা হইল পাঁচ আর তিনের মাঝখানে যেইডা আছে ওইডা আমারে দিবা। চাইর হাজার। কবে দিবা, কেমতে দিবা হেইডা কও।
বিয়ার বাজার সদাই করনের সময় দুই দিমু, বাকি দুই দিমু বিয়ার দশদিন পর। ওই ববস্তাও আপনেরঐ করন লাগবো। গাছিকাকারে কইবেন পোলারে হাজার আষ্টেক টেকা দেও গাছি। পোলায় তার জামা কাপড় জুতা ঘড়ি কিনুক। ওইডা দিলে ওহেন থিকা দুই আপনেরে দিয়া দিমু নে। তারবাদে দিন দশেক পর দোকানের নাম কইরা লমুনে হাজার দশেক। ওহেন থিকা দিমুনে দুই। কেস ডিসমিস।
রমিজ খুশি হইল। এইডাঐ ফাইনাল। আমি অহনঐ গাছির বাড়ি যাইতাছি।
রমিজ চলে যাওয়ার পর রব্বানের আর ইচ্ছা করল না রাস্তার কাজে যায়। আবার গিয়া ইটা বালুর বোঝা উঠায় মাথায়। এখন কাজে না গেলে অর্ধেক বেলার পয়সা পাবে। সন্ধ্যার দিকে গিয়া পয়সাটা নিয়া আসবে। জেবে কিছু পয়সা আছে, আর আজকের কাজের অর্ধেক বেলায় পাবে তিরিশ টাকা, সব মিলাইয়া ছয়-সাতটা দিন কাইটা যাইব। তারপর থেকেই তো আরামের জীবন। নূরজাহানের মতন বউ, গাছিকাকার মতন শ্বশুর, কাকির মতন শাশুড়ি। ওই বাড়িতে থাকন, খাওন।
